• ইন্দিরা মুখোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

লাইট...ক্যামেরা...অ্যাকশন...টিভি ক্যামেরায় দুর্গা-কথা

Durga
কার্টুন: দেবাশীষ দেব।

পুজোর কাউন্টডাউন শুরু। আড্ডা বসেছে মন্দির রূপ প্যান্ডেলের মধ্যে। জাঁকিয়ে চলছে টিভি চ্যানেলের প্রশ্নোত্তর পর্ব। দুর্গার কথায়, দুর্গার বেশে পাড়ার এক বৌদি। মিডিয়ার ক্যামেরার মুখোমুখি তিনি সাক্ষাৎ যেন মা দুর্গা।

-তা সদলবলে কেন আসো গো মা? একা এলেই বা কি ক্ষতি ছিল? বাজারের যা অবস্থা!

‘‘এরা কেউ আমার পেটের ছেলেমেয়ে নয়। এরা যে কী করে সব উড়ে এসে জুড়ে বসল আমার পরিবারের সঙ্গে! সকলকেই ঠাঁই দিই এ ভাবে। হয়তো কিছুটা নিজের সুবিধার্থে। মহিষাসুরমর্দিণী দুর্গাপূজার সূত্রপাত ঘটে গুপ্তযুগে। বাঙালি কল্পনাপ্রবণ জাতি। সপরিবার মা দুর্গাকে না দেখলে তাদের যে মন ভরে না। তাই তো দুই শক্তি লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে আমার দু’পাশে দেখ এবং মহানন্দে বরণ কর তোমরা।’’

-গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী, সরস্বতী— সকলেই তো অন্য সময়ে আসেন এক বার করে, তা হলে মায়ের সঙ্গে আবার কেন তাঁদের আসা চাই-ই? দুর্গাপুজোর সময় চালচিত্রের মাথায় ছোট্ট করে লুকিয়ে থাকেন মহাদেব। উনি কি তবে নাটের গুরু?

‘‘কার্তিক না হয় দেবসেনাপতি। সে তরুণ সদৃশ, সুকুমার, শক্তিধর এবং সর্বসৈন্যের পুরোভাগে অবস্থান করে। তাই মা দুর্গার যুদ্ধযাত্রায় এমন শৌর্যবীর্য সম্পন্ন পুত্র সঙ্গী না হয়ে যায় কোথায়! অসুরের সঙ্গে যুদ্ধের সময় তাকে আমার খুব প্রয়োজন। গণেশ না হয় ত্রিকাল জ্ঞানী, সিদ্ধিদাতা, বিঘ্নেশ, অর্থাৎ সকল বাধাবিঘ্ন নাশকারী। যুদ্ধের মতো ভয়ানক পরিস্থিতিতে তাঁর শরণ অবশ্য কর্তব্য।’’

-কিন্তু বাকিরা? অর্থাৎ লক্ষ্মী-সরস্বতী? তাঁদের কী ভূমিকা এই দুর্গাপুজোতে?

"এঁরা আমার অন্য দু’টি রূপ। শ্রী শ্রী চণ্ডীতে দুর্গাদেবীকেই মহালক্ষ্মী ও মহাসরস্বতী রূপে আখ্যা দেওয়া হয়। লক্ষ্মীদেবী হলেন বিষ্ণুপ্রিয়া বা নারায়ণী যিনি সৌভাগ্য, ঐশ্বর্য এবং সমৃদ্ধির প্রতীক আর সরস্বতী হলেন বাগদেবী, বিদ্যাবুদ্ধির অধিষ্ঠাত্রী, জ্ঞানদায়িনী। অর্থাৎ, এই দুই নারীশক্তি সকল শুভ, সৃজনশীল, গঠনমূলক ক্রিয়াকলাপের উত্স। তাই শুভশক্তির প্রতীকও বটে।’’

- বলি মায়ের আশেপাশে একগন্ডা পশুপাখি কেন?

‘‘স্বজন পরিবৃতা মা দুর্গার সঙ্গে তোমরা দেখ একগন্ডা পশুপাখিকে। দেবীর বাহনরূপে পশুরাজ সিংহ, মহিষের দেহ থেকে নির্গত অসুর, লক্ষ্মীর পায়ের কাছে পেঁচা, সরস্বতীর রাজহাঁস, গণেশের পায়ের কাছে ছোট্ট ইঁদুর আর কার্তিকের পাশে ময়ূরকে। আদতে ওই একরত্তি পাখিগুলি বা ইঁদুরের ওপরে চড়ে বসলে দেবতার ভারে তাদের প্রাণ বেরিয়ে যাবার কথা।’’

-মা দুর্গা না হয় সিংহবাহিনী হয়ে যুদ্ধ করেছিলেন। অসুর না হয় স্ত্রী মহিষের পেটে জন্মেছিলেন আর পেট ফুঁড়ে বেরিয়ে মায়ের সঙ্গে যুদ্ধ করেছিলেন। তাই বলে অন্যদের সঙ্গে এত পশুপাখির কী সম্পর্ক?

‘‘দেবীর বাহন সিংহ। তাঁর পায়ের নীচে সিংহের অবস্থান। সিংহ মানুষের জৈবপ্রবৃত্তি তথা পশুভাবকে লালন করে। অরণ্যে ঘুরে শিকার সংহার করে। এহেন জৈব প্রবৃত্তির বিনাশ ঘটান মা দুর্গা। আর এ রূপ পুরুষসিংহই মা’কে শুভকার্যে বহন করে নিয়ে চলে। সে থাকে পায়ের নীচে, অর্থাৎ দুর্গা হলেন জয়ী আর অশুভ সেই সংহার মনোবৃত্তি মায়ের পায়ের তলায় ধ্বংস হয়।

লক্ষ্মীর বাহন নিশাচর পেঁচা, অন্ধকার যার আশ্রয়। লক্ষ্মী সৌভাগ্য-সমৃদ্ধির আলোর দিশা দেখান পেঁচাকে সঙ্গে নিয়ে, অর্থাৎ অন্ধকার ও আলোর মধ্য থেকে জীবজগৎ আলোর দিশা খুঁজে নেবে।

সরস্বতীর বাহন শ্বেত রাজহংস। বিবেকমান জীবজগৎ সংসারের অসার বা অনিত্যকে সারটুকু গ্রহণ করার বারতাই বোধহয় ছড়ায় রাজহাঁস। আর সাদা রং অমলিনতার প্রতীক। শ্বেত রাজহংসের গায়ে কখনও অবিদ্যারূপ মলিনতা স্পর্শ করতে পারে না।

বিশালাকার গণপতির বাহন ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র মুষিক। এখানে গণেশ নেতা বা গণশক্তির প্রতীক। আর তার অনুপাতে অতি ক্ষুদ্র ইঁদুর জীবের ছোট ছোট কর্মফলের কর্তনকারী। অর্থাৎ, অতি বৃহৎ শুভকর্মের দ্বারা কৃত সুফল বিনষ্ট হয়ে যায় ছোট্ট কোনও মন্দ কর্মের দ্বারা। তাই ষড়রিপু বা কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ ইত্যাদির মতো সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম কর্মফল বিনাশ করে ইঁদুর যাতে কি না বৃহৎ সিদ্ধিলাভে বাধা না ঘটে।

কার্তিকের বাহন আমাদের জাতীয় পাখী আলস্যহীন ময়ূর। ময়ূর অত্যন্ত সজাগ এবং কর্মচঞ্চল পাখি। সৈনিক কার্তিকের সব গুণগুলি সে বহন করে। তার মতো ধীর স্থির হয়ে  যুদ্ধক্ষেত্রে নিরলস লড়াই করেন সৈনিক কার্তিক।’’

-আচ্ছা বলতে পারো, কীসের বলে মা দুর্গার এত শক্তি? একা যদি লড়তে হত মেয়েমানুষকে? পারতো সে অসুরবধ করতে?

‘‘কোনও প্রশ্নই নেই একা লড়াই করার। স্বর্গে তখন মহিষাসুরের যা দাপট! পুরুষেরা অতিষ্ঠ হয়ে আমাকেই তো পাঠালেন। আর আমাকে সর্ব আয়ুধে তেজস্বী করলেন। শিবের তেজে দেবীর মুখ, যমের তেজে কেশপাশ, বিষ্ণুর তেজে বাহুসমূহ, চন্দ্রের তেজে কুচযুগ, ইন্দ্রের তেজে শরীরের মধ্যভাগ, বরুণের তেজে জঙ্ঘা ও উরুদ্বয়, পৃথিবীর তেজে নিতম্ব, ব্রহ্মার তেজে পদযুগল, সূর্যের তেজে পায়ের অঙ্গুলিসমূহ এবং কুবেরের তেজে তৈরি হল উন্নত নাসিকা। অষ্টাবসুর তেজে তার হাতের আঙুল তৈরি হল। দক্ষাদি প্রজাপতিগণের তেজে তাঁর দন্তসকল এবং বহ্নির তেজে দেবীর ত্রিনয়ন সৃষ্টি হল। সন্ধ্যাদেবীদ্বয়ের তেজে ভ্রূযুগল ও বায়ুর তেজে উত্পন্ন হল কর্ণদ্বয়। দেবী এ রূপে তেজসম্ভূতা হলেন কিন্তু মহিষাসুরকে বধ করবার জন্য তো তেজই যথেষ্ট নয়। এ ভাবেই সকল দেবতা এই দেবীকে অসুরবধের জন্য নানাবিধ দিব্যাস্ত্র যোগাতে লাগলেন।’’

-ক্যামেরা, প্যাক আপ করি তবে? ধন্যবাদ! অনুষ্ঠানটি সম্প্রচারিত হবে শিগগিরি। জানিয়ে দেব আপনাদের।

প্রস্থানরত মা দুর্গা নাকের নথটি খুলতে খুলতে, খোলা চুলে খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে বললেন, সব ভাল আপনাদের, তবে একে তো আশ্বিনের শুরুতে পুজো এ বার, তায় আপনাদের এত হাই পাওয়ারের আলো। ঘেমেনেয়ে একাকার হলাম, এই আর কি!

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন