×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৪ মে ২০২১ ই-পেপার

মুম্বইয়ে শ্রাবণ মানে দুঃসহ স্মৃতি

২০ জুলাই ২০১৪ ০০:০০

‘ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়’। শ্রাবণ মাস পড়লেই চিন্তার অন্ত থাকে না। মুষলধারে দিনকয়েক বৃষ্টি হল, রাস্তাঘাট রেললাইন একটু জলভাসি হল তো বুকের মাঝে দুরু দুরু— সেই ন’বছর আগের দু’হাজার পাঁচ সালের ছাব্বিশে জুলাইয়ের কথা মনে পড়ে যায়। দেখতে দেখতে ন’টা বছর কেটেও গেল। কত দ্রুত সময় চলে যায়। মনে হয় এই তো সে দিনের কথা। স্মৃতিগুলো এখনও টাটকা। সেই অবিশ্রান্ত বৃষ্টি। বজ্রগর্ভ মেঘ নিয়ে যেন আকাশ ভেঙে পড়া। কত মানুষের হাহাকার সেই দিনটার সঙ্গে আজও জড়িয়ে রয়েছে। যারা চিরতরে চলে গেছে ওই প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে, তারা আর ফিরবে না। মানুষের জীবন বড় বড় শোকগাথাও অতিক্রম করে যায়। জীবন প্রবাহ থেমে থাকে না। শুধু থেকে যায় প্রিয়জনের হারানোর অমোঘ যন্ত্রণা।

লেখার শুরুতেই মনটা ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল, তাই না? সুধীজন! শোক দুঃখ তো আমাদের জীবনপথের পাথেয়। জীবনে দুঃখ না পেলে সুখের মর্ম বুঝব কী করে। সুখের চাবিটা যে দুঃখের ঘরেই রাখা। ‘ভেঙে মোর ঘরের চাবি/’—রবি-কবিও তো বলছেন চাবি ভাঙার মানে তালা খুলে নিয়ে যাওয়ার কথা! সুখের চাবিটার অনন্ত সন্ধান!

যেমন মনোজ তার বাল্যপ্রেমিকা নিরু বিয়ের পর কত সুখে আছে দেখতে গিয়ে কী আবিষ্কার করল? ভাবছেন নিশ্চয়ই কে মনোজ, কে নিরু? মনোজ, নিরু, এরা আমাদের মধ্যেই মিশে আছে। কেবল এরা জীবন নাটকের কুশীলব হয়ে ওঠে তখনই যখন চলচ্চিত্রের পর্দায় এদের জীবনের গল্পগুলো আঁকা হয়ে যায় করুণ বাস্তবতায়। এ বারে মনে পড়ছে কি এরা কারা? কী এদের পরিচয়?

Advertisement

সময়ের পর্দা সরিয়ে মনের মাঝে ভেসে উঠছে রেলগাড়ির ছবি— কু ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক ঝিক— নেপথ্যে গান বাজছে ‘মথুরা নগরপতি কাহে তুম গোকুল যাও’। জুটমিলের চাকরি খুইয়ে ভাগলপুর থেকে মনোজ কলকাতায় আসে বন্ধুদের কাছে অর্থ সাহায্য চাইতে। ছোটখাটো একটা ব্যবসা শুরু করবে সে। এই ফাঁকে সে তার পুরনো বন্ধু তথা প্রেমিকা নিরুর সঙ্গে দেখা করতে যায়। নিরুর বিয়ে হয়েছে কলকাতায়। বর তার রইস আদমি। খুব বড়লোক, পয়সাওলা। তাই বলে মনোজ নিরুর কাছে হাত পাততে পারবে না। সে তো শুধু তার রাধাকে একবার চোখের দেখা দেখতে চায়। এমন ধনীর ঘরে সে নিশ্চয়ই খুব সুখে আছে। সে দিন আকাশ জুড়ে মেঘের ঘনঘটা। মুষলধারে বৃষ্টি। ভাগ্যিস যে বন্ধুর বাড়ি মনোজ উঠেছে তার বউ মনোজকে বন্ধুর রেনকোটটা দিয়ে দিয়েছিল। তা না হলে নিরুর বাড়ি খুঁজতে খুঁজতে খুঁজতে সে ভিজে চুপসে যেত।

নিরু নিরু দরজা খোলো, আমি মনোজ, মনু।

দরজা খোলে নিরু। ঘরের মধ্যে আধো আলো অন্ধকার। নিরুকে কত দিন পর দেখল মনোজ। প্রায় ছ’বছর। কিন্তু সে নিরু আর এই নিরু কি এক? না কি বদলে গেছে? এই নিরুর না কি নোকর চাকরে বাড়ি ভর্তি, যদিও তারা এখন বাড়ি নেই। কোনও কাজই নিরুকে করতে হয় না। নিরুর বর আজ এ দেশ কাল ও দেশ ট্যুর করে বেড়ান। এসি, টিভি, এ সব ছাড়া নিরু আজকাল কোথাও গিয়ে থাকতেই পারে না। অবশ্য মনোজ যখন নিরুর বাড়ি ঢুকছে তখন পাওয়ার কাট। নিরু গরমে হাঁসফাঁস করছে। হয়তো বৃষ্টির জন্য লোডশেডিং হবে হয়তো বা। মেঘগর্জনও তো কম হচ্ছে না।

ভারি সুখে আছে নিরু। কোনও কিছুরই অভাব নেই। এর মধ্যে নিজের দুরবস্থার কথা আর কী করে বলে মনোজ। সে বানিয়ে বানিয়ে বলে যে, তার টিভি সিরিয়াল প্রোডাকশন কোম্পানি আছে। গ্রামে তার পুরনো বাড়ি ভেঙে সেখানে বহুতল বাড়ি হয়েছে। সে দুটো ফ্লোর পেয়েছে। শিগগির বিয়েও করবে।

নিরুর স্বামী জাপান গেছে। তার সঙ্গে দেখা হয় না মনোজের। গল্পে গল্পে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়। হঠাৎ নিরুর খেয়াল হয় কিছু তো খাওয়া হয়নি মনোজের।

ঘরে সে রকম কিছু বানানো নেই, শুধু খিচুড়ি। প্রথম দিন এলে আমার ঘরে। খিচুড়ি খাওয়াব তোমায়? না না, একটু বসো, আমি দোকান থেকে খাবার নিয়ে আসছি। বাইরে বৃষ্টি, তোমার রেনকোটটা নিয়ে গেলাম।

বেরিয়ে যায় নিরু মনোজের আনা রেনকোটটা গায়ে দিয়ে।

বাইরে বৃষ্টি। বিদ্যুৎ নেই। ঘরের মধ্যে গুমোট। জানালা খুলে দেয় মনোজ।

এখানেই গল্পের মোড় ঘোরে। এ যেন নিরুর সুখের চাবিটা দিয়েই তার অতি যত্নে গোপন করে রাখা দুঃখের ঘরের দরজাটা খুলে ফেলে মনোজ। নিজের অজান্তে। নিরুর অনুপস্থিতিতে নিরুর বাড়িওয়ালার কাছ থেকে মনোজ জানতে পারে নিরুর স্বামী আসলে এক প্রতারক, মদ্যপ, চরিত্রহীন। তার চাকরি নেই, সে বাড়ি ভাড়া দিতে পারে না, বিদ্যুতের বিল মেটাতে পারে না। নিরুর জীবনের অমোঘ সত্যটা চরম নগ্ন রূপে ধরা দেয় তার কাছে।



একের পর এক গল্পের জাল বুনে বুনে নিরু তার জীবনের সব সত্য গোপন করেছে মনোজের কাছে। একে কী ‘মিথ্যে’ বলা যায়? তাই বললাম ‘গল্প’। পুরনো বন্ধুর কাছে নিরু তার জীবনের অসম্মানকে প্রকাশ করতে চায়নি। নিরুর সমস্ত গল্পগুলো তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ে এক ধাক্কায়। কাচের দরজার আড়ালে গোপন করে রাখা ঘর গেরস্থালির দারিদ্রলাঞ্ছিত দুর্দশাগ্রস্ত রূপ নখ দাঁত বের করে মনোজকে গিলতে আসে। ব্যবসার জন্য সংগ্রহ করা সব টাকা দিয়ে সে নিরুর বাড়ি ভাড়া মেটায়। সে কথা একটা কাগজে লিখে রসিদটা খামে ভরে সে রেখে দেয় কোচের চাদরের তলায়। কিন্তু নিরু যখন ফিরে আসে, সে ঘুণাক্ষরেও প্রকাশ করে না সে কথা, পাছে নিরু দুঃখ পায়। তাসের ঘর নির্মাণ করেই যদি নিরু আনন্দ পায় তো পাক। কী হবে এই ক্ষণিকের আনন্দটা চুরমার করে। সে নিজেও তো নিরুর কাছে গল্পের জাল বুনেছে। আর সত্যিই তো তাদের দুজনের মধ্যে এই মিথ্যে গল্পটুকুর বেশি যে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। এই মিথ্যে স্বপ্নের মধ্যেই তারা কাটিয়েছে দুপুরের এই কয়েক ঘণ্টা। নিরুর কিনে আনা পুরি সবজি দিয়ে ‘ক্যান্ডেললাইট লাঞ্চ’ সারে মনোজ। নিজে কিছুটা খেয়ে নিরুর জন্য বাকি খাবারটা রেখে দেয়।

এর পর বিদায় নেয় সে। ভাসিয়ে দিয়ে আসে তার হৃদয়ের রাধাকে। নিরু তাকে বলেছিল আর দু’তিন দিন পরেই তারা এ বাড়ি ছেড়ে অন্য বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে উঠে যাবে। মনোজ জানে সে বাড়ির ঠিকানা কোন অচিনপুরে। হয়তো আর কোনও দিন সে নিরুর সন্ধান পাবে না।

এই বৃষ্টি মনোজের নিরুকে কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে কে জানে? নিরু, নীরজা জল থেকে জন্ম যার, সে হয়তো জলেই বিলীন হয়ে যাবে।

ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘রেনকোট’। কেন এই কাহিনিতে ঋতুপর্ণ বৃষ্টির অনুষঙ্গ এনেছিলেন? তিনি কী বৃষ্টির আড়ালে ঢেকে রাখতে চেয়েছিলেন মনোজ আর নিরুর যন্ত্রণাকে। বর্ষার মেঘলা দুপুরের মতোই তাদের জীবন আলো আঁধারিতে ঢাকা, বিষণ্ণবিধুর। আর ওই রেনকোট! সে শুধু সাক্ষী থাকে তাদের অনুচ্চারিত বেদনার। রেনকোটটা বন্ধুকে ফিরিয়ে দেওয়ার পর তার পকেট থেকে পাওয়া যায় নিরুর দুটো চুড়ি আর গলার হারটা। সঙ্গে একটা কাগজ। সে কাগজে লেখা— রেনকোটের পকেটে পাওয়া একটা চিঠি পড়ে নিরু জানতে পারে মনোজের টাকার খুব দরকার। তাই সে তার গয়নাগুলো মনোজকে দিয়ে যায়। এগুলো হয়তো ছিল তার শেষ সম্বল। এ কথা বোঝে মনোজ, যদিও নিরু ব্যক্ত করে না সে কথা। এ ভাবে নিজেদের নিঃস্ব করে একে অপরকে ভরিয়ে তোলার চেষ্টা করে তারা।

আর এ ভাবেই শেষ হয় দুজন খুব সাধারণ মানব মানবীর প্রেমকাহিনি। কিন্তু শেষ কী হয়? এর রেশ দুজনকেই হয়তো বয়ে বেড়াতে হয় সারা জীবন ধরে। আর আমরা যারা দেখি এই কাহিনির চিত্ররূপ আমাদের মনেও বৃষ্টির ফোঁটার মতো টুপ টুপ করে ঝরে পড়তে থাকে করুণ সহমর্মিতা। বড় আপন মনে হয় ওদের। যেন নিজেদেরই জীবন থেকে উঠে আসা এক বিষাদ কবিতা। এ কাহিনিতে ও’ হেনরির বিখ্যাত ছোটগল্প ‘দ্য গিফট অফ দ্য ম্যাজাই’-এর ছায়া আছে বটে কিন্তু এ গল্প নিজের মতো করে বুনেছেন ঋতুপর্ণ। বরং এখানে কাহিনি শেষ হয় এক অন্তহীন বিচ্ছেদে যা কেবল বর্ষাপ্রকৃতির অনুষঙ্গেই সম্ভব। সে দিক দিয়ে দেখতে গেলে বৃষ্টিই যেন এ কাহিনির নিয়ন্তা।

ঋতুপর্ণ নিজেও তো চলে গিয়েছেন আজ কত দূরে। এ বিচ্ছেদে আর ফিরে পাওয়ার দিন গোনা নেই। এ বিচ্ছেদ চিরবিচ্ছেদ। একের পর এক জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত চলচ্চিত্র নির্মাতা এই অসামান্য প্রতিভাধর মানুষটি আমাদের জন্য আর কোনও সিনেমা সৃষ্টি করলেন না। এ কথা ভাবলেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে ওঠে। শ্রাবণের ধারার সঙ্গে চোখের জল মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। এই শ্রাবণে যিনি আমাদের কাঁদিয়ে চলে গিয়েছেন, সেই রবি-কবির সঙ্গেও যেন প্রাণের যোগ ছিল ঋতুপর্ণের। রবীন্দ্রসাহিত্য বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের উপন্যাসের এমন সার্থক শিল্পরূপ চলচ্চিত্রে খুব কম পরিচালকই দিতে পেরেছেন। ‘চোখের বালি’ ‘নৌকাডুবি’ দেখার সুযোগ হয়েছে। দুটি সিনেমাই অসাধারণ। ‘চোখের বালি’তে রবীন্দ্রনাথ নারী পুরুষের সম্পর্কের যে জটিলতা ও টানাপড়েন দেখিয়েছেন, তা সিনেমাতেও ফুটে উঠেছে খুব স্পষ্ট ভাবে। বিধবা অথচ সুন্দরী, যুবতী, শিক্ষিতা বিনোদিনী সম্পর্কের জটিল আবর্তে তলিয়ে যেতে যেতে অবশেষে পথ খুঁজে পায়। দেশ সেবার পথ। নিজেকে চার দেওয়ালের অন্ধকূপে আটকে না রেখে সে সন্ধান করে ফেলে আলোর এবং সেই যাত্রায় কাউকে সঙ্গে নেয় না সে— এ পথ তাকে একাই চলতে হবে। সে বলিষ্ঠ, সে বিদ্রোহী, সে সাহসী। এখানেই বিনোদিনী অন্য সকলের থেকে আলাদা হয়ে যায়।

‘নৌকাডুবি’। ঋতুপর্ণের হাতে সে যেন সিনেমা নয়, শিল্প। রমেশ, হেমনলিনী, কমলা, নলিনাক্ষ এই চার জনকে নিয়ে গল্পের গতিনিয়তিকে কেন্দ্রে রেখে এগোতে থাকে। এ কাহিনিতেও নায়ক নায়িকা নয়, মূল নিয়ন্তা যেন কালান্তক ঝড় যা ওলোট পালোট করে দেয় অনেকগুলো মানুষের জীবন। সব থেকে সুন্দর এ সিনেমায় রবীন্দ্রনাথের গানগুলি। যথোপযুক্ত এর প্রেক্ষিত। সঙ্গীতের জন্যই যেন কাহিনিটি একটি নিটোল কবিতার মতো ধরা দেয় দর্শক-মনে।

ঋতুপর্ণ তাঁর অকালমৃত্যুর কিছু পূর্বে রবীন্দ্রনাথের ‘জীবনস্মৃতি’র ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করেছিলেন। গত বছর ৩০ মে তাঁর মৃত্যুর পর ৮ অগস্ট ২২ শ্রাবণ কবিগুরুর মৃত্যুদিনে দূরদর্শন ন্যাশনালে এটি দেখানো হয়। এই তথ্যচিত্র প্রযোজনা করেছিলেন ভারত সরকারের সাংস্কৃতিক মন্ত্রক।

প্রত্যেক শিল্পীই বোধহয় নিজের জীবনে একা। শিল্পীর শিল্পসৃষ্টির মধ্যেই তার আনন্দ, তার চরম প্রাপ্তি। শিল্পীর সেই সৃষ্টির জগতে আর কেউ প্রবেশ করতে পারে না। এই একাকীত্বই শিল্পীকে নিয়ে চলে চরম দার্শনিক অনুভূতির জগতে। রবীন্দ্রনাথকে এ ভাবেই ‘জীবনস্মৃতি’-তে ফুটিয়ে তুলেছেন ঋতুপর্ণ। রবীন্দ্রনাথের প্রতি তাঁর আত্মসমর্পণ নিরাভরণ। একাকিত্বের ভার বয়ে চলেন শিল্পী ঋতুপর্ণও। আর এখানেই কবির সঙ্গে কোথায় যেন তাঁর এক যোগসূত্র স্থাপিত হয়ে যায়।

আজ এই শ্রাবণ দিনে প্রিয় রবি-কবিকে স্মরণ করলাম আমার প্রিয় পরিচালক ঋতুপর্ণ ঘোষের সিনেমার মধ্য দিয়ে। শ্রাবণের অঝোরধারা গেয়ে চলেছে শোকগাথা যা ক্রমশ রূপান্তরিত হয়ে যাচ্ছে রবীন্দ্রগানে— ‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু, বিরহদহন লাগে।/তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’

অনেক দিন আগে এমন এক শ্রাবণ দিনে দক্ষিণ কলকাতায় দেখেছিলাম অঝোর বৃষ্টির মধ্যে রবি ঠাকুর একা ভিজছেন। রবি ঠাকুরও ভিজেছেন, তবে তা দুঃখে, চোখের জলে, একাকী। কাউকে জানতেও দেননি তাঁর কষ্টের কথা। স্ত্রী-পুত্র-কন্যা একে একে সবাই মারা যাচ্ছেন, ধারদেনা বাড়ছে, তবু কাউকে মুখ ফুটে বলেননি। এই শ্রাবণ শুধু জানে তাঁর একাকীত্ব, অব্যক্ত অনেক যন্ত্রণা।

শ্রাবণ-স্মৃতি বেদনার

ছোট্ট সংযোজন: সেই ২৫-২৬-২৭ জুলাইয়ের দুঃসহ স্মৃতি স্মরণ করলেন ভাসিবাসী অসিত ঘোষ।

“আগেও বলেছি, আবার বলছি সে দিনের সেই দুঃসহ যন্ত্রণা। কষ্টটা মনে পড়ে গেল কয়েক দিন আগে ভাসি মেইন রোডে একটা মল থেকে বের হওয়ার সময়। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মেঘলা আকাশ। বৃষ্টি পড়ছিল। রাস্তায় জমছিল জল। দেখি, দু’টো ছেলে, একটা মেয়ে মলের সামনে বিলাস বহুল গাড়িতে উঠছে। বয়েস বাইশ-তেইশের আসেপাশে। ওরা গাড়িতে ওঠার মুখে ডায়না আচমকা চিৎকার করে উঠল, ‘টেক কেয়ার মাই সন।’ ওরা শুনতে পেল না। ধূসর কাচ তোলা গাড়িটা বেরিয়ে গেল। মনটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। অজানা আশঙ্কায় কেঁপে উঠল মধ্য পঞ্চাশ পার হওয়া মন। গোটা শরীর।

৯ বছর আগের কথা। সে দিন অঝোরে বৃষ্টি পড়ছিল। বিরামহীন বৃষ্টি। কখনও ঝমঝম, কখনও ঝিরিঝিরি। ভাসির সেক্টর টুয়েলভ-এ আমার বাড়ি। ২৪-২৫ জুলাই থেকেই শুরু হয়েছিল প্রলয়ঙ্করী সেই বর্ষণ।

বাড়ির সামনে জল জমছিল। সামনের রাস্তাটা বাঁয়ে বাঁক নিয়েছে। ডান দিকে খাঁড়ি। জল বাড়ছিল আরব সাগরের খাঁড়িতেও। বসেছিলাম বাড়ির বারান্দায়। বৃষ্টি পড়ছিলই। বাড়ছিল সামনের রাস্তাটার জল।

দেখতে দেখতে দুপুর। খিচুড়ি-ডিম ভাজা খেয়ে একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বিকেলে চায়ের কাপ নিয়ে আমি আর আমার স্ত্রী ডায়না বারান্দায় অলস ভাবে বলেছিলাম। সামনের রাস্তাটার জল বেড়েই যাচ্ছিল। ভয় করছিল, খাঁড়ি না উপছে যায়!



রাস্তায় একটা বিলাস বহুল বিদেশি গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। ভিতরে চার জন কম বয়েসি ছেলেমেয়ে। একটু পরেই বুঝলাম গাড়িটা খারাপ হয়ে গিয়েছে। স্টিয়ারং-এ বসা ছেলেটা স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা চালিয়েই যাচ্ছে। গাড়ির কাচ তোলা।

জল বাড়ছে। বিপদটা বুঝলাম। দ্রুত নীচে নেমে হাঁটু পার হওয়া জল ভেঙে গাড়ির পাশে পৌঁছলাম। কাচ তোলা। জল বাড়ছে। কাচে সজোরে ধাক্কা মারছি! কাচ নামছে না। গাড়িটা ভালই চালাই। মুহূর্তে বুঝে গেলাম, কম দামি দেশি গাড়ি হলে কাচ নামানো যেত। প্রায় কোটি টাকার বিদেশি গাড়ি! ইঞ্জিন স্টার্ট না নিলে কাচ নামবে না। এসি বন্ধ!

গাড়ির ভিতরে অসহায় চারটে ছেলেমেয়ে। ঘাড় ঘুরিয়ে দেখি, ডায়না জরুরি বিভাগে ফোন করেই যাচ্ছে। বানভাসি ভাসিতে তখন কে আসবে সাহায্য করতে!

প্রায় সাঁতরে ফিরে এসে বাড়ি থেকে হাতুড়ি নিয়ে ফের গাড়ির কাছে গিয়ে কাচে সজোরে মারতে লাগলাম। টাফ্নড গ্লাস। জানি ভাঙবে না। তবু মারছি। জল বাড়ছে।

আস্তে আস্তে জল গাড়ির কাচের উপরে উঠছে। খাঁড়িতে থেকেও হু হু করে জল ঢুকছে। আস্তে আস্তে জল গাড়ির ছাদে! চোখের সামনে দেখলাম দম বন্ধ হয়ে আসছে কম বয়েসি চারটে ছেলেমেয়ের! মরিয়া হয়ে হাতুড়ি দিয়ে শেষ আঘাতটা করলাম গাড়িটার সামনের দরজার লকে। জল বাড়ছে। হঠাৎ হাত থেকে ছিটকে গেল হাতুড়িটা। সাঁতার কাটতে কাটতে কত জোরেই বা মারা যায়! আমারও তো বয়স বাড়ছে।

সাঁতরে ফিরে এলাম বাড়ির উঁচু বারান্দায়। জল তখন গাড়িটাকে গিলে নিয়েছে।

সারা রাত বৃষ্টি। ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম বারান্দায়। ডায়না সমানে কেঁদে চলেছে। বৃষ্টি কমতে শুরু করল ভোরের দিকে।

জল একটু কমলে ফের গাড়ির কাছে গেলাম। তখন সব শেষ!

সময়ে সন্তান হলে আমার ছেলে বা মেয়ের বয়স যে ওদের মতোই হতো!”

ছবি: দেবাশিস ভাদুড়ি।

Advertisement