রক্তচাপ মাপার পর যদি দেখেন যন্ত্রে রিডিং দেখাচ্ছে ১২০/৮০, তবে নিশ্চয়ই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। ধরেই নেন হৃদযন্ত্র এবং রক্তনালী সম্পূর্ণ সুস্থ এবং স্বাভাবিক অবস্থায় রয়েছে। কিন্তু সত্যিই কি তাই? হার্টের স্বাস্থ্যের ব্যাপারে ওই রিডিংয়ের উপর কি এতটা ভরসা করা যায়? আধুনিক চিকিৎসাবিদ্যা বলছে, আপাত স্বাভাবিক রক্তচাপের আড়ালেও লুকিয়ে থাকে পারে ভবিষ্যতের উচ্চ রক্তচাপের ঝুঁকি। তবে তার উপসর্গ চোখে পড়বে একটু বেশি নজর দিলে, তবেই। খুব সূক্ষ্ম কিছু শারীরিক বদল অজান্তেই ভবিষ্যতের উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা এবং তা থেকে হার্টের রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। সময় থাকতে সেগুলিকে চিনে নিলে বড় সমস্যা এড়ানো সম্ভব হবে।
কী ভাবে বুঝবেন?
১. পালস রেট
রক্তচাপ স্বাভাবিক অথচ বিশ্রামের সময়ে হৃৎস্পন্দনের হার প্রতি মিনিটে ৮০ বা তার বেশি। এমনটা যদি দীর্ঘ ক্ষণ থাকে, তবে তা চিন্তার কারণ।
কেন এটি চিন্তার? কারণ, এ থেকে বোঝা যায়, শরীরের ‘সিমপ্যাথেটিক নার্ভাস সিস্টেম’ বা সমব্যথী স্নায়ুতন্ত্র অতিরিক্ত সক্রিয়। ফলে হৃদ্যন্ত্রেকে রক্ত পাম্প করতে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। এই অতিরিক্ত পরিশ্রমের ফলে ধীরে ধীরে রক্তনালীগুলোর ওপর চাপ বাড়ে এবং কয়েক বছরের মধ্যে রক্তচাপ স্থায়ীভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকে।
২. ধমনী
রক্তনালী বা ধমনী প্রাকৃতিকভাবে স্থিতিস্থাপক অর্থাৎ প্রয়োজন মতো প্রসারিত বা সঙ্কুচিত হতে পারে। এগুলি নমনীয় হয়। তাই রক্তের প্রবাহ স্বাভাবিক রাখতে সাহায্য করে। কিন্তু বয়সের কারণে, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং বংশগত কারণে অনেক সময় ধমনী শক্ত বা অনমনীয় হতে শুরু করে।
কেন এটি চিন্তার? ধমনীর দেওয়াল শক্ত হয়ে গেলে হৃদযন্ত্র যখন রক্ত পাম্প করে, তখন তা আর আগের মতো প্রসারিত হতে পারে না। আর ধমনী শক্ত হতে শুরু করা মানেই ভবিষ্যতের হাইপারটেনশনের স্পষ্ট পূর্বাভাস। এই সমস্যা সাধারণ রক্তচাপ মাপার যন্ত্র— স্ফিগমোম্যানোমিটারে ধরা পড়ে না। ‘পালস ওয়েভ ভেলোসিটি’ পরীক্ষার মাধ্যমে ধমনীর নমনীয়তা নির্ণয় করা যায়।
৩. ইনসুলিন
রক্তচাপ ১২০/৮০ থাকলেও যদি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকে অর্থাৎ রক্তে শর্করার মাত্রা ওঠানামা নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা না থাকে তবে হাইপারটেনশন হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
কেন চিন্তার?
ইনসুলিন রক্তে শর্করার মাত্রা অতিরিক্ত বাড়তে দেয় না। তবে শরীর যদি ইনসুলিনকে কাজে বাধা দেয়, তবে রক্তে শর্করার মাত্রা বৃদ্ধির পাশাপাশি, ইনসুলিনের মাত্রাও বাড়তে থাকে। অতিরিক্ত ইনসুলিন শরীর থেকে সোডিয়াম বেরোতে দেয় না। রক্তনালীগুলিকেও সংকুচিত করে। উভয় পরিস্থিতিই রক্তনালী ও হৃদযন্ত্রের ওপর চাপ তৈরি করে, যা কালক্রমে রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়।
৪. নকচুরিয়া
অনেকে মনে করেন রাতে বারবার প্রস্রাব হওয়া প্রস্টেট বা ডায়াবিটিসের লক্ষণ। কিন্তু রক্তচাপের পরিবর্তনের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
কেন চিন্তার? রাতে ঘুমোনোর সময় রক্তচাপ স্বাভাবিকভাবেই কিছুটা কমে যায় যাকে নকটারনাল ডিপিং বলে। কিন্তু যাদের রক্তনালীতে অভ্যন্তরীণ পরিবর্তন শুরু হয়েছে, তাদের শরীরে রক্তচাপ রাতেও সহজে কমে না। ফলে শরীর প্রস্রাবের মাধ্যমে অতিরিক্ত সোডিয়াম ও জল বের করে রক্তচাপ কমানোর চেষ্টা করে। তাই বারবার প্রস্রাবের বেগ আসে। এমন সমস্যা হলে এবং ঘুমের মধ্যে নাক ডাকা বা শ্বাস আটকে যাওয়ার সমস্যা থাকলে, তা ভবিষ্যতের হাইপারটেনশনের সম্ভাবনাবৃদ্ধি করতে পারে।
৫. চোখ
চোখের রেটিনার রক্তনালীকে বলা হয় শরীরের সামগ্রিক স্বাস্থ্যের আয়না। যদি দেখা যায় চোখের রক্তনালীগুলি সঙ্কুচিত হয়েছে তবে তা ভবিষ্যতের উচ্চ রক্তচাপের প্রাথমিক সঙ্কেত।
কেন চিন্তার?
রেটিনা পরীক্ষা করার সময়ে অত্যন্ত সূক্ষ্ম রক্তনালীগুলির সংকোচন বা পরিবর্তন দেখতে পাবেন চোখের চিকিৎসক। ধমনীর সংকোচন দেখলে তা বুঝতে হবে ধমনীতে কোলেস্টেরল জমে রক্তনালী শক্ত এবং রক্তচলাচলের পথ সরু হয়ে গিয়েছে। ফলে চোখে রক্তপ্রবাহ কমে রক্তনালীগুলি ক্ষতিগ্রস্ত বা সঙ্কুচিত হয়ে গিয়েছে।