Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

০৪ ডিসেম্বর ২০২১ ই-পেপার

গেরুয়া রঙে হিন্দুত্ব নয়, উন্নয়নই দেখছেন মোদী

জয়ন্ত ঘোষাল
নয়াদিল্লি ০৯ জুন ২০১৪ ০৩:২১

দলের পতাকার গেরুয়া রঙের সঙ্গে আর নিছক হিন্দুত্বের সম্পর্ক দেখেন না নরেন্দ্র মোদী। ওই রঙের সঙ্গে উন্নয়নেরও নিবিড় যোগ দেখছেন তিনি। আর শুধু গেরুয়া কেন, মোদীর উন্নয়নের স্বপ্নে জাতীয় পতাকার অন্য রঙগুলিও বিশেষ তাৎপর্য বয়ে এনেছে।

কেমন সেই তাৎপর্য?

আজ প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে এক অনুষ্ঠানে নিজেই তা ব্যাখ্যা করেছেন নরেন্দ্র মোদী। তিনি বলেন, “জাতীয় পতাকায় গেরুয়া রঙ আছে। এই গেরুয়া রঙ শুনলেই আমি জানি কিছু লোকের সঙ্গে সঙ্গে অন্য কিছু মনে হবে। কিন্তু আমার কাছে গেরুয়া শক্তির প্রতীক। আমার দেশে এখন গেরুয়ার বিপ্লব আনতে হবে। মানে বিদ্যুৎ ঘাটতি মিটিয়ে দেশে শক্তির বিপ্লব আনতে হবে।” একই ভাবে তাঁর ব্যাখ্যা, “ভারতের জাতীয় পতাকায় সবুজ রঙ আছে। আমাদের লক্ষ্য পরিবেশের ক্ষেত্রে সবুজ বিপ্লব আনা। সাদা রঙের অর্থ, দুগ্ধ বিপ্লব। আর মাঝখানে নীল রঙের অর্থ, মৎস্য চাষে বিপ্লব। অতীতে যে ভাবে মৎস্য রফতানি হত, দেশের সেই মর্যাদা আবার ফিরিয়ে আনতে হবে।”

Advertisement

প্রধানমন্ত্রী পদে শপথ নেওয়ার পরে দু’সপ্তাহ অতিবাহিত। এই প্রথম নিজের বাসভবনে এক চা চক্রের আয়োজন করেছিলেন তিনি। উপলক্ষ, বিবেক দেবরায় সম্পাদিত ‘গেটিং ইন্ডিয়া ব্যাক অন ট্র্যাক’ বইটির আনুষ্ঠানিক প্রকাশ। ‘কার্নেগি এনডাওমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’-এর উদ্যোগে প্রকাশিত বইটির উদ্বোধন উপলক্ষে ছিলেন বইটির অন্য দুই সম্পাদক অ্যাশলে জে টেলিস এবং রিকি ট্রেভর।

সেখানেই মূল অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পরে চা খেতে খেতে দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে গল্প করলেন প্রধানমন্ত্রী। তখনই বললেন, “এই বইটার মোড়ক খুলে প্রকাশ করতে গিয়ে দেখলে তো, কী রকম কসরৎ করতে হল! এই বইটার প্রকাশেই যদি এত মেহনত, তা হলে গত দশ বছর ধরে দেশের যে গঙ্গাপ্রাপ্তি হয়েছে, তাকে আবার ট্র্যাকে ফেরানো কত কঠিন!” কিন্তু তা বলে হাল ছেড়ে দেওয়ার লোক যে তিনি নন, তা-ও স্পষ্ট করে দিয়েছেন মোদী। তাঁর কথায়, “কাজের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। আর আমি কী করব, সেটা যদি আমার কাছে স্বচ্ছ হয়, তা হলে ভারতকে আবার স্বমর্যাদায় ফেরানোটা কিন্তু অসম্ভব নয়।”

তাঁর সামনে যে প্রত্যাশার পাহাড় রয়েছে, তা ভালই টের পাচ্ছেন নতুন প্রধানমন্ত্রী। আর সেই প্রত্যাশা পূরণের পথে বাধার কথাও অজানা নয় তাঁর। মোদীর কথায়, “আসলে আমাদের মান্ধাতা আমলের মানসিকতা বদলাতে হবে। আগে নদীর ধারে সভ্যতা গড়ে উঠত। তার পর নগরায়ন হতে লাগল বড় রাস্তার ধারে। এখন তো অপটিক ফাইবার-এর পাশে নগর গড়ে উঠছে! কৃষকদের স্বাথর্রক্ষা নিশ্চয়ই করতে হবে। কিন্তু কৃষি করতে গিয়ে আমি শিল্প উৎপাদন ব্যাহত করলাম, এটা কোনও কাজের কথা নয়।” এই প্রসঙ্গেই তাঁর মন্তব্য, “চাষের কথা যদি বলেন, তা হলে মনে করিয়ে দিই, ফসল উৎপাদনের শতকরা ৩০ ভাগই নষ্ট হয়। কৃষকেরা দাম পান না বলে আত্মহত্যা করেন। এই পরিস্থিতিটা বদলাতে হবে।”

আর এই বদলাতে গিয়ে তিনি যে প্রাক্তনদের তুলনায় অন্য রকম ভাবে এগোতে চান, তা-ও এ দিন স্পষ্ট করে দিয়েছেন মোদী। তাঁর কথায়, “অনেকে শিল্পায়ন এবং উন্নয়ন করতে গিয়ে পশ্চিমী মডেল অন্ধ ভাবে অনুকরণ করেন। কিন্তু আমাকে করতে হবে নিজের দেশের বৈশিষ্ট্য অনুসারে।”

