সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

পুজোর বাঁশ আর আলো যেন রূপকথার আখ্যান

এই টিউবের আলোয় যেন কৈলাস পাহাড়ের চাঁদনি রাতের মায়া। লিখছেন রজতেন্দ্র মুখোপাধ্যায়

lighting
রংচটা পাড়াগুলোয় যেন এক আশ্চর্য ম্যাজিসিয়ানের মতো ঢুকে পড়ত।

আমরা যখন প্রাইমারি স্কুলে পড়ি তখন থেকেই লক্ষ্য করতাম পুজোর মাসখানেক আগে থেকে পাড়ায় পাড়ায় বাঁশ পড়তে শুরু করে দিয়েছে। এই বাঁশগুলো হারাধনের দশটি ছেলের মতো দিনকতক মাটিতেই পাশাপাশি শুয়ে থাকত। তারপর প্যান্ডেল-বানানো দাদারা এসে তাদের ঘুম থেকে ডেকে তুলে শুরু করে দিত তাদের কাজকম্ম। বাঁশ যে আগে দেখিনি তা নয়। আমাদের ভবানীপুর স্কুল রোডের পাড়ায় লাল্টুদার বাঁশগোলা ছিল বলে সেখান থেকে সারা বছর নানা সাইজের আর নানান বয়সের বাঁশেদের ঢুকতে-বেরতে দেখতাম। দেখে কোনও দিনই আলাদা কিছু মনে হয়নি। কিন্তু দুগ্‌গা পুজোর প্যান্ডেল বানানোর জন্য আসা যে বাঁশ, তাদের দিকে তাকালেই মনটা কেমন যেন খুশিখুশি হয়ে উঠত। ধূসর ঘেঁষা সাদাটে রং। জায়গায় জায়গায় তা আবার ঘষা খেয়ে বিবর্ণ হয়ে গিয়েছে, তবু সেই বাঁশগুলোর গায়েই যেন মা দুগ্‌গার বিরাট রঙিন প্যান্ডেল, গণেশ, কার্তিক, সিংহ, অসুর, ঢাকের আওয়াজ আর মাইকে বাজা পুজোর নতুন গানগুলো ঝলমল ঝলমল করত।

সেই শুয়ে থাকা বাঁশগুলোকে একদিন সকালে দেখতাম কেমন স্বাধীন ভাবে আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে উঠেছে। বাঁশঝাড়ে তারা যেমন রবীন্দ্রনৃত্যের বিভঙ্গ নিয়ে দাঁড়ায়, ঠিক তেমন দাঁড়ানো নয়। এই দাঁড়ানোটা যেন নকল বুঁদিগড়ের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শুম্ভের মতো সোজা আর সটান। আর শুধু প্যান্ডেল কেন, তাদের দিয়ে তো তখন বড়রাস্তার দু’ধারে পুজোর ব্যারিকেড, লম্বা লম্বা বিজ্ঞাপনের হোর্ডিং টাঙানোর ফ্রেমের দু’পাশের স্ট্যান্ড— সবই তৈরি করা হচ্ছে। কিছু দূরে দূরে মাটিতে পোঁতা বাঁশের কাঁধে তার দিয়ে বেঁধে দেওয়া হত এক বা একাধিক টিউবলাইট। ঘরে সন্ধেবেলা পড়তে বসার সময় যে ফ্যাকাসে সাদা টিউব জ্বলে— জিনিসটা একই হওয়া সত্ত্বেও এই টিউব যেন সেই টিউব নয়। এদের আলোয় যেন কৈলাস পাহাড়ের চাঁদনি রাতের মায়া, এদের বিভায় যেন শারদ প্রভাতের দ্যুতি।

আরও পড়ুন: 

সমানে টক্কর দেবে উত্তর কলকাতা

তাল ঠুকছে দক্ষিণ কলকাতাও

আগে স্কুলগুলিতে ছুটি পড়ে যেত মহালয়ার আগের দিন। তার আগে পর্যন্ত হরিশ পার্কের বাঁশ আর টিউবগুলি আমাদের এক স্বপ্নের ঘোরে যেন ভরিয়ে রাখত। পাড়ায় পাড়ায় আলোর চেন ঝোলানোর কাজ শেষ। তৃতীয়া বা চতুর্থীর দিন রাত্তিরে চন্দননগর থেকে নানা ধরনের চলমান আলো আমাদের এই শহর কলকাতার ম্যাড়মেড়ে, রংচটা পাড়াগুলোয় যেন এক আশ্চর্য ম্যাজিসিয়ানের মতো ঢুকে পড়ত, যারা তাদের হাতের জাদুতে এক লহমায় সমস্ত কিছুকেই রংচঙে আর ঝলমলে করে দিতে পারত। আর চন্দননগরের লাইটিং মানেই মারাদোনা বলে শট মারছেন, সহজপাঠের  নানান পাতা জ্যান্ত হয়ে নড়াচড়া শুরু করে দিয়েছে, ছোটাছুটি করছে হাঁদা-ভোঁদা আর কেল্টুদা বা শুধু একটি ময়ূর তার নানা রঙের পেখম মেলে নেচে চলেছে তো নেচেই চলেছে। এই সব দেখতে দেখতে ষষ্ঠী এসে যেত, আর আমরা নতুন জামাপ্যান্ট পরে পায়ে নতুন জুতোর ফোস্কা নিয়ে ন্যাংচাতে ন্যাংচাতে প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘুরে, চন্দননগরের কোন আলোটা সবচেয়ে সুন্দর তাই নিয়ে গভীর আলোচনা করে চলতাম। আমাদের এত দিন বন্ধুর মতো ঘিরে থাকা প্যান্ডেলের বাঁশ আর অতি সাধারণ টিউবলাইটগুলোর কথা সে দিন আর মনেই রাখতাম না।

কার্টুন: দেবাশীষ দেব।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন