টানা ন’ঘণ্টা অপারেশন থিয়েটারে দাঁড়িয়ে শিখছেন তিনি। অনুজপ্রতিম এক চিকিৎসকের মেরুদণ্ডের জটিল অস্ত্রোপচার চলছে। আর ওঁঁর মনে হচ্ছে, মেরুদণ্ডের খুঁটিনাটি কিছু বিষয় তো এখনও জানা হয়নি!

অতএব, নিরন্তর চলছে শিক্ষাপর্ব। শিক্ষার্থীর বয়স নব্বই। তাতে কী? “শেখার কোনও বয়স আছে নাকি?” হাসতে হাসতে নিজেই বলছেন। এবং তাঁকে যত দেখছেন, তত আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছেন চিকিৎসাশাস্ত্রের পড়ুয়া, শিক্ষক থেকে শুরু করে হাসপাতালের কর্তা, এমনকী স্বাস্থ্য দফতরের তাবড় আমলারা।

দিন কয়েক আগে যেমন এসএসকেএমে হয়েছে। ঋজু ভঙ্গিতে গ্যালারিটা ঘুরে দেখছিলেন তিনি, কারও সাহায্য না নিয়ে। যাঁর নামে গ্যালারি, তাঁকেই এ ভাবে সামনে পেয়ে পড়ুয়ারা তো অভিভূত। শিক্ষক-চিকিৎসকেরা জানালেন, জীবদ্দশায় এ হেন কিংবদন্তি হয়ে উঠতে তাঁরাও কাউকে বিশেষ দেখেননি। যাঁকে নিয়ে এত আলোচনা, তাঁর অবশ্য স্তুতিতে ভ্রূক্ষেপ নেই। তিনি জানেন, শুধু এসএসকেএমের ওই গ্যালারি নয়, ভিন রাজ্যের এক মেডিক্যাল   কলেজের অ্যানাটমি বিভাগটিও চালু হয়েছে তাঁর নামে। কলকাতার এক বেসরকারি মেডিক্যাল কলেজের অ্যানাটমি বিভাগে ওঁঁর নামাঙ্কিত চেয়ারও রয়েছে।

তিনি অধ্যাপক অসীম দত্ত। নব্বই বছরের যে অ্যানাটমি-বিশারদ এখনও ছাত্র পড়াতে ভালবাসেন। মেডিক্যাল-পড়ুয়াদের জন্য এখনও যাঁর লেখালেখি অব্যাহত। এবং বয়সের তোয়াক্কা না-করে যিনি মানবশরীরের গূঢ় রহস্য নিয়ে নতুন বই লেখায় হাত দিয়েছেন। ডাক্তারদের সম্পর্কে সমাজের বিভিন্ন স্তরে যখন নানা অবিশ্বাস, অশ্রদ্ধা বাসা বাঁধছে, তখন ভাবমূর্তি রক্ষার তাগিদে প্রবীণ এই শিক্ষকের উজ্জ্বল উপস্থিতিকে সামনে তুলে ধরতে রাজ্যের স্বাস্থ্য দফতর বিলক্ষণ আগ্রহী

প্রসঙ্গত, কিছু দিন আগে প্রখ্যাত এক প্রবীণ চিকিৎসক রাজ্য সরকারকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, পশ্চিমবঙ্গের মেডিক্যাল শিক্ষাকে তাঁর এখনও অনেক কিছু দেওয়ার আছে।    নবতিপর সেই চিকিৎসক মণি ছেত্রী অধ্যাপনায় উৎসাহ প্রকাশ  করেছিলেন। ওঁর আগ্রহকে সম্মান জানিয়ে স্বাস্থ্য দফতর বিশেষ নির্দেশিকা জারি করে তাঁকে নিজের সময়-সুবিধামতো এসএসকেএমে এসে  ক্লাস নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে।   একই ভাবে অসীমবাবুর মতো ব্যক্তিত্বকেও এখনকার পড়ুয়াদের সামনে আনার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য-কর্তারা। তাঁদের বক্তব্য: মূল্যবোধের যে সমস্যা এখন চারপাশ থেকে উঠে আসছে, বিশেষত এনআরএস ছাত্রাবাসে কোরপান শাহকে পিটিয়ে মারার ঘটনা তরুণ চিকিৎসকদের যে ভাবে নানা প্রশ্নচিহ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে, তাতে অসীমবাবুর মতো শিক্ষকদের খুব বেশি করে প্রয়োজন। রাজ্যের স্বাস্থ্য-শিক্ষা অধিকর্তা সুশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথায়, “অসীমবাবু যে রকম ব্যস্ত, তাতে আমাদের কতটা সময় দিতে পারবেন জানি না। কিন্তু ওঁর কাছে আমরা আর্জি জানাব, যদি উনি মাঝে-মধ্যে কিছুটা সময় আমাদের দেন।”

অসীমবাবুর তরফেও আগ্রহের কমতি নেই। তিনি জানিয়েছেন, সরকার এমন প্রস্তাব দিলে অবশ্যই ভেবে দেখবেন। যদিও সার্বিক ভাবে চিকিৎসকদের মূল্যবোধে টান পড়েছে, এ কথা তিনি বিশ্বাস করেন না। “আমি এমবিবিএস পড়তে ঢুকেছি ব্রিটিশ আমলে। পড়া শেষ করেছি স্বাধীন ভারতে। কত পরিবর্তন দেখলাম! কত প্রজন্মকে পড়ালাম! আমি মনে করি না যে, ডাক্তারদের মধ্যে মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে। দু’-একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হয়তো ঘটতে পারে। কিন্তু সেটাই একমাত্র সত্য নয়।” বলছেন তিনি।

তবে এ কথা সত্য যে, নিজের কাজের ক্ষেত্রে জীবদ্দশায় কিংবদন্তী হয়ে উঠেছেন অসীম দত্ত। এমবিবিএসে ভর্তি হয়েছিলেন ১৯৪৪-এ। ১৯৫৩-য় শিক্ষকতা শুরু, তাতে এখনও ছেদ পড়েনি। বর্তমানে নেপালের এক মেডিক্যাল কলেজের এমেরিটাস অধ্যাপক। কলকাতার কেপিসি মেডিক্যাল কলেজে তাঁর নামে চেয়ার রয়েছে। তাঁর সম্মানে অন্ধ্রপ্রদেশের রাজীব গাঁধী ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্সেস-এর অ্যানাটমি বিভাগটির নাম হয়েছে ‘দত্তস স্কুল অফ অ্যানাটমি।’ অ্যানাটমিক্যাল সোসাইটি অফ ইন্ডিয়া সদ্য তাঁর জীবনভরের অবদানকে বিশেষ স্বীকৃতি দিয়েছে। সোসাইটির সদস্যদের মতে, অ্যানাটমি’র মতো একটা মৃত বিষয়কে জীবন্ত করে তুলতে ওঁর জুড়ি নেই। তাই অসীমবাবুর সারা জীবনের কাজ নিয়ে এসএসকেএম তথা ইনস্টিটিউট অফ পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিক্যাল এডুকেশন অ্যান্ড রিসার্চ-এর নতুন অ্যাকাডেমিক ভবনে একটা গ্যালারি চালু করেছে তারা।

এত সম্মান, এত স্বীকৃতির প্রসঙ্গ উঠলে নব্বইয়ের যুবক শিশুর মতো হাসেন। বলেন, “কাজ শিখেছিলাম সার্জন ললিতমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। যিনি রবীন্দ্রনাথ ও সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণনের অপারেশন করেছিলেন। মাটির মানুষ ছিলেন। পরবর্তী সময়ে যা যা শিখেছি, ছাত্রদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছি।”

আর এ প্রসঙ্গেই বর্তমান মেডিক্যাল শিক্ষার মান নিয়ে কিছুটা যেন আক্ষেপের সুর বেজে ওঠে প্রবীণ শিক্ষকের গলায়। “এখন তো বহু ক্ষেত্রেই সত্যিকারের মৃতদেহ নিয়ে কাটা-ছেঁঁড়া হয় না। সবটাই চলে নকল কঙ্কালের উপরে।” পর্যবেক্ষণ তাঁর। এই জন্যই ছেলে-মেয়েরা অনেক কিছু শিখতে পারছে না বলে উনি মনে করছেন। অসীমবাবুর মন্তব্য, “রোগীকে ক্লিনিক্যালি পরীক্ষা করে ওরা অনেক কিছু বুঝতে পারছে না বলেই বাইরের পরীক্ষা-নিরীক্ষার উপরে এতটা নির্ভর করতে হচ্ছে। এটা দুর্ভাগ্যজনক।”

ওঁর কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়লেন প্যাথলজিস্ট সুবীর দত্ত। অসীমবাবু ছিলেন ওঁর ‘সিনিয়র’ দাদা। “নিজের বিষয়ে এমন দখল সচরাচর দেখা যায় না। এখন বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজে যাঁরা বিভাগীয় প্রধান, তাঁরা মূলত ওঁরই ছাত্র।” জানাচ্ছেন সুবীরবাবু। বছরখানেক আগে সুবীরবাবুর মেরুদণ্ডে অস্ত্রোপচার হয়েছিল। অসীমবাবু তখনই ওটি’তে হাজির হয়ে মনোযোগী ছাত্রের ভূমিকা নেন। “এই বয়সেও এমন জ্ঞানের স্পৃহা! অবিশ্বাস্য!” এখনও সুবীরবাবুর ঘোর কাটছে না। অসীমবাবুর ছাত্র তথা ইউরোলজিস্ট অমিত ঘোষও চাইছেন, স্যার আরও বেশি করে সামনে আসুন। তিনি বলেন, “এখন ডাক্তারদের মধ্যে দায়বদ্ধতার বড় বেশি অভাব। তাই ওঁর মতো মানুষকে খুব বেশি দরকার। সারাটা জীবন উনি শুধু ছাত্রদের জন্য উৎসর্গ করে গেলেন! কখনও বিনিময়ে কিছু পাওয়ার কথা ভাবলেন না!”

চারপাশে ডাক্তারি পেশায় এত বেশি বাণিজ্যকরণ! সেই কারণেই অসীম দত্তের মতো একটা উজ্জ্বল নজির চিকিৎসক-সমাজের সামনে থাকা একান্ত জরুরি বলে ওঁরা মনে করছেন।