বিগত সরকারের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় অভিযোগ ছিল নীতিপঙ্গুত্ব। এবং এ ব্যাপারে কেন্দ্রের অন্যতম সমালোচক ছিলেন মোদী নিজেই। তখন অবশ্য তিনি বিরোধী শিবিরে। এখন সরকারে বসে সেই অবস্থা বদলানোর কথা মাথায় রাখতে হচ্ছে তাঁকে। মোদীর কথায়, “আমাদের দেশের শতকরা ৬৫ ভাগ লোক ৩৫ বছরের নীচে। এই যুব সমাজ প্রশাসনের গয়ংগচ্ছ মনোভাব পছন্দ করে না। এটা বদলানোর জন্য ‘থিংক ট্যাঙ্ক’ প্রয়োজন।” প্রধানমন্ত্রী আজ ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি বিভিন্ন নীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে ‘থিংক ট্যাঙ্ক’ গঠন করে বিশেষজ্ঞদের মতামত নেবেন। তাঁর কথায়, “আমাদের ভাল শিক্ষক তৈরি করতে হবে। একটা সময় আমরা শিক্ষকদের বাইরে পাঠাতাম। এখন সেই ধারাটা নষ্ট হয়ে গিয়েছে। সেটাকে ফিরিয়ে আনতে হবে।”

এ দিনের অনুষ্ঠানে বেশ খোশমেজাজেই ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। তাঁর পাশেই বসেছিলেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি। বিপুল প্রত্যাশা নিয়ে সরকারে এসেছে বজেপি। সেই প্রত্যাশা পূরণের দায় অনেকটাই জেটলির ঘাড়ে। তার উপর সামনেই কেন্দ্রীয় বাজেট। আমজনতা, শিল্পমহল থেকে শুরু করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের প্রত্যাশা কী ভাবে মেটাবেন কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী? জেটলির কথায়, “অনেকে বলছেন, সরকারটা নতুন এসেছে। অনেক প্রত্যাশা নিয়ে। তাই সরকার প্রথম দিকে জনমোহিনী পথেই চলুক। তার পর একটু ঘর গুছিয়ে নিলে আর্থিক সংস্কারের কড়া দাওয়াই দেওয়া ভাল। কিন্তু এটাও মনে হয়, দেশের যা আর্থিক অবস্থা, তাতে আগে কঠোর শৃঙ্খলা এনে যদি অর্থনীতির হালটাকে ফেরানো যায়, তখন সরকারের শেষ ভাগে বরং জনগণকে স্বস্তি দেওয়ার কথা ভাবা যেতে পারে।”

তা হলে কি বাজেটে সংস্কারের পথই ধরবেন তিনি?

জবাবে মুচকি হাসছেন জেটলি।

এ দিনের অনুষ্ঠানে জেটলি ছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রাক্তন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অরুণ শৌরি, বেশ কয়েক জন প্রথম সারির অর্থনীতিবিদ এবং আমলা, জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল, অটলবিহারী বাজপেয়ীর প্রাক্তন ব্যক্তিগত সচিব শক্তি সিন্হা, প্রসার ভারতীর অন্যতম শীর্ষকর্তা জহর সরকার।

প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয় সূত্র বলছে, শপথ নেওয়ার পর থেকে পাগলের মতো কাজ করছেন মোদী। রবিবারে সাধারণত দিল্লিতে ছুটির আমেজ থাকে। কিন্তু সে দিনও তিনি ডেকে পাঠাচ্ছেন আমলাদের। এমনকী কোনও কাজ ছিল না বলে গত রবিবার দলীয় দফতরে চলে গিয়েছিলেন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে। উপরাষ্ট্রপতির সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎও করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নিবাসে গুজরাতের পুরনো কর্মীরা অনেকেই নিযুক্ত হয়ে গিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগত সচিব হচ্ছেন গুজরাতের রেসিডেন্ট কমিশনার ভরত লাল। মিডিয়া উপদেষ্টা কেউ না হলেও প্রধানমন্ত্রী একজন জনসংযোগ অধিকর্তা থাকছেন, যিনি মুখ্যমন্ত্রীর জনসংযোগ অধিকর্তা ছিলেন। নাম জগদীশ ঠক্কর।

চা খেতে খেতে মোদী বলছিলেন, এখনও রেসকোর্স রোডটা একটু নতুন নতুন লাগছে। প্রশ্ন করলাম, প্রধানমন্ত্রী হয়ে কি একটু অন্য রকম অনুভূতি হচ্ছে? আমাদের কাছে কি ক্রমশ আরও অধরা হয়ে যাবেন আপনি?

প্রধানমন্ত্রীর সহাস্য জবাব, “আমাকে দেখে কি অধরা মনে হচ্ছে? আমাকে যদি অন্য রকম মনে হয়, তা হলে আমি বলব, তোমার চোখটা খারাপ হয়েছে! চোখের ডাক্তার দেখাও!”

ঠিক এই সময়টাতেই ময়ূর ডেকে উঠল প্রধানমন্ত্রী বাসভবনে। রেসকোর্স রোডের বাড়িতে অনেক ময়ূর রয়েছে। কিছু ক্ষণ ডাকটা শোনার পরে প্রধানমন্ত্রী বললেন, “এটা গুজরাতের বাড়িতে শুনতে পেতাম না!”

আরও পড়ুন

Advertisement