Advertisement
E-Paper

‘মুগিচা’ থেকে ‘নাম মাতুম’, গরমে প্রাণ জুড়োতে এশিয়ার নানা দেশে কেমন শরবত খাওয়া হয়?

বুনো ডুমুর থেকে চালকুমড়ো, এমন সব উপাদান দিয়েও বানানো যায় গরমের শরবত। এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গরমের দিনে এমন নানা প্রকার শরবত খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। সেগুলি স্বাস্থ্যগুণেও ভরপুর। সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপায়ে তৈরি সে সব পানীয় নামীদামি ব্র্যান্ডের প্যাকেটজাত জুসকেও টেক্কা দিতে পারে অনায়াসে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ২৪ মে ২০২৬ ১০:৪১
Refreshing Recipes of traditional Summer Drinks of different Asian countries

এশিয়ার নানা দেশে এমন কিছু শরবত তৈরি হয় যার সঙ্গে এ দেশে তৈরি শরবতের অনেক মিল রয়েছে। গ্রাফিক: আনন্দবাজার ডট কম।

বাঙালি উৎসবপ্রবণ। ভোজনরসিকও বটে। তাই উৎসবগুলিতে উপবাসের থেকে প্রসাদের গুরুত্ব অনেকটাই বেশি। খাওয়া-দাওয়ার কথাই যদি বলতে হয়, তা হলে আদরে-আপ্যায়নে যে পানীয়টির প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি হয়, সেটিই হল শরবত। তাই আজও বাঙালির অহঙ্কার ও সাংস্কৃতিক শৌর্যের পরিচয় বহনকারী তরল-তীর্থ ‘প্যারামাউন্ট’-এর গরিমা এতটুকুও ক্ষুণ্ণ হয়নি। চা-কফি নিয়ে মাতামাতির অনেক আগে থেকে শরবত সংস্কৃতি বাংলার মজ্জায় মিশে রয়েছে। শুধু বাংলা বললে ভুল হবে, দেশের নানা প্রান্তেই স্থানীয় উপকরণ ও ঐতিহ্য মেনে শরবত খাওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। তেমনই রয়েছে এশিয়ার নানা দেশেও। সে শরবতে শুধু গরমের তৃষ্ণাটুকু মেটে না, তাতে ভরপুর পুষ্টিও হয়। ডাব বা কমলা-আনারস-ভ্যানিলা ফ্লেভারের সঙ্গে সাম্প্রতিক ‘প্যাশন ফ্রুট’ অ্যাভোকাডো বা কিউইয়ির বিলাসিতা সেখানে নেই। কোথাও পাহাড়ের বুনো ডুমুর বা চালকুমড়ো জ্বাল দিয়ে তৈরি হয় ‘এনার্জি ড্রিঙ্ক’, কোথাও আদা-লেমনগ্রাস কিংবা ভাতের ফ্যানের প্রোবায়োটিক পুষ্টিতে জুড়িয়ে যায় প্রাণ। দেশের উত্তর-পূর্বের মণিপুর, নাগাল্যান্ড ঘুরে জাপান-তাইল্যান্ড-ইন্দোনেশিয়া ছুঁয়ে এশিয়ার নানা দেশের ঐতিহ্যবাহী কিছু শরবতের কথা জেনে নেওয়া যাক।

আমের শরবত, কেশর মালাই, রোজ় মালাই এমন নানা শরবতের সঙ্গে পরিচিতি রয়েছে। কিন্তু যদি বলা হয় 'মুগিচা', তা হলে অবাকই হতে হবে। জাপানের এই শরবত কিন্তু আসলে তৈরি হয় বার্লি দিয়ে। আবার ধরা যাক, তাইল্যান্ডের 'নাম মাতুম'। নামটি যতই বিচিত্র হোক, আসলে সেটি বেলের পানা বললে ভুল হবে না। ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের কারণে এশিয়ার অনেক দেশের শরবতের সঙ্গে ভারতীয় শরবতেরও আশ্চর্য মিল রয়েছে।

