• রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

পুজোর ঠাকুর দেখা

ঠাকুর ভাসানে গেলে যে কী মনখারাপ হত!

Durga Puja
ছবি: দেবাশীষ দেব।

আমার কাছে দুগ্‌গাপুজোর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল ঠাকুর দেখা। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠেই নতুন পায়জামা-পাঞ্জাবি পরে মা-জ্যাঠাইমাদের সঙ্গে পাড়ার মুখার্জি ঘাটের মণ্ডপে গিয়ে অঞ্জলি। তার পর দিনে-রাতে যখনই সুযোগ পাওয়া যায় কারও না-কারও হাত ধরে টুক করে ঠাকুর দেখতে বেরিয়ে পড়া।  নতুন জামা-জুতো পরে, বেলুন উড়িয়ে, ভেঁপু বাজিয়ে, সদ্য বাজারে আসা কোল্ড ড্রিংক ‘গোল্ড স্পট’ খেয়ে, তার টিনের ছিপির ভেতরে রাবারের ওয়াশারে ছাপা মিকি মাউস বা ডোনাল্ড ডাকের রঙিন ছবি জমিয়ে আর ‘কোন’ আইসক্রিম খেয়ে আমার ঠাকুর দেখা চলত। হাঁটতে হাঁটতে পা-ব্যথা করলে, বাবা-জ্যাঠা যাঁর হাত ধরে হাঁটছিলাম, তাঁরই কোলে চেপে ঠাকুর দেখেছি।

একটু বড় হয়ে যখন বন্ধুদের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে বেরনোর পারমিশন পাওয়া গেল, তখন দল বেঁধে শহরের নানা প্রান্তে ঠাকুর দেখতে গিয়েছি। একটা গ্রুপে প্রায় ১৪-১৫ জন। সে যে কী আনন্দ ঠিক বুঝিয়ে বলতে পারব না। অনেক ক্ষণ লাইন দিয়ে ঢুকতে হবে, অথচ না-দেখলে জীবনটাই বৃথা— এমন ঠাকুর দেখার জন্যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাঁশের খুঁটির ব্যারিকেডের মধ্যে দাঁড়িয়ে থেকেছি। বন্ধুর কাঁধে হাত রেখে কোনও কষ্টই গায়ে লাগেনি।

সাতের দশকের শেষে দক্ষিণ কলকাতার ‘মুক্তদল’ এবং এর কিছু পরে ‘সঙ্ঘশ্রী’-র পুজোয়, মণ্ডপের মূর্তির পিছনের সাদা কাপড়ে মুভি দেখিয়ে আর সাউন্ড সিস্টেমে ‘মহিষাসুরমর্দিনী’-র কিছু কিছু অংশ বাজিয়ে, অসুরের সঙ্গে মা দুর্গার ফাইট সমেত একটি অসামান্য শো দেখানো হত। এটি দেখার জন্যে কী ধরনের লাইন পড়ত বলে বোঝানো যাবে না।

বকুলবাগান ক্লাবের পুজোয় তখন প্রতি বছর এক-এক জন বিখ্যাত চিত্রকর বা স্কাল্পচারিস্টদের দিয়ে প্রতিমা গড়ানো শুরু করেছে। এক বার বিকাশ ভট্টাচার্য তো এক বার শানু লাহিড়ি। এক বার সমীর আইচ তো এক বার শর্বরী রায়চৌধুরী। বাড়ির সামনে দিয়ে সেই আশ্চর্য ঠাকুরগুলি যখন ভাসানে যেত, তখন যে কী মনখারাপ হত বলে বোঝাতে পারব না!  সেই সময় উত্তর কলকাতার পুজো-ঘিরে ঠিক এই ধরনের আধুনিক চিন্তাভাবনা দেখতে পাইনি।‘লাট্টু শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে অভিনব লাট্টুর প্রতিমা’ গোছের থিম পুজোরও তখন এত রমরমা হয়নি। খুঁটি-পুজো বলে যে একটা বিষয় আছে— তখন ক’জন বাঙালি সেটা জানত যথেষ্ট সন্দেহ আছে।

এর পর যখন বিয়ে হয়েছে, তখন বন্ধুরা সপরিবার দল বেঁধে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছি। বন্ধুর পাড়ার পুজোয় পাত-পেড়ে ভোগ খেয়েছি। আস্তে আস্তে  ঠাকুর দেখার থেকেও যেন কোথাও বসে জমিয়ে আড্ডা দেওয়া, একসঙ্গে খাওয়া-দাওয়া করা—  এগুলোই বেশি গুরুত্ব পেতে শুরু করেছে। তার পর সবার ছানা-ছানি হয়েছে। তাদের ট্যাঁকে নিয়ে আবার নতুন করে ঠাকুর দেখা শুরু করেছি।

আমার ছেলে-মেয়ে যখন চড়ুইছানার মতো, তখন আমার একটা লালরঙা বি.এস.এ. (এস-এল-আর) সাইকেল ছিল। তার সামনে-পিছনে ওদের বসিয়ে গোটা ভবানীপুরের ঠাকুর দেখে বেড়িয়েছি। মনে হত যেন আমার ছোটবেলাটা ফিরে এসেছে। কাঠি আইসক্রিমের বরফে চেনা স্বাদ, গ্যাস বেলুনের গায়ে সেই আশ্চর্য নোনতা গন্ধ, হরিশ পার্কের টয়ট্রেন যেন দার্জিলিঙের ঘুম স্টেশনে সমানে পাক খেয়ে চলেছে। মণ্ডপে ইঁদুরের ল্যাজ দেখে, ময়ূরের পেখম দেখে, রাজহাঁসের হলুদ-বরন ঠোঁট দেখে, প্যাঁচার গোলগোল চোখ দেখে যেন নতুন করে পুলকিত হয়ে উঠেছি। আগে তো এটাও বুঝিনি যে ছোটরা আসলে বড়সড় ঠাকুরগুলোর চেয়ে, তাঁদের ছোট ছোট বাহনগুলোকেই বেশি ভালোবাসে। কারণ তারা থাকে ছোটদেরই উচ্চতায়। চোখের নাগালে। ওদের দেখতে গেলে ছোটদের ঘাড় উঁচু করতে হয় না। তবে তারই মধ্যে অসুর যেন একসেপশন। সে বড় হয়েও যেন ছোটদের গ্রুপে মিশে রয়েছে। তাকে দেখে মনে হয়, চার দিন ধরে মা দুর্গার ধারালো ত্রিশূলের খোঁচা খেলেও, জায়গাটায় একটু ডেটল দিয়ে, ভাসানের আগে, একটু সময় বের করে, ওর সঙ্গে দুটো সুখ-দুঃখের কথা ঠিকই বলে নেওয়া যাবে। নইলে, আবার এক বছর তো দেখাই হবে না।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন