হাসপাতাল বলে দিয়েছিল, সদ্যোজাত ছেলে মারা গিয়েছে। সেই মুহূর্তে আর সন্তানের মৃতদেহের দিকে তাকানোর অবস্থা ছিল না মনবোধ মণ্ডলের। কিন্তু সন্দেহের সূত্রপাত, ছেলের দেহ ফেরত দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ‘টালবাহানা’ করায়। বহু চাপাচাপির পরে দেহ ফেরত পেয়ে মনবোধ দেখেন, শিশুর বাঁ কানের উপরে ও মাথায় চাপ বেঁধে রয়েছে রক্ত। গাফিলতিতে মৃত্যুর ঘটনা ধামাচাপা দিতেই দীর্ঘক্ষণ সদ্যোজাতের দেহ আটকে রাখা হয়েছিল—বৃহস্পতিবার এই অভিযোগে তেতে উঠল পুরুলিয়া দেবেন মাহাতো হাসপাতাল চত্বর।

মেডিক্যাল বোর্ড গড়ে অভিযোগের তদন্তের আশ্বাস দিয়েছেন হাসপাতালের সুপার শিবাশিস দাস। কিন্তু কী ভাবে শিশুটি মারা গেল, কেনই বা তার দেহ পেতে দেরি হল আত্মীয়দের—এ সব প্রশ্নের জবাব দেননি। সংশ্লিষ্ট ডাক্তারের বিরুদ্ধে মৃতের পরিবারকে গালিগালাজ করার অভিযোগ নিয়েও মুখে কুলুপ তাঁর। তাই বিরোধীরা মনে করছেন, কলকাতার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যন্ত্রের অতিরিক্ত উত্তাপে পুড়ে দুই সদ্যোজাতের মৃত্যু এ রাজ্যের শিশু-চিকিৎসার হাল নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। পুরুলিয়ার এই ঘটনা ব্যাপারটাকে আরও বেআব্রু করে দিল।

বিষয়টি নিয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় রাজ্যের মা ও শিশু-স্বাস্থ্য সংক্রান্ত টাস্কফোর্সের চেয়ারম্যান ত্রিদিব বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘‘কারও গাফিলতি থাকলে ছাড় পাবেন না। শিশুটি জন্মের সময় কোনও চোট পেয়েছে, না পরবর্তী সময়ে কোনও গাফিলতির জন্য রক্তাক্ত হয়েছে, তা অবশ্যই বেরিয়ে পড়বে।’’ স্বাস্থ্য অধিকর্তা বিশ্বরঞ্জন শতপথীর মন্তব্য, ‘‘এত বড় অভিযোগ অথচ স্বাস্থ্যভবনে তো কেউ জানাননি! এই প্রথম খবর পাচ্ছি। আমি খবর নিচ্ছি। অবশ্যই তদন্ত হবে এবং প্রয়োজনীয় সব দিক খতিয়ে
দেখা হবে।’’

প্রসব-যন্ত্রণা নিয়ে বুধবার সন্ধ্যায় পুরুলিয়ার ওই হাসপাতালে ভর্তি
হন জেলারই নিতুড়িয়া থানার গুনিয়াড়া গ্রামের বাসিন্দা উন্নতি মণ্ডল। তাঁর স্বামী পেশায় প্রাথমিক শিক্ষক মনবোধবাবু জানান, বুধবার রাত ৯টা নাগাদ উন্নতিদেবীর
ছেলে হয়। প্রসূতি বিভাগে মায়ের পাশে সদ্যোজাতকে দেওয়াও হয়। কিন্তু রাত ১১টা নাগাদ বাচ্চাটিকে আচমকা নিয়ে যাওয়া হয় ‘নিওনেটাল ইউনিট’-এ।

মনোবোধবাবুর দাবি, ‘‘ওয়ার্ডে থাকা ডাক্তার এবং নার্স আমাকে বলেন, ওকে চিকিৎসার জন্য নিওনেটাল ইউনিটে নিতে হবে। কিন্তু বাচ্চার কী হয়েছে, তা বলেননি।’’
রাত ১২টা নাগাদ মনবোধ খবর পান, তাঁর ছেলে মারা গিয়েছে। কিন্তু মৃত্যুর কারণ বলা হয়নি। মৃত্যুর কারণ জানতে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার  গালিগালাজ করেন বলে অভিযোগ প্রসূতির আত্মীয়দের। ভেঙে পড়া মনবোধ ছেলের দেহ না দেখেই চলে যান ওয়ার্ড ছেড়ে।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টা নাগাদ মনবোধ ফেরেন প্রসূতি-ওয়ার্ডে। ছেলের মৃতদেহ চান। তাঁর দাবি, ‘‘হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেহ দিতে চাননি। ডাক্তার, নার্সেরা উল্টে বলতে থাকেন, ‘এত ছোট বাচ্চার দেহ কোনও বাড়ির লোক নিতে চায় না’। সন্দেহ হয়। তখনই বলি, ছেলের দেহ না পেলে এক পা-ও নড়ব না।’’

কথা কাটাকাটি গড়ায় বচসায়। শুরু হয় বিক্ষোভ। খবর পেয়ে বিক্ষোভে সামিল হন কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। শেষ পর্যন্ত বেলা ১২টা নাগাদ শিশুটির দেহ হাতে পায় রোগীর পরিবার। কিন্তু তখনই তাঁদের বলতে শোনা যায়, ‘‘বাচ্চাটাকে খুন করা হয়েছে।’’

বিধি অনুযায়ী, মৃত্যুর পরে চার ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেই পরিবারের হাতে দেহ তুলে দেওয়ার কথা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের। এ ক্ষেত্রে তেমন হল না কেন? সুপারের জবাব, ‘‘মেডিক্যাল বোর্ড গড়ে ওই সদ্যোজাতের মৃত্যুর অভিযোগের তদন্ত হবে। শুক্রবার (আজ) ময়না-তদন্ত হবে।’’

তিন মেয়ের পরে ছেলে হয়েছিল উন্নতিদেবীর। সন্তানহারা মা শুধু বলে চলেছেন, ‘‘বিচার চাই! কী কারণে ছেলে মারা গেল, জানতে চাই!’’