মণিপুরের হেইক্রু ও হেইজৌ

মণিপুরের স্থানীয় শরবত।

মণিপুরের স্থানীয় শরবত।

পাহাড়ি আমলকি দিয়ে তৈরি খাসা পানীয়। সেখানে আবার হেইজৌ জুসও বেশ জনপ্রিয়। সেটি তৈরি হয় বুনো আপেল দিয়ে। গরমে এক ধরনের টক-মিষ্টি ফল পাওয়া যায়, যাকে স্থানীয়েরা বলেন হেইজৌ, অর্থাৎ বুনো আপেল। হেইজৌ ফলগুলিকে ভাল করে ধুয়ে সেদ্ধ করে নিয়ে চটকে নিতে হয়। তার পর এর সঙ্গে ঠান্ডা জল, পুদিনাপাতা, চিনি বা মিছরির গুঁড়ো, সামান্য গোলমরিচ মিশিয়ে ও বরফ দিয়ে তৈরি হয় গরমের শরবত। হেইক্রুতে আবার মেশানো হয় আমলকি। এর রস বার করে ছেঁকে নিয়ে তার সঙ্গে আখের গুড় বা মিছরি, সামান্য আদার রস, ভাজা মশলা দিয়ে তৈরি হয় মিষ্টি শরবত। খেতে ভাল, আবার পুষ্টিকরও।

নাগাল্যান্ডের থেইসো জুস

নাগাল্যান্ডের থেইসো জুস।

নাগাল্যান্ডের থেইসো জুস।

নাগাল্যান্ডের উপজাতীয় মানুষেরা গরমে শরীর ঠান্ডা রাখতে এবং পেটের রোগ দূর করতে বুনো ডুমুর দিয়ে শরবত বানান, যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে ‘থেইসো’। ডুমুরগুলি ছাড়িয়ে ভাল করে শিলে বেটে নেওয়া হয়। তার ক্বাথের সঙ্গে সামান্য জল মিশিয়ে তাতে খাঁটি মধু বা মিছরি, বিটনুন মিশিয়ে শরবত তৈরি করা হয়। রোগ প্রতিরোধ শক্তি বৃদ্ধিতে এই শরবত খুবই উপকারী।

তাইল্যান্ডের নাম মাতুম

তাইল্যান্ডের নাম মাতুম।

তাইল্যান্ডের নাম মাতুম।

‘নামে কী আসে যায়’, এ কথা এখানে সত্য। নামটি যা-ই হোক না কেন, আসলে এটি বেলের পানা। গরমে বেলের শরবত বেশ জনপ্রিয় তাইল্যান্ডে। তফাৎ একটাই। এখানে কাঁচা বেল দিয়ে পানা বানানো হয়, আর তাইল্যান্ডে তা তৈরি হয় শুকনো বেলের টুকরো দিয়ে। আগুনে হালকা সেঁকে নিয়ে তার পর জলে দিয়ে ফোটানো হয়। জলের রং বদলে গাঢ় সোনালি হলে তাতে চিনি বা মিছরি ও সামান্য নুন মিশিয়ে আরও খানিকটা ফোটানো হয়। তার পর ছেঁকে নিয়ে বরফ মিশিয়ে পরিবেশন করা হয়।

ইন্দোনেশিয়ার এস চেন্দল

ইন্দোনেশিয়ার এস চেন্দল।

ইন্দোনেশিয়ার এস চেন্দল।

মিষ্টি শরবত। স্থানীয় ভাষায় ‘এস’ অর্থে বরফ। সবুজ চেন্দল জেলি বা নুডল্‌স, ঘন নারকেলের দুধ, তরল পাম সুগার বা গুড়ের সিরাপ দিয়ে তৈরি হয় এই শরবত। একটি পাত্রে পাম সুগার বা গুড়ের সিরাপ, পান্ডান পাতা, নুন ও জল দিয়ে ভাল করে ফোটাতে হবে। ঘন সিরাপের মতো তৈরি হলে তা নামিয়ে ঠান্ডা করতে হবে। অন্য একটি প্যানে রঙিন নুডল্‌স, আরও খানিকটা পান্ডান পাতা, নারকেলের দুধ ও নুন দিয়ে নেড়েচেড়ে নিতে হবে। এ বার জেলি তৈরির জন্য একটি পাত্রে জল, কর্নস্টার্চ, ফুড কালার মিশিয়ে ঘন করে জ্বাল দিয়ে তাতে আগে থেকে বানিয়ে রাখা সিরাপ ও নুডল্‌সের মিশ্রণ দিয়ে বরফ ছড়িয়ে পরিবেশন করতে হবে।

চিনের সোয়ানমেটাং

চিনের সোয়ানমেটাং।

চিনের সোয়ানমেটাং।

এটি এক ধরনের টক-মিষ্টি শরবত। শুকনো আলুবোখরা, শুকনো কুল, কমলালেবুর খোসা ও মিছরি দিয়ে বানানো হয় এই শরবত। আলুবোOখরা ও কুল ভাল করে ধুয়ে ফোটাতে হয় দীর্ঘ সময়। এর পরে তাতে কমলালেবুর খোসার নির্যাস ও মিছরি মেশানো হয়, যাতে টক-মিষ্টি স্বাদ আসে। চিনের নানা জায়গায় এই শরবতটি বানানোর প্রক্রিয়া ভিন্ন। স্থানীয় আরও কিছু উপকরণও দেওয়া হয় এতে।

জাপানের মুগিচা

জাপানের মুগিচা।

জাপানের মুগিচা।

ভাজা বার্লির চা জাপানে খুব জনপ্রিয়। স্থানীয় ভাষায় একেই বলে মুগিচা। ২ চামচ বার্লি শুকনো খোলায় ভেজে নিতে হয় আগে। এর পর জল ফুটিয়ে তাতে ভাজা বার্লি মিশিয়ে ঢাকা দিয়ে রাখতে হয় কিছু ক্ষণ। মিশ্রণটি ছেঁকে নিয়ে তাতে মুগিচা টি-ব্যাগ মিশিয়ে আরও কিছু ক্ষণ রেখে ফ্রিজে রেখে দিতে হয়। জাপানিরা এই চায়ে চিনি দেন না, বরফ দিয়ে ঠান্ডা অবস্থায় এটি খাওয়া হয়।

ফিলিপিন্সের সালাবত

ফিলিপিন্সের সালাবত।

ফিলিপিন্সের সালাবত।

আদা-লেমনগ্রাস দিয়ে তৈরি ঠান্ডা বরফ চা। এই পানীয় বেশ জনপ্রিয় ফিলিপিন্সে। একটি পাত্রে জলের সঙ্গে আদা এবং লেমনগ্রাস দিয়ে ১৫ মিনিট খুব ভাল করে ফুটিয়ে ঢেকে রেখে দিতে হয়। এ বার আদা-লেমনগ্রাসের লিকারটি ছেঁকে ঠান্ডা করে ততে মধু, লেবুর রস এবং প্রচুর বরফকুচি মিশিয়ে পরিবেশন করা হয়।

মালয়েশিয়ার এয়ার বান্দুং

মালয়েশিয়ার এয়ার বান্দুং।

মালয়েশিয়ার এয়ার বান্দুং।

ভারতের গোলাপের শরবতের মতোই। যে কোনও উৎসবে ও অতিথি আপ্যায়নে এটি দেওয়ার রেওয়াজ রয়েছে। একটি পাত্রে ঠান্ডা জলের সঙ্গে কনডেন্সড মিল্ক খুব ভাল করে মিশিয়ে তাতে সুগন্ধি রোজ় সিরাপ দিয়ে ভাল করে নাড়তে হয়। এ বার তাতে বরফ মিশিয়ে পরিবেশন করা হয়।

তাইওয়ানের উইন্টার মেলন পাঞ্চ

তাইওয়ানের উইন্টার মেলন পাঞ্চ।

তাইওয়ানের উইন্টার মেলন পাঞ্চ।

পাকা চালকুমড়ো জ্বাল দিয়ে তৈরি শরবত। তাইওয়ানে খুবই জনপ্রিয় এই পানীয়। চালকুমড়োর টুকরোগুলো ব্রাউন সুগার বা গুড় দিয়ে অল্প জলে ফুটিয়ে সিরাপ বানিয়ে নেওয়া হয়। এই সিরাপটি ছেঁকে তাতে ঠান্ডা জল এবং বরফকুচি মিশিয়ে তৈরি করা হয় শরবত। পেট ঠান্ডা রাখতে ও লিভারের রোগ সারাতেও খাওয়া হয় এই শরবত।

Summer Drinks Traditional summer drinks of india healthy drink
Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy