বহুরূপে সম্মুখে তিনি!

পেশাগত পরিচয়ে তিনি স্টেন্ট সরবরাহকারী সংস্থার সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু তার বাইরেও তাঁর প্রভাবের বৃত্তটি বেশ প্রসারিত। আউটডোর কার্ড ছাড়াই রোগীকে রাজ্যের সেরা সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অস্ত্রোপচার করানোর নিশ্চয়তা দেন। আকছার অবাধে ঢুকে পড়েন অপারেশন থিয়েটারে। আবার কখনও বা আলিপুরের নার্সিংহোমে বসে রোগীদের জন্য ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করেন। তিনি আফতাব খান। নিজের পরিচয় দেন, এসএসকেএমের কার্ডিওলজি বিভাগের প্রধান চিকিৎসক শিবানন্দ দত্তের ‘সহকারি’ হিসেবে।

এক গরিব রোগিণীর আত্মীয়ার পরিচয় দিয়ে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির জন্য এসএসকেএমে ভর্তির ‘অজুহাতে’ রবিবার তাঁকে ফোন করা হয়েছিল। তখন বিকেল পাঁচটা। তাঁকে বলা হল, ওই গরিব রোগিণীকে এক জেলা হাসপাতাল থেকে রেফার করা হয়েছে। টেলিফোনে শুনে আফতাব জানালেন, আউটডোরের কার্ড করানোর প্রয়োজন নেই। শুধু হাসপাতালে এসে তাঁকে একটা ফোন করলেই হবে। সোমবার ভর্তি। মঙ্গল বা বুধবারেই অস্ত্রোপচার। হার্টে একটা ব্লক থাকলে অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টির জন্য খরচ পড়বে ৪০ হাজার টাকা। ভর্তির দিন ওষুধপত্র বাবদ আরও হাজার দুয়েক সঙ্গে রাখতে হবে।

তা হলে যে মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন সব ফ্রি? আফতাব বলেন, ‘‘এখনও পর্যন্ত সরকারি হাসপাতালে কিছুই ফ্রি নয়।’’

বিপিএল স্টেন্ট? সেটা তো অনেক আগেই চালু হয়েছে। তাঁর জবাব, ‘‘না, সেটাও পাওয়া যাচ্ছে না। ফ্রি পেতে গেলে অনেক সময় লাগবে। ভেবে দেখুন কত দিন অপেক্ষা করতে পারবেন।’’ শিবানন্দবাবু বিষয়টি সম্পর্কে জানেন তো? আফতাবের উত্তর, ‘‘তিনিই তো চিকিৎসাটা করবেন।’’

কী বলছেন শিবানন্দবাবু নিজে? সোমবার তিনি বলেন, ‘‘এ রকম কিছু তো শুনিনি।’’ পরে অবশ্য তিনি জানান, ফ্রি চিকিৎসা নিয়ে এখনও নানা ধোঁয়াশা রয়েছে।

অতএব প্রশ্ন ওঠে, আড়াই মাস হল মুখ্যমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন, সরকারি হাসপাতালে কোনও চিকিৎসার জন্যই আর খরচ লাগবে না। স্টেন্ট বসানো ফ্রি হতে যদি আরও কিছু দিন সময় লাগে, তা হলেও প্রশ্ন থেকে যায়, বিপিএল স্টেন্ট তো চালু হয়ে গিয়েছে আরও অনেক আগে। বিভিন্ন হাসপাতালে গরিব রোগীরা নিখরচায় সেই স্টেন্ট পাচ্ছেন। তা হলে এক গরিব রোগিণীকে এসএসকেএমে ৪০ হাজার টাকা নিয়ে আসতে বলা হল কেন? যেখানে ওষুধপত্রের জন্য কোনও খরচ করতে হবে না বলে একাধিক বার ঘোষণা হয়েছে, সেখানে কেন ওষুধের জন্যও আলাদা করে টাকা আনতে বলা হচ্ছে?

সারদা-কাণ্ডে ধৃত তৃণমূলের প্রাক্তন মন্ত্রী মদন মিত্রের চিকিৎসার দায়িত্বে থেকে কিছুদিন আগেই নানা মহলের সমালোচনায় জেরবার হয়েছেন শিবানন্দবাবু। তাঁর নাম ব্যবহার করে দালালচক্রের এই ‘সক্রিয়তার’ অভিযোগ প্রথমে উড়িয়ে দেন তিনি। তাঁকে জানানো হয়, আফতাব খানের সঙ্গে সমস্ত কথোপকথন রেকর্ড করা রয়েছে। বিষয়টিতে তাঁর নাম জড়ানোয় তাঁর ভাবমূর্তিও তো ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তখন তিনি বলেন, ‘‘কে আমার নাম করে কী বলছে, সেটা আমার জানার কথা নয়। এ নিয়ে আর কোনও কথা বলব না।’’

আফতাব খান সম্পর্কে ইতিমধ্যেই স্বাস্থ্যকর্তাদের কাছে অভিযোগ পৌঁছেছে। ওই ব্যক্তিকে চেনেন এসএসকেএমের কর্তারাও। তা হলে সব জেনেও তাঁরা চুপ করে আছেন কেন?

হাসপাতালের এক কর্তা বলেন, ‘‘শুধু এসএসকেএম নয়, বিভিন্ন সরকারি হাসপাতালে এমন অনেক আফতাব-রা রয়েছেন। নজরদারির অভাবে যারা যথেচ্ছাচার করে চলেছেন। ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে। ডাক্তারদের একটা অংশও এর সঙ্গে যুক্ত।’’এসএসকেএমের অধিকর্তা মঞ্জু বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য দাবি করেছেন, এমন কোনও অভিযোগ তাঁর কাছে আসেনি।

এসএসকেএমে পেসমেকার, স্টেন্ট নিয়ে অস্বচ্ছতার অভিযোগ এই প্রথম নয়। আরও এক বিভাগীয় প্রধান, তিনি অবশ্য এখন অবসর নিয়েছেন, স্টেন্ট বিতর্কে জড়িয়েছিলেন। সে নিয়ে তদন্তও হয়েছিল। দিন কয়েক আগে হাসপাতালেরই এক অনুষ্ঠানে তৃণমূল নেতা তথা রাজ্য মেডিক্যাল কাউন্সিলের সভাপতি নির্মল মাজি জানিয়েছিলেন পেসমেকার, স্টেন্ট নিয়ে ওখানে নানা দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। হাসপাতালের চিকিৎসকদের একাংশও তার সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ করেছিলেন তিনি। স্বভাবতই প্রশ্ন উঠেছিল, তৃণমূলের এই চিকিৎসক-নেতা, যাঁর নিজের বিরুদ্ধেই একাধিক অভিযোগ ঝুলছে, আচমকা চিকিৎসকদেরই একাংশের বিরুদ্ধে আচমকা এমন ভাবে সরব হলেন কেন? হাসপাতালের এক কর্তা এ দিন বলেন, ‘‘নানা কারণে কিছু চিকিৎসকের উপরে নিয়ন্ত্রণ রাখতে পারছেন না নির্মলবাবু। বনিবনা হচ্ছে না তাঁর। হয়তো সেই কারণেই তাঁর ক্ষোভ।’’ এ দিন নির্মলবাবু নিজে অশ্য বলেছেন, নিয়ন্ত্রণের কোনও প্রশ্ন নেই। তিনি সামগ্রিক ভাবে সকলের জন্যই ওই মন্তব্য করেছিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘পিজি-তে কিছু চিকিৎসক বিশেষ সংস্থার ওষুধ এবং সরঞ্জাম কেনার জন্য রোগীর বাড়ির লোকদের জোর করছেন। এটা বন্ধ হওয়া জরুরি।’’