• 1
  • নিজস্ব সংবাদদাতা
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

চিকিত্‌সক কোথায়, সঙ্কট পাড়া ব্লকে

  • 1

সবেধন একজন চিকিত্‌সক। তিনি ছুটিতে গেলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের অন্তর্বিভাগ ও বহির্বিভাগের রোগীদের ভরসা নার্সরা। নেই ফার্মাসিস্টও। তাঁর জায়গায় ওষুধ বিলি করেন চতুর্থশ্রেণির কর্মীরা। এমনই অব্যবস্থা চলছে পাড়া ব্লকের নডিহা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে। ফলে ন্যূনতম স্বাস্থ্য পরিষেবা নিয়েও সমস্যায় পড়েছেন পাড়া ব্লকের নডিহা-সুরুলিয়া, বহড়া, উদয়পুর-জয়নগর এই তিনটি পঞ্চায়েতের বাসিন্দারা

টানা পাঁচ ঘণ্টা সন্তানসম্ভবা স্ত্রীকে নিয়ে চিকিত্‌সকের অপেক্ষায় ছিলেন তেতুলদাঁড়া গ্রামের সন্তোষ রায়। অপেক্ষা করে ফিরতে হয়েছে তাঁকে। ছেলের পেট ব্যথা হওয়ায় স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসেছিলেন নডিহার মনোজ বন্দ্যোপাধ্যায়। চিকিত্‌সক না থাকায় তাঁদের দু’জনকেই বাধ্য হয়ে অন্যত্র ফিরে যেতে হয়েছে। একই ঘটনা রাওতোড়া গ্রামের বিপত্তারণ ভট্টাচার্যের। অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে এসে ফিরে যেতে হয়েছে চিকিত্‌সক না থাকায়। তিনটি ঘটনাই ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রের। কার্যত মাঝে মধ্যেই এই দৃশ্য এখানে দেখা যায়। তবে শুধু নডিহা নয়, পাড়া ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র-সহ আশপাশের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলিও এখন চিকিৎসক নেই, কম় নেই-এর সঙ্কটে কমবেশি ভুগছে।

এখানে ১০ শয্যার অন্তর্বিভাগ রয়েছে। দু’জন চিকিত্‌সকের থাকার কথা। কিন্তু রয়েছেন মাত্র একজন। কোনও চিকিত্‌সকের পক্ষেই মাসে ৩০ দিন থাকা কাজে সম্ভব নয়। ফলে একমাত্র চিকিত্‌সক এনামুল হাঁসদা ছুটিতে গেলেই চিকিত্‌সকহীন হয়ে পড়ে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র। কর্মীরা জানাচ্ছেন, এখানে অন্তর্বিভাগ থাকায় আগে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রে দু’জন চিকিত্‌সক ছিলেন। কিন্তু মাস ছয়েক আগে পাড়া ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একটি গোলমালের জেরে নডিহা থেকে এক চিকিৎসককে সেখানে পাঠানো হয়। তারপর থেকে বদলি হিসেবে নতুন কোনও চিকিৎসককে এখানে পাঠানো হয়নি। তারপর থেকেই মাত্র একজন চিকিত্‌সকের ভরসাতেই চলছে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র।

নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক কর্মী জানান, অন্তর্বিভাগে ১০টি শয্যা থাকায় আগে এখানে প্রচুর রোগী ভর্তি হতেন। এখন সংখ্যাটা কিছুটা কমলেও প্রায়দিনই অন্তর্বিভাহে ২৫-৩০ জন ভর্তি থাকেন। কিন্তু ওই রোগীদেরই বা দেখে কে? প্রশ্ন রোগীর আত্মীয়দের। যাঁরা ভর্তি থাকেন, তাঁদের মধ্যে বেশিরভাগই প্রসূতি। স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, পরিস্থিতির চাপে জটিল অবস্থায় থাকা প্রসূতিদের অন্যত্র স্থানান্তর করে দেওয়া উপায় নেই। তাই এখান থেকে পুরুলিয়া সদর বা রঘুনাথপুর মহকুমা হাসপাতালে হামেশাই রোগীদের স্থানান্তর করতে হয়।

একই চিত্র বহির্বিভাগেও। চিকিত্‌সক না থাকলে বাধ্য হয়ে বহির্বিভাগে বসতে হয় নার্সদের। রোগীদের উপসর্গ দেখে তাঁরা ওষুধ দেন। ফার্মাসিস্ট নেই। ওষুধ বিলি করেন চতুর্থ শ্রেণির কর্মীরা। তবে এ ক্ষেত্রে পেট ব্যথা, সামান্য জ্বর, পেট খারাপের মতো মামুলি রোগেরই দাওয়াই দেওয়া হয়।

বস্তুত নডিহা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র পাড়া ব্লকের বেহাল স্বাস্থ্য পরিষেবার অন্যতম উদাহরণ মাত্র। এমনটাই জানাচ্ছেন জেলা স্বাস্থ্য দফতরের কর্তারাই। তার প্রমাণ মিলছে পাড়ার ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিকের (বিএমওএইচ) বক্তব্যেও। নডিহা প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিত্‌সকের অভাবে স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যাহত হচ্ছে বলে কার্যত স্বীকার করে নিয়েছেন বিএমওএইচ শিবরাম হাঁসদা। কেন নডিহাতে চিকিত্‌সক নেই? শিবরামবাবু জানান, শুধু নডিহাই নয়, চিকিত্‌সকের অভাব গোটা ব্লক জুড়েই। ব্যতিক্রম নয় খোদ পাড়া ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রও।

তিনি বলেন, “ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেই বর্তমানে একজন চিকিত্‌সক হিসাবে আমি রয়েছি। কিছু সমস্যা হওয়ায় নডিহা থেকে একজনকে ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে আনা হয়েছিল। তিনি ব্যক্তিগত কারণে ছুটিতে রয়েছেন। ফলে আমাকেই সব দায়িত্ব সামলাতে হচ্ছে।” জেলা স্বাস্থ্য দফতর সূত্রে জানা গিয়েছে, অন্যান্য ব্লকে এই ধরনের সমস্যায় ব্লকের প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি থেকে জরুরি ভিত্তিতে চিকিত্‌সক এনে কাজ সামলানো হয়। কিন্তু পাড়ার ক্ষেত্রে সেটা সম্ভব নয়।

ব্লক স্বাস্থ্য আধিকারিক জানান, ব্লকের তিনটি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের মধ্যে অসুরবাঁধে দীর্ঘদিন চিকিত্‌সক নেই। সেখানে রোগীদের ওষুধ দেন ফার্মাসিস্ট। ফুসড়াবাইদ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে একজন মাত্র চিকিত্‌সক রয়েছেন। নডিহার ক্ষেত্রেও একই সমস্যা। শিবরামবাবু বলেন, “ব্লকে জনসংখ্যা ২ লক্ষের বেশি। সে তুলনায় চিকিত্‌সকের অভাবের কথা বার বারই জেলায় জানানো হয়েছে। কিন্তু সমস্যা মেটেনি।”.

ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র-সহ অন্যান্য স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিত্‌সকের অভাবে স্বাস্থ্য পরিষেবা ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ মানছেন পাড়ার তৃণমূল বিধায়ক উমাপদ বাউরিও। তিনি বলেন, “চিকিত্‌সকের অভাব রয়েছে গোটা ব্লক জুড়েই। বিষয়টি নিয়ে সম্প্রতি সিএমওএইচের সাথে কথা বলেছি। তিনি ব্লকে পাঁচজন চিকিত্‌সক নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন।”

পুরুলিয়ার সিএমওএইচ মানবেন্দ্র ঘোষ জানান, সম্প্রতি জেলায় ৮৪ জন চিকিত্‌সক নিয়োগের কথা ছিল। কিন্তু তার মধ্যে মাত্র ৩৬ জন কাজে যোগ দিয়েছেন। আবার তাঁদের মধ্যে থেকে ১০ জন উচ্চশিক্ষার জন্য ইস্তফা দিয়ে চলে যাওয়ায় সমস্যা তৈরি হয়েছে। তিনি বলেন, “এই অবস্থায় আমরা জেলার তরফে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে চুক্তির ভিত্তিতে ১৫ জন চিকিত্‌সক নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু করেছি। তার মধ্যে থেকে ২ জনকে পাড়া ব্লক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও নডিহায় পাঠানো হবে।”

কবে সেই চিকিৎসকেরা আসেন, অপেক্ষায় মানুষজন।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন