• পারিজাত বন্দ্যোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে পিজিতে পঙ্গু ‘শিশু সাথী’

patient
—ফাইল চিত্র।

সরকারি স্তরে যথাযথ পরিকল্পনা, পরিচালনা আর পরিকাঠামোর অভাবে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাধের ‘শিশু সাথী’ প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে স্বাস্থ্য দফতরের ভিতর থেকেই।

সদ্যোজাত থেকে আঠেরো বছর বয়সী ছেলেমেয়েদের হৃদ্যন্ত্রে কোনও সমস্যা হলে নিখরচায় তাদের চিকিৎসা ও অস্ত্রোপচারের সুবিধা দেওয়ার কথা ‘শিশু সাথী’ প্রকল্পে। ২০১২-র ১৫ অগস্ট ঘটা করে ঘোষণা করা হয় এই প্রকল্প। কাজ শুরু হয় ২০১৩-র মাঝামাঝি থেকে। প্রকল্পের আওতায় আনা হয় সরকারি হাসপাতালের মধ্যে শুধু এসএসকেএম এবং চারটি বেসরকারি হাসপাতালকে।

কিন্তু এখন স্বাস্থ্যকর্তাদের বেশির ভাগই স্বীকার করছেন, একটি মাত্র সরকারি হাসপাতালকে বাছা ভুল সিদ্ধান্ত হয়েছিল। দরকার ছিল অন্তত আর একটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজকে তালিকাভুক্ত করা। এখনও পর্যন্ত তা না হওয়ায় ভুগছে অসুস্থ শিশুরা। মাসের পর মাস অস্ত্রোপচারের তালিকায় নাম লিখিয়ে তাঁদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে। অনেকে অস্ত্রোপচারের জন্য এসএসকেএমে ভর্তি হলেও মাস পার হয়ে যাচ্ছে, মিলছে না অস্ত্রোপচারের তারিখ।

স্বাস্থ্য দফতরের হিসেব বলছে, ২০১৩-র ১৬ জুলাই থেকে ২০১৫-র ২০ মার্চ, এই ১ বছর ৮ মাসে এসএসকেএমে শিশু সাথী প্রকল্পে মোট ৬৪৫ জনের নাম অস্ত্রোপচারের জন্য তালিকাভুক্ত হয়। এর মধ্যে সাকুল্যে মাত্র ৭২ জনের অস্ত্রোপচার হয়েছে। বাকি ৫৩৭টি শিশুর কেউ অপেক্ষা করছে এক বছর, কেউ আট বা ছ’মাস। এই মুহূর্তে অস্ত্রোপচারের জন্য এসএসকেএমে ভর্তি রয়েছে ১১টি শিশু। বর্ধমানের উদয়গঞ্জের দশ বছরের মিন্টু খাতুন, মুর্শিদাবাদের সালিন্দার ছয় বছরের শিবক দাস, দক্ষিণ বারাসতের দেড় বছরের রূপম মোদকের মতো শিশুরা কেউ দেড় মাস, কেউ পঁচিশ দিন ভর্তি থাকার পরেও পাচ্ছে না অস্ত্রোপচারের তারিখ। সংসার ছেড়ে মায়েরাও বাচ্চাদের সঙ্গে পড়ে রয়েছেন হাসপাতালে। একাধিক স্বাস্থ্যকর্তা স্বীকার করছেন, এই পরিস্থিতি হলে তো প্রকল্পটির কোনও অর্থই থাকে না। যাদের সুবিধা পাওয়ার কথা, চূড়ান্ত হেনস্থা হচ্ছে তারাই।

