• রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

প্রাক পুজোর বুক-ডন আর দু’টি জিলিপির আখ্যান

jalebi

আগে ইস্কুলের পরীক্ষায় দুটো বাংলা রচনা ঘুরে ফিরে খুব আসত। ছাত্রজীবনের সুখদুঃখ আর ছাত্রজীবনে খেলাধুলোর প্রভাব। এই দুটো রচনা লিখতে গিয়েই আমরা খেলাধুলোর পক্ষে ফলাও করে প্রচুর কথা লিখতাম। আর তার প্রমাণ দিতে ভোরবেলায় ভবানীপুরের হরিশ পার্কে গিয়ে শরীরচর্চার নাম করে হয় ক্রিকেট আর তা নইলে ফুটবল পেটাতাম। এখন যেমন সাজানো-গোছানো, আটের দশকের মাঝাখানেও কিন্তু মাঠটার চেহারা এমন ছিল না। দক্ষিণ দিকটায় ঘাস কম ছিল। ছিল শুধু ধুলো আর বালি। সেখানেই জমে উঠত আমাদের খেলা। আর তা দেখেই মনে হয় কবীর সুমন গান বেঁধেছিলেন, ‘পাড়ার ছোট্ট পার্ক/ ঘাস নেই আছে ধুলো...’।

আমরা দেখতাম, প্রকৃত শরীরচর্চা করত আমাদের চেয়ে বছর আট-দশের বড় দাদারা। তা-ও সারা বছর নয়— পুজোর ঠিক আগে। মাস দেড়েক। তারা হরিশ পার্কের উত্তর দিক ঘেঁষে সবুজ ঘাসজমির মধ্যে দাঁড়িয়ে কোমরে ইলাস্টিক দেওয়া নীল হাফপ্যান্ট আর রংচটা মোহনবাগান বা ইস্টবেঙ্গলের জার্সি পরে তেড়ে বুক-ডন, বৈঠক, পুশ-আপ বা সিট-আপ দিত আর নিজেদের মধ্যে গুজগুজ করে হাসাহাসি করত। কিন্তু পুজো চলে গেলে তাদের আর খুঁজে পাওয়া যেত না। প্রথম যখন এটা আমার চোখে পড়ে, তখন আমি সিক্স বা সেভেন। আমাদের এক ইচড়ে-পাকা বন্ধু, এক দিন খেলার শেষে গা-থেকে ঘেমো গেঞ্জিটা খুলে, ওই ব্যায়ামপ্রিয় দাদাদের দিকে আঙুল তুলে নিদান দেওয়ার গলায় বলেছিল, ‘‘এ সব পুজোর সময় পাখি ধরার জন্য, বুঝলি!’’ এই ডায়লগ শুনে দুধ-ভাত আমি, ভারি অবাক হয়ে জিগ্যেস করেছিলাম, ‘‘পাখি ধরার জন্যে ব্যায়াম করতে হবে কেন ভাই!’’ এতে সেই ইচড়ে-পাকা কী উত্তর দিয়েছিল মনে নেই, কিন্তু টেনিদা ঠিক যে কায়দায় ক্যাবলার মাথায় চাঁটা মারে, ঠিক তেমনই একটা রামচাঁটা মেরেছিল মাথার পিছনে— এটা স্পষ্ট মনে আছে।

অলঙ্করণ: দেবাশীষ দেব। 

তখনই বুঝেছিলাম, নিজেকে যুবতীদের চোখে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্যই যুবা পুরুষদের শরীরচর্চা, ছাত্রসমাজের চেয়ে অনেক বেশি আবশ্যিক। কিন্তু আশ্চর্য, এই উপকারিতার কথা আমাদের রচনা বইয়ের কোনও প্রান্তেই লেখা ছিল না। এই সব দাদাকে দেখতাম মাঝেমাঝেই নিজেদের দু-হাতের বাইসেপস, টিপে-টুপে পরখ করে দেখত। প্রাচীনকালে রোমান গ্ল্যাডিয়েটররা শত্রুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ার ঠিক আগে, নিজেদের বর্মের বক্ষদেশ যে ভাবে স্পর্শ করতেন— সাতখানি বুক-ডন দেওয়ার শেষে এরাও ঠিক ওই স্টাইলেই ছুঁয়ে দেখত নিজেদের বুক। আর এই সময় তাদের চোখে কেউ যেন আলতো করে একটু মায়া-অঞ্জন পরিয়ে দিত। আমরা তখন ওদের কাছে বড় একটা ভিড়তাম না। কিন্তু কখনও-সখনও এক সঙ্গে হেঁটে ফিরে আসার সময় যদি কারও বাইসেপের প্রশংসা করতাম, তবে কপালে জুটত স্কুল রোডের বাসস্ট্যান্ড লাগোয়া শীতলা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের হাতে-গরম জিলিপি। ‘ওরে, এদের সব ক’টাকে দুটো করে দিয়ে দে!’ কোনও দাদার মুখ থেকে এই পবিত্র বাণীটি বেরনোর সঙ্গে সঙ্গে সেই শারদ-সকালের সোনালি রোদ্দুর পিঠে মেখে, আমরা হাতের শালপাতার বাটির মধ্যে একদম সোনাগড়ানো জিলিপির মাধুর্য নেওয়ার জন্য চঞ্চল হয়ে উঠতাম।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন