• রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

পুজোর হিট গান শুনতে মাইকগুলোও যেন সারা বছর অপেক্ষায় থাকত

Puja Song
কার্টুন: দেবাশীষ দেব।

Advertisement

ছেলেবেলায় পুজোর সময় আমার ঘুম ভাঙত সানাইয়ের আওয়াজে । দৌড়ে বারান্দায় গিয়ে দেখতাম একটা রুপোলি চোঙের মধ্যে থেকে সানাইয়ের জোর আওয়াজ ভেসে আসছে, যার নাম মাইক। আমাদের বাড়িতে যে পুরনো গ্রামোফোনটা ছিল, তার ওপরেও একটা চোঙ ফিট করা ছিল, কিন্তু সেটা পেতলের। তবে সেটা এত জোরে আওয়াজ বার করতে পারত না। কেমন যেন রিনরিন করত। তাই বোধহয় সেটাকে মাইক বলা হত না। আচ্ছা, যিনি প্রথম মাইক বানিয়েছিলেন, তিনি কি গ্রামোফোনের চোঙের কথা মাথায় রেখেছিলেন? নাকি বাজনদারদের বিউগল-এর পিছনের বিরাট চোঙটা দেখেই তাঁদের মাইক বানানোর কথা মনে হয়েছিল? চোঙা-মাইকের ইতিহাস যদি কেউ কোনও দিন লেখেন, তবে নিশ্চয়ই আসল সত্যিটা এক দিন জানতে পারা যাবে।

মাইকেরা বাঁধা থাকত লাইট-পোস্টের উঁচুতে। এখনও তাই-ই থাকে। মাইক দিয়ে নানা রকম ঘোষণা শোনা যেত। এখনও তা-ই যায়। ‘পঞ্চা, তুমি যেখানেই থাকো এখনই আমাদের অফিসঘরে এসে দেখা কর!’ অথবা, ‘হাওড়া নতুনপাড়া থেকে এসেছেন বাবলু বিশ্বাস, আপনার ইস্ত্রি পুজোমণ্ডপের পেছনে আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন!’ আর শোনা যেত নানা রকম পুজোর গান। হিন্দিতে আর বাংলায়। একই গান দিনের নানান সময়ে। ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। বারে বারে। শুনতে শুনতে প্রায় মুখস্থ হয়ে যেত। হাঁটতে, চলতে, খেতে, শুতে তখন শুধু সেই গানগুলোই যেন গুনগুন করে চলতাম। মনে আছে, এ ভাবেই মুখস্থ হয়ে গিয়েছিল রাহুল দেব বর্মনের গাওয়া ‘অ-য় অজগর আসছে তেড়ে’ গানখানি। এখন কিন্তু আর মাইকের মধ্যে থেকে পুজোয় রেকর্ড হওয়া নতুন গান ভেসে আসে না। এটা আমাদের থেকে যাঁরা বড় বা যাঁরা মোটামুটি আমাদের বয়সী তাঁদের কাছে যে কী অদ্ভুত একটা মানসিক ধাক্কা এটা ঠিক বলে বোঝাতে পারব না।

আরও পড়ুন: ঠাকুর ভাসানে গেলে যে কী মনখারাপ হত!

মাইকের অবশ্য আরও একটা উপকারিতা ছিল। পুজোর সময় পাড়ায় জলসা হলে সেখানে হওয়া গান ও মিউজিক, মাইকের দৌলতে বাড়িতে বসেই পরিষ্কার শুনতে পাওয়া যেত। রাত দশটা বাজলে জলসার মাইকের ভল্যুম একদম মিহি করে দেওয়া হত, কিন্তু পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া হত না। কারণ যত নামজাদা শিল্পী তাঁরা তো একটু রাতেই গাইতে আসতেন। যে সব পাড়ায় জলসা হত, সেখানে প্রতিমার মঞ্চ থেকে একটু দূরে আলাদা একটা মঞ্চ বাঁধা হত। ভবানীপুরের নর্দান পার্কের পুজোয় এই মঞ্চটি হত দেখার মতো। এখানে পুজোর তিন দিন সন্ধেবেলায় শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের নানা বিখ্যাত ওস্তাদরা যন্ত্রসঙ্গীত পরিবেশন করতে আসতেন। সপ্তমীর দিন বাজাতেন পণ্ডিত ভি জি যোগ। অষ্টমীর দিন বাজাতেন উস্তাদ বিলায়েৎ খান। আর নবমীর সন্ধেটা উস্তাদ বিসমিল্লা খাঁ সাহেবের প্রায় বাঁধাধরা ছিল।

তখনও দৈত্যের মতো বক্স-স্পিকারের অত রমরমা হয়নি। মাইকের পেটের মধ্যে থেকেই সারা মাঠের দর্শকদের কানে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ত সুরের স্নিগ্ধ মুর্ছনা। বাজনা শুরু করার আগে এক বার বিসমিল্লা খাঁ সাহেবকে আমি নিজের চোখে দুর্গাপ্রতিমার সামনে দাঁড়িয়ে ভক্তিভরে প্রণাম করতে দেখেছি। খাঁ সাহেব মুসলমান। অথচ তিনি দুর্গাপ্রতিমাকে প্রণাম করছেন। এ নিয়ে পরের দিন কাগজে তাঁর ধর্মনিরপেক্ষতার ট্যাগলাইন দিয়ে কোনও ছবি প্রকাশ পেয়েছিল বলেও তো মনে পড়ে না। সে দিন পার্কের মাঠের কাঠের চেয়ারে বসে থাকা অজস্র দর্শকের মধ্যে এ-নিয়ে কোনও চাপা গুঞ্জনও ছিল না। খাঁ সাহেবের যাঁরা সহশিল্পী, তাঁরাও শান্ত ভাবে মণ্ডপে দাঁড়িয়ে নিজেদের ভক্তি প্রকাশ করছিলেন। আমার চোখেও তাই এর মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু ঠেকেনি। কারণ মানুষের মধ্যে যে জাতধর্ম নামক একটা নোংরা বিভেদরেখা আছে, ওই বয়সে সেটা আমার জ্ঞানগম্যির বাইরে ছিল।

নর্দান পার্ক ছাড়া ভবানীপুরের পুরনো জলসাগুলোর মধ্যে হাজরা ফায়ার ব্রিগেডের পিছনের রাস্তায় ফরোয়ার্ড ক্লাবের জলসা আর রমেশ মিত্র স্কুলের দিকে যাওয়ার পথে যোগেশ মিত্র রোডের বাঁ-পাশের ফাঁকা মাঠটিতে মিলনচক্র ক্লাবের জলসার খুব নাম ছিল । কিন্তু এগুলো ছিল বিজয়ার পরের জলসা। এই সব জলসায় তখন বাংলা গানের বিখ্যাত সব আর্টিস্ট আসতেন। শ্যামল-সুবীর-নির্মলা-মানবেন্দ্র— কে নয়! আর তাঁদের গলায় পুজোর সব হিট গান শোনার জন্য মানুষ তো কোন ছার, ওই রুপোলি মাইকগুলোও যেন সারা বছর অপেক্ষা করে থাকত।

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন