Follow us on

Download the latest Anandabazar app

© 2021 ABP Pvt. Ltd.

Advertisement

২২ জানুয়ারি ২০২২ ই-পেপার

বাবুর ভোট-বাগানে ফলছে এখন দারুণ মিষ্টি আখ

শঙ্খদীপ দাস
আনাকাপল্লি (বিশাখাপত্তনম) ০৫ মে ২০১৪ ০৩:০৬

“নিন মিষ্টিমুখ করুন! বাবু-ই জিতছেন।” কথাটা বলেই এক টুকরো গুড় ভেঙে হাতে ধরিয়ে দিলেন বলরাম। কাঁচা সোনার মতো রং সে গুড়ের!

অন্ধ্রপ্রদেশে ঘুরতে ঘুরতে বঙ্গোপসাগরের উপকূলে চলে এসেছি। আনাকাপল্লি। পাঁচ নম্বর জাতীয় সড়কের পাশে এই আধা মফস্সল জায়গাটা ভাইজাগ শহর থেকে টেনেটুনে চল্লিশ কিলোমিটার হবে। বাঙালির পর্যটন মানচিত্রে অবশ্য আনাকাপল্লি থাকার কথা নয়। তবে দেশের বাণিজ্য মানচিত্রে মিঠে মেজাজে রয়েছে। কারণ গুড়! তেলুগুতে ওঁরা বলেন ‘বেল্লম’। বলরামের দাবি, বাঙালির পেটেও নাকি যায় আনাকাপল্লির গুড়।

আনাকাপল্লি আসলে এ দেশের গুড়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম পাইকারি বাজার। গুড়ের গন্ধে বছরভর এই মফস্সল ম-ম করে। সে হরেক কিসিমের গুড়! কোনওটি পাকা হলুদ রঙের। কোনওটি পাটালির মতো। আবার একেবারে গাঢ় বাদামি রঙের যেগুলি, সেগুলি মদ তৈরিতে আর দুধেল গাভীর খাবার হিসাবে ব্যবহার করা হয়। বাজার চত্বরের কংক্রিটের মেঝে এতটাই চিটচিটে যে মনে হবে গরম পিচ রাস্তায় পা সেঁটে যাচ্ছে। বলরামের অনুরোধে এক টুকরো গুড় চেখে দেখতেই হল।

Advertisement

যাক সে কথা! গুড়ের এই আখাড়াতে বসেই পড়ন্ত বেলায় কয়েক জনের সঙ্গে তাস খেলছিলেন বলরাম। সে-ই ওঁদের মধ্যে একটু আধটু হিন্দি বলতে পারে। ঠোঁটের কোণে মগাই চুরুটের মতো মোটা কালো পাতার বিড়ি চেপে বললেন, “বাবু জিততা, মোডি সাথ (পড়ুন মোদী) হ্যায় না!”

অন্ধ্রের ‘বাবু’ অনেকটা বিহারের ‘কুমার’-এর মতো। প্রথম নামের পর আকছার ব্যবহার হয়। তবে বলরাম যে বাবু-র কথা বলছেন, তিনি তামাম অন্ধ্রে অদ্বিতীয়! রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী নারা চন্দ্রবাবু নায়ডু!

এ বার ভোটে সেই বাবু-র বাগান ঘুরে দেখাই কৃষ্ণা ও গোদাবরী অববাহিকা ও অন্ধ্র উপকূলে আসার কারণ। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষা অন্ধ্রের এই উর্বর এলাকায় কাম্মা সম্প্রদায়ের আধিপত্য। কাম্মা কৃষকরা সম্ভ্রান্ত। তা ছাড়া সংখ্যাগুরু শ্রেণির মধ্যে রয়েছেন আর্থিক ভাবে পিছিয়ে থাকা কাপু সম্প্রদায়ও। অতীতে এই দুইয়েরই উন্নতি হয়েছিল তেলুগু দেশম জমানায়। দলের প্রতিষ্ঠাতা তথা প্রবাদপ্রতিম তেলুগু অভিনেতা নন্দমুরি তারকা রাম রাও যেমন তাঁদের ভাত, কাপড় ও সেচের ব্যবস্থা করেছিলেন, তেমনই চন্দ্রবাবু জমানায় কাম্মা-কাপুদের ঘরের ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার সুযোগ বেড়ে যায়। কাম্মা পরিবারের উত্তরসূরিদের সাইবারাবাদে চাকরিও জোটে। এখন কারও কারও দ্বিতীয় ঠিকানা পশ্চিমের দেশগুলি।

অথচ পর গত দুটি ভোটে অন্ধ্রের এই উপকূলেই চন্দ্রবাবুকে ধরাশায়ী করেছিলেন প্রয়াত কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী রাজশেখর রেড্ডি। তেলুগু রাজনীতির পর্যবেক্ষকরা বলেন, দশ বছর আগে প্রথমবার বাবু সরকারের পতনের কারণ ছিল রাজ্যে পর পর দু’বছর খরা। পরবর্তী কালে গত লোকসভা ও বিধানসভা ভোটের সময় রাজ্যে রাজশেখর রেড্ডির রাজনৈতিক দাপট এতটাই ছিল যে তেলুগু দেশম দাঁত ফোটাতে পারেনি।

কিন্তু দশ বছর পরে এখন সেই বাবুর বাগানে আখ নাকি দারুণ মিষ্টি লাগছে! মৌমাছি ভন ভন করছে। তেলুগু দেশমের ছোট বড় পার্টি অফিসের বাইরে উজ্জীবিত কর্মী সমর্থকরা ভিড় করে রেখেছেন দুপুরের ঠা ঠা গরমেও।

বলরামের গুড় স্বাদু ছিল ঠিকই। তবু শুধু তাঁর কথাটাই ধরলাম না। মনে পড়ল এই বাজারের প্রবেশদ্বারে ‘এন টি আর মার্কেট’ সাইনবোর্ডটির কথাও। তেলুগু দেশম সরকারই গড়ে দিয়েছিল এই স্থায়ী পাইকারি বাজার। সেই দলের প্রতি বলরামের আনুগত্য তাই স্বাভাবিক! কিন্তু গত কয়েক দিনে বিজয়ওয়াড়া, গুন্টুর, বিশাখাপত্তনের বলরামের সমমনস্ক মানুষও কম মেলেনি। কাঁচা হলুদ রঙের বিস্তর প্রভাব দেখা গিয়েছে সর্বত্র। ওটি তেলুগু দেশমের দলীয় রঙ।

কী যুক্তি তাঁদের? প্রথম যুক্তিটি নিতান্তই রাজ্যস্তরের অঙ্ক। অন্ধ্র ভাগকে কেন্দ্র করে গত পাঁচ বছর অরাজক পরিস্থিতি দেখেছে এখানকার মানুষ। এখন স্থায়িত্বের জন্য মন টানছে। তা ছাড়া রাজশেখরের মৃত্যুর পর কংগ্রেসও তিন ভাগে বিভক্ত। তাই বিকল্প হয়ে মাথা তুলেছেন বাবু। তবে দ্বিতীয় যুক্তিটি অভিনব! এবং তা হল নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে চন্দ্রবাবুর জোট।

মজার বিষয় হল, সাম্প্রদায়িকতার ছোঁয়া লাগার ভয়ে এক সময় বাজপেয়ী সরকারে যোগ পর্যন্ত দিতে চাননি চন্দ্রবাবু নায়ডু। বাইরে থেকে সমর্থন দিয়েছিলেন। এমনকী এই ছ’মাস আগে গুজরাতে দাঙ্গা পীড়িতদের সম্পর্কে সহানুভূতি জানাতে গিয়ে মোদী ‘কুত্তেকা পিল্লার’ উদাহরণ দেওয়ায়, সাংবাদিক বৈঠক করে তাঁর তীব্র সমালোচনা করেছিলেন চন্দ্রবাবু। অথচ সেই মোদীর সঙ্গেই এ বার জোট করেছেন তেলুগু দেশম অধিনায়ক। বলরামদের কথা রসিয়ে বললে বলা যেতেই পারে, এতেই যেন পায়েসে পাটালি পড়েছে! আর তার ওপর এ যাত্রায় পেস্তার গুঁড়োর মতো রয়েছেন কংগ্রেস নেতা চিরঞ্জীবীর ছোট ভাই, তথা তেলুগু রাজনীতির তুখোর অভিনেতা পবন কল্যাণের তৈরি করা নতুন দল ‘জন সেনা’। সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে মহা জোট।

তা হলে কি বঙ্গোপসাগরের হাওয়ার সঙ্গে মোদী হাওয়া মিশে এ বার অন্ধ্রে ঝড় তুলেছে?

না। শুরুতে তা হয়নি। বরং তেলে জলে যে মিশ খাচ্ছিল না তা বার বার ধরা পড়েছে। প্রথমে বিজেপি-তেলুগু দেশম জোট চূড়ান্ত করার মাত্র সপ্তাহ খানেকের মাথায় তা ভেঙে যাওয়ার উপক্রম হয়েছিল। পরে দুই শিবির ফের সমঝোতার টেবিলে বসেছে। তেলঙ্গানা বাদ দিয়ে বাকি অন্ধ্রের ২৫ টি লোকসভা আসনের মধ্যে ৪টিতে লড়ছে বিজেপি, সেই সঙ্গে মাত্র ১৩ টি বিধানসভা বিজেপি-কে ছাড়তে রাজি হয়েছেন চন্দ্রবাবু। এর পর হাতে গোনা কিছু বিধানসভা আসন পবন কল্যাণের দলকে ছেড়ে চন্দ্রবাবু প্রার্থী দিয়েছেন বাকি সব আসনে।

কিন্তু তার পরেও ঐক্যের সুরে যে কোথাও কোথাও তাল কাটছে তাও নজর এড়ায়নি। হায়দরাবাদে মোদী-বাবু যৌথ সভা হয়েছে। কিন্তু বক্তৃতায় একে অপরের নাম পর্যন্ত করেননি। ওপর তলার সেই সংক্রমণ ছড়িয়ে গিয়েছে নীচের স্তরেও। তেলুগু দেশমের প্রার্থীর জন্য যেমন প্রচারে নামছিলেন না বিজেপি কর্মীরা তেমনই উল্টোটাও হচ্ছিল। আর সেই শূন্যস্থানেই গোটা রাজ্যে তাঁর আগ্রাসী প্রচার আরও উচ্চতায় নিয়ে যান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী রাজশেখর রেড্ডির পুত্র জগন্মোহন রেড্ডি।

প্রথমার্ধের প্রচারের এমন টানাপড়েনের পরে এখন অবশ্য বাবু এবং বিজেপি উভয়েই কোমর কষে নেমেছেন। ৭ মে সীমান্ধ্রে ভোট। এবার এখানে পর পর পাঁচ দিন প্রচারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। যা শুরু হয়েছে গত ৩০ এপ্রিল থেকে। তিরুপতি মন্দিরে পুজো সেরে ক্যামেরার সামনে পরস্পর আলিঙ্গনাবদ্ধ হয়ে ছবি তুলে সেই যাত্রা শুরু করেছেন মোদী ও বাবু। এবং বেছে বেছে জগন্মোহনের খাসতালুক রায়ালসীমার রান্নাঘরেও হানা দিচ্ছেন এই জুটি। কৌশলে বাবু নিশানা করছেন সনিয়া গাঁধী ও জগন্মোহনকে। বলছেন, “দুর্নীতির অ্যানাকোন্ডা হলেন সনিয়া, তাঁর ভাড়াটে ছেলে হলেন জগন।” আর মোদী অন্ধ্র ভাগ নিয়ে সীমান্ধ্রের ক্ষত একটু খুঁচিয়ে দিয়ে স্থায়িত্ব ও উন্নয়নের স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। এবং সেই ছবিটাই এখন শুধু খেলায় সমতা ফেরায়নি, সম্ভাবনারও আলো দেখাচ্ছে।

দশ বছর ক্ষমতায় না থেকে এ ভাবে ফিরে আসা যায়? এ প্রশ্নের জবাবেই এক টুকরো গুড় ভেঙে হাতে দিয়েছিলেন বলরাম। কাঁচা সোনার মতো সে গুড়ের রং।

আরও পড়ুন

Advertisement