×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৮ জানুয়ারি ২০২১ ই-পেপার

মুম্বই মনতাজ

আরবসাগরের সৈকতে অদৃশ্য দেওয়াল

মিলন মুখোপাধ্যায়
২২ মে ২০১৫ ২৩:৫৪

গাঢ় কমলা ও হলুদ ছোপ ধরেছে আকাশে। সূর্যের গায়ের আগুন রং শীতল হবার জন্যেই যেন জলে নেমে ডুব দিতে চাইছে ধীরে ধীরে। আরব সাগর এখন ঘোলাটে সাদা। আগুন লেগেছে দিগন্তে। এত বড় আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে যাচ্ছে, খেয়ালই করছে না চারপাশের লোকজন। কোনও আড়ম্বর আয়োজন নেই। ধ্বনি প্রতিধ্বনি নেই আকাশে বাতাসে। এমনকী এই বিশাল সমুদ্রের মৃদু, ছল্ ছল্ ঢেউয়ের সূর্য বন্দনার ফিসফিস শব্দ পর্যন্ত চাপা পড়ে গেছে বেতালা-বেসুরো, অর্থহীন খেলো কোলাহলে! খেলনা ভেঁপু বাজছে প্যাঁ পোঁ। বাঁদর নাচওলার ডুগডুগির আওয়াজ। ঝুমঝুমির শব্দ।

মুম্বই শহরটির অন্যতম আকর্ষণ এর সমুদ্র। বিস্তীর্ণ বেলাভূমি। আরব সাগরের মুক্ত বিশুদ্ধ বাতাসে লম্বা নিশ্বাস নিয়ে—আঃ! কী আরাম! মনে হয় সদা ব্যস্ত শহর মুম্বইয়ের ঘিঞ্জি ভিড়ভাট্টায়, দূষিত বায়ুতে শরীরের ভেতরে যত রোগ-বীজাণু বাসা বেঁধে বসেছে, তাদের ঘরছাড়া করে গোটা শরীর-মন নিরাময় হয়ে গেল।

লোখণ্ডওয়ালার বাসার খুব কাছাকাছিই রয়েছে কয়েকটি সমুদ্র সৈকত। ভারসোবা বিচ। সাতবাংলা বা বিশ্ববিখ্যাত জুহু বিচ। এর পর আরও খানিকটা এগোলে বান্দ্রার বাস স্ট্যান্ডের বেলাভূমি, দরগা বা মসজিদ লাগোয়া মাহিম বিচ। আরও দক্ষিণে শিবাজি পার্কের অদূরে দাদা র সৈকত। এমনি এগোতো এগোতে দক্ষিণ প্রান্তে মেরিন ড্রাইভ। কর্মভূমিতে আবাস হলে ‘সাইট সিইং’ বা হালকা মেজাজে বেড়াতে বেড়ানো হয়ে ওঠে না। তার ওপর বাড়ির কাছে হলে তো কথাই নেই। ‘আজ যাব, কাল যাব’ করে করে আর যাওয়াই হয় না। বহু দিন ধরে রক্ষেকালীকে ঝুলিয়ে রেখেছি।

Advertisement

‘‘দাদাবাবু, চলো না ঘুরে আসি। অ্যাতো দিন হয়ে গেল এই ভিন রাজ্যে এয়েছি, অথচ জুহু বিচটাও তো দেখালে না। কাছেই তো!’’

‘‘যাব যাব। গেলেই হয়—। কাল পরশু গেলেও তো হবে। তোমার বিচ তো আর পালিয়ে বা হারিয়ে যাবে না।’’

প্রথমে আবদার। পরে তার সঙ্গে গোঁসার ভাব জুড়ে রক্ষেকালীর পান-খেকো ঠোঁট-ওল্টানো,

‘‘হুঁহ্! আপনি আর গ্যাছো। ছাই—থাক দরকার নেই গিয়ে। এই ঘরের মধ্যেই পচে মরি—ছোঃ—’’।

ওঁর সেই গোঁসা ভাঙাতেই এত দিনে, জোর করে আলস্যি খেদিয়ে আজ এসে পড়েছি জুহু সৈকতে। অবশ্য এখানে বা সমুদ্রের এই খ্যাতনামা বেলাভূমিতে যদিও বহু বার আসা হয়েছে। ফি বছর। তবে, তা হল গিয়ে—দায়িত্ব পালনে। দুর্গোৎসবের শেষ দিনে। বিসর্জনের দিন সদলবলে, বলতে গেলে প্রায় চল্লিশ-পঞ্চাশ জনের শোভাযