×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৪ জুন ২০২১ ই-পেপার

দশমহাবিদ্যার আরাধনা

১২ অক্টোবর ২০১৪ ০০:০০

মন চায় না মাকে বিদায় দিতে, চোখ ফেটে জল আসে, মায়ের আঁখিও ছলছল, কিন্তু নহমীর রাত প্রকৃতির অমোঘ নিয়মেই ধীরে ধীরে শেষ হয়ে আসে। দুর্গাপুজোর ক’টা দিন অবিশ্বাস্য দ্রুততায় কী ভাবে ফুরিয়ে যায়। দুর্গাপুজো তো কেবল পুজো নয়, এ যে মানুষের মিলন মেলা। সবাইকে নিয়ে কাজ রতে গেলে মতভেদ, মতদ্বৈত থাকবেই, কিন্তু এ সব ছোটখাটো বিষয়ের থেকেও বড় হয়ে ওঠে এখানে মানুষের সম্মিলন। দুর্গাপুজোয় প্রতিমা-মণ্ডপ, এ সবের পশাপাশি দেকে বেড়াই যে মানুষ! যদি নিজেকে দর্শক মনে করি, তা হলে কত বিচিত্র ঘটনার যে সাক্ষী হতে হয়।

পুজো সবে শুরু হয়ছে। পঞ্চমী হবে। সন্ধে নামতেই গণেশটির বায়নায় অতিষ্ঠ হয়ে পুজোমণ্ডপে গিয়েছি। দেখি, ঢাকির এসে গিয়েছে। তারা এসেছে সেই পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিম মেদিনীপুরের দাঁতন থেকে। পুজোর সময় মুম্বই চলে আসেন এঁরা ঢাক বাজানোর বায়না নিয়ে। একটু বেশি টাকার জন্য পেটের দায়ে এত দূর আসা। তবে এখামে ওঁরা ঢাক বাজয়ে আনন্দই পান, কথা বলে সেই রকমই মনে হল। দেশ গাঁয়ে চাষের কাজ করে দিন গুজরান হয়, এই মুইম্বয়ে ঢাক বাজাতে আসা এ তো বড়ো কম কথা নয়। নতুন জায়গা, নতুন পরিবেশ দেখতে কার না ভাল লাগে?

পাড়ার যে দাকানে মিষ্টি কিনতে নিত্য যাওয়া আসা, সেখানে কয়েক জন বাঙালি ছেলে কাজ করেন। পুজোর মধ্যে এক দিন মিষ্টি কিনতে গিয়ে এক জনকে বললাম, ‘এই কাছেই দুর্গাপুজো। ঘরবাড়ি ছেড়ে এতদূর এসছেন, একবার মণ্ডপে যাবেন। ভোগ খেয়ে আসবেন।’

Advertisement

ম্লান হাসি ফুটে উঠল তাঁর মুখে। “একবার গিয়েছিলাম দিদি। ঠাকুর দেখে এসেছি। কিন্তু আর বোধহয় যাওয়া হবে না। কাজের খুব চাপ। অনেকে ছুটি নিয়েছে।” হয়তো সেই মুহূর্তে তাঁর বাড়ির পাশের দুর্গাপুজোটির কথা মনে হচ্ছিল। মন কী আর বশ মানে! তাক কোনও রকম দাবিয়ে রাখতে হয়। বচ্ছরকার দিনগুলোয় প্রবাসে এত দূর....! ঘরের মানুষগুলোর কথা মন পড়ে বৈকি। কিন্তু উপায় কী! পেটের ভাত যে বড় বালাই। জোগাতেই হয়।



মহাষ্টমীতে সন্ধিপুজোর অঞ্জলি দিতে গিয়েছি। এ বার সন্ধিপুজো সকাল আটটায় ছিল, তাই আমরা যারা পুণ্য সঢ্চয়ের সুযোগগুলো ছাড়চে চাই না, আবার উপবাস করে কঠোর ব্রত পালনেও শরীর বিদ্রাহ করে, তাদের এ বার বেশ সুবিধা হয়েছে। এত সকালে সন্ধিপুজোর অঞ্জলি, এমন সুযোগ আবার কবে পাওয়া যাবে কে জানে! তাই তড়িঘড়ি ছুটেছিলাম মণ্ডপে। গিয়ে দেখি, আমার মতো ারও অনেকেই এমন পুণ্য অর্জনের লোভ সামলাতে পারেননি, তাই বেশ ভিড়। অশক্ত শরীরে এক বৃদ্ধা দাঁড়িয়ে থাকতে পারছিলেন না। তাঁর প্রৌঢ ছেলে চেয়ার এগিয়ে দিলেন মাকে। এই সুদূর মুম্বইয়ে ছেলের কাছে এসে দুর্গাপুজোয় সন্ধিপুজোয় অঞ্জলি দিতে পারছেন, এতেই তিনি যত্‌পরোনাস্তি খুশি।

পরনে তাঁর সাদা কাপড়, আটপৌরে করে পরা। তাঁকে দেখে আমার স্বর্গত ঠাকুমার মুখ মনে পড়ে গেল। আমাদের গ্রামের পুজোয় যে ঠাকুমাকে দেখেছি সিঁথিতে ডগমগে লাল সিঁদূর নিয়ে দশমীর দিন মা দুর্গাকে বরণ করতে যেত, সেই ঠাকুমাই পরে দশমী এলে বড় কষ্ট করে মুখে হাসি আনতেন। তখন অতো তলিয়ে ভাবিনি। আজ বুঝি, ঠাকুমার সিঁথির সিদঁুর অক্ষয় হয়নি, এই ছিল তাঁর বেদনা।

সিঁদুরহীন সিঁথি নিয়ে কী আর সিঁদুর খেলা যায়? জীবনে অনেক কিছু সইয়ে নিতে হয়। শোক-দুঃখও তার ব্যতিক্রম নয়। আর সিঁদুর খেলা? সে তো শুধু সধবাদের জন্য! দূর থেকে দেখে কারও চোখ যদি অশ্রুসজল হয়ে ওঠে, তবে আনন্দময়ী মা-ই মুছিয়ে দেবেন সেই চোখের জল। এই পৃথিবীতে কিছুই যে চিরস্থায়ী নয়। দুঃখ-বেদনা-আনন্দ-হর্ষ-বিষাদ, সব কিছু নিয়েই আমাদের পথ চলা। এরই নাম জীবন। তবে কম বয়সী বিধবাদের কাছে সিঁদুর না-খেলতে পারার বেদনা! উফ্! ভাবা যায় না। মানুষের যে কত কষ্ট! তখন মনে হয়, রীতিটা বড়ো নির্মম।

শোক-দুঃখ অতিক্রম করে অপার শান্তির দিকে ধাবিত হওয়া, এই তো ভারতীয় দর্শনের মূল কথা। আমরা যে কালীরও উপাসক। কালী, যাঁর দক্ষিণ হস্ত আশির্বাদের ভঙ্গিতে উত্তোলিত, বাম হস্তে খড়্গ, গলায় মুণ্ডমালা, রুধির রঞ্জিত করাল বদনা ভয়ঙ্করী। স্বামী বিবেকানন্দ বলেছিলেন তাঁর অভিশাপই আশির্বাদ। আমরা সেই ভয়ঙ্করের উপাসক। তাই শোক বা মৃতপ১কে আমরা ভয় পাব কেন? স্বামীজি বলেছেন,

“it is a mistake to hold that with all men is pleasure is the motive. quite as many are born to seek after paun. let us worship the terror for its own sake.”

আমরা ভয়ঙ্করী কালীর উপাসনা করতে করতেই ভয়কে জয় করব—জয় করব দুঃখ-শোক-কষ্টকে। আর তখনই আমাদের হৃদিপদ্ম মায়ের কালো রূপের আলোর ছটায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠবে। তাই স্বামীজি রচিত কবিতা ‘মৃত্যুরূপা মাতা’য় আমরা পাই এই পংক্তিগুলো--- ‘সাহসে যে দুঃখ দৈন্য চায়, মৃত্যুরে যে বাঁধে বাহুপাশে/কালনৃত্য করে উপভোগ মাতৃরূপা তারই কাছে আসে’।



মা কালীর শরণাগত হওয়ার পর স্বামী বিবেকানন্দ নিজের সঙ্গে কি কম সংগ্রাম করেছিলেন? ছয় বছর ধরে চলেছিল এই যুদ্ধ। কিছুতেই তিনি কালীকে গ্রহণ করেননি যতক্ষণ পর্যন্ত না শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস স্বামীজিকে কালীর তরণে সমর্পণ করিয়েছেন। হ্যাঁ, ঠাকুরই পেরেছিলেন তাঁর বিশুদ্ধ ভগবত্‌ প্রেমে নরেনকে কাছে টেনে নিতে, কালীর অপার মহিমা কাছে উন্মোচিত করতে। স্বামীজি বলছেন, “a slave of you. And Ramakrishna Paramhamsa made me over to her...strange।”

শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংস ছিলেন কালীরই সন্তান। অবতার। তাই গুরু শিষ্যকে চিনতে ভুল করেননি।

কালী মাতৃশক্তি। আবার কালীই ব্রহ্ম। কালী মহামায়া। তারই মায়ায় এক বহু হয়েছে। অতি ক্ষুদ্র লক্ষ লক্ষ কোষ দিয়ে দেহ তৈরি হয়, সেই দেহেই ব্যক্তিত্ব আরোপিত, সেই দেহেই বুদ্ধি, সেই দেহেই চৈতন্য, কিন্তু এই সব কিছু মিলিয়ে কি এক নয়? ‘Unity in complexity?’ সেই রকমই কালী কেন ব্রহ্ম থেকে পৃথক হবেন? কালীই ব্রহ্ম। তিনি এক ও অদ্বিতীয়। এবং তবুও তিনিই আমাদের মা, আমাদের উপাস্য দেবী। স্বামীজি কালীকে এই ভাবেই ব্যাখ্যা করেছেন।

স্বমীজির শিষ্যা সিস্টার নিবেদিতা কী সুন্দর ভাবে বর্ণনা করেছেন কালী সম্পর্কে তাঁর গুরুদেবের উপলব্ধি বা অনুভব। কালীকে কী ভাবে বর্ণনা করব? না, এ যেন অভিজ্ঞতার এক গ্রন্থপঞ্জি। পাতার পর পাতা উল্টিয়ে যাচ্ছি। অভিজ্ঞতার গভীর থেকে গভীরতর অংশে প্রবেশ করছি। অন্তিম লগ্নে তাঁর ভক্তরা হৃদয়ে অনুভব করছেন সেই অনন্ত জ্ঞানের আলো এবং তাঁরা জানেন, যখন সে, সময় আসবে, তখন এই জীবনকে মনে হবে একটা স্বপ্ন। তখম মনে হবে আমরা শিশু, াবার মায়ের কোলে ফিরে যাচ্ছি, যা আমাদের শেষ আশ্রয়স্থল।



কালী প্রসঙ্গেই বলে রাখি, মুম্বইয়ে চেম্বুরের স্বস্তিক পার্কে চেম্বুর ক্লাবের বোম্বে কালীবাড়িতে ১৮ ও ১৯ তারিখ অনুষ্ঠিত হবে দশমহাবিদ্যা পূজা ও কুমারী পূজা। এই পূজার পর ২৩ ও ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হবে শ্রী শ্রী কালীপূজা ও অন্নকূট উত্‌সব। ২০১২ সালে চেম্বুর ক্লাবের সুবর্ণ জয়ন্তী উপলক্ষে সকলের মঙ্গল কামনায় দশমহাবিদ্যা পূজা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ বারও ফের তাই হচ্ছে। বিভিন্ন পুরাণ ও তন্ত্রে দশমহাবিদ্যা পূজার উল্লেখ আছে। এই পূজা সম্পর্কে অনেক কাহিনি আছে।

প্রজাপতি দক্ষ কন্যা সতীর ওপর অত্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়েছিলেন কপর্দক শূন্য শিবকে বিয়ে করার কারণে। সেই জন্য দক্ষ এক যজ্ঞের আয়োজন করেন। সেই যজ্ঞে সকল দেবতাকে আমন্ত্রণ জানানো হলেও শিবকে যক্ষ আমন্ত্রণ জানাননি। এ দিকে, সতী এই যজ্ঞের কথা জেনে পিতৃগৃহে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে ওঠেন। কিন্তু অনাহুত শিব সতীকে যাওয়ার অনুমতি দিলেন না। সতীর চোখ ছলছল করে উঠল। তিনি শিবকে অনেক বোঝালেন। কিন্তু শিব অবিচল। কিছুতেই তিনি মত না বদলানোয় সতী অন্যন্ত ক্রুদ্ধ হয়ে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে শিবের দিকে তাকালেন। সতীর রূপ পাল্টাতে লাগল। তাঁর গায়ের রং গোর কালো হয়ে উঠল। তিনি ভয়ঙ্করী কালী রূপ ধারণ করলেন। সতীর এই রূপ দেকে শিব ভীত হয়ে উঠলেন। তিনি স্থানত্যাগ করতে চাইলেন। কিন্তু এ কী! যে দিকেই তিনি যেতে চান, দ্যাখেন, কালী বিভিন্ন রূপে দাঁড়িয়ে। দশ দিকেই কালী, ভিন্ন ভিন্ন রূপে। দশ দিকেই তিনি—কালী-তারা-ষোড়শী-ভুবনেশ্বরী-ভৈরবী-ছিন্নমস্তা-ধূমাবতী-বগলা-মাতঙ্গী-কমলা!

ভীত-সন্ত্রস্ত শিব প্রার্থনা করনে, সতী যেন নিজের রূপে ফিরে আসেন। এ বার সতীকে তিনি পিতৃগৃহে যাওয়ার অনুমতি দিলেন।

মুম্বই-নভি মুম্বইয়ে সব কালী বাড়িতে কালীপূজা হবে। কালী মায়ের রূপের ছটায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠুক আমাদের হৃদয়-মন, এই প্রাথর্না করি। কে বলে কালো মন্দ? কালো মেয়ের পায়ের তলাতেই তো আলোর নাচন।

Advertisement