অথচ, স্বাস্থ্য দফতরের রিপোর্টই বলছে, তালিকাভুক্ত চারটি বেসরকারি হাসপাতালের প্রতিটিতেই মাসে এই প্রকল্পের আওতায় থাকা ৪০-৫০টি করে শিশুর অস্ত্রোপচার হচ্ছে। শুধুমাত্র এসএসকেএমের জন্য এই প্রকল্প সাফল্যের মুখ দেখতে পাচ্ছে না। স্বাস্থ্যকর্তারাও স্বীকার করছেন, এসএসকেএমের চিকিৎসক বা কর্তৃপক্ষের গাফিলতি নয়, এর জন্য দায়ী হল একটি সরকারি হাসপাতালের উপরে সব কিছু চাপিয়ে দেওয়ার ভুল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। এসএসকেএমের অধ্যক্ষ প্রদীপ মিত্রের মতে, কলকাতা-সহ গোটা রাজ্য থেকে রোজ অসংখ্য করোনারি বাইপাস, হার্ট ভাল্ভ প্রতিস্থাপন, অ্যাঞ্জিওগ্রাফি, অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি এবং ইমার্জেন্সি হার্ট অ্যাটাক, দুর্ঘটনাগ্রস্ত রোগী এসএসকেএমে আসছেন। এ দিকে কার্ডিওথোরাসিকে মাত্র তিনটি ওটি, লোকবলও সামান্য। আরও একটি ওটি না হলে এবং লোকবল পাওয়া না গেলে নিয়মিত শিশু সাথীর অস্ত্রোপচার করা অসম্ভব।

এসএসকেএমের কার্ডিওথোরাসিক বিভাগের প্রধান শুভঙ্কর ভট্টাচার্যের বক্তব্য, “প্রতিদিন আউটডোরে গড়ে ১০ জন করে করোনারি বাইপাসের রোগী আসছেন। হয়তো শিশু সাথীর কোনও বাচ্চার অস্ত্রোপচারের তারিখে কোনও দুর্ঘটনার রোগী এসে গেলেন। আমাদের পক্ষে বিষয়টি কঠিন হয়ে উঠছে।” কার্ডিওথোরাসিকের চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, তাঁদের বিভাগে রেসিডেন্সিয়াল মেডিক্যাল অফিসারের চারটি পদই এখন খালি। নার্স দরকার আরও অন্তত ৬৭ জন, চতুর্থ শ্রেণির কর্মী দরকার আরও ২০ জন। পিজিটি রয়েছেন ১১ জন, দরকার ১৮ জন। চিকিৎসকদের বক্তব্য, “আর একটি ওটি চালু হলেও এই লোকবল না থাকলে শিশু সাথীর অস্ত্রোপচার করা যাবে না।”

কার্ডিওলজির চিকিৎসক অচ্যুৎ সরকার আবার বলেন, “আমাদের বিভাগে পেডিয়াট্রিক ক্যাথল্যাব চালু না হলে পরিস্থিতি বদলাবে না।” এসএসকেএমের আরও অভিযোগ, বিভিন্ন জেলা থেকে শিশু সাথীর নোডাল অফিসারেরা বেশির ভাগ শিশুকে নথিভুক্ত বেসরকারি হাসপাতালগুলির বদলে এসএসকেএমে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। অথচ বেসরকারি হাসপাতালগুলিতে রোগীর চাপ এমনিতে অনেক কম এবং ওটি পরিকাঠামোও যথেষ্ট ভাল।

কিন্তু প্রকল্প পরিচালনায় সমন্বয়ের অভাব হচ্ছে কেন? এসএসকেএম ছাড়া অন্য সরকারি হাসপাতালে শিশু-সাথী প্রকল্পের অস্ত্রোপচার শুরু করা হচ্ছে না কেন?

রাজ্যের স্বাস্থ্য অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথীর বক্তব্য, “এসএসকেএমে কেন এত কম অস্ত্রোপচার হচ্ছে, খতিয়ে দেখছি। তবে বেসরকারি হাসপাতালগুলি শিশু সাথীর জন্য দু’টি করে ওটি রাখছে। এসএসকেএমে কার্ডিওথোরাসিকে কিছু দিনের মধ্যে আরও একটি ওটি শুরু করছি। তা হলে সমস্যা অনেকটা মিটবে।” প্রকল্প বাঁচাতে স্বাস্থ্য দফতর কল্যাণী গাঁধী হাসপাতালেও শিশু সাথী প্রকল্পে অস্ত্রোপচার চালু করার কথা ঠিক করেছে বলেও জানান স্বাস্থ্য অধিকর্তা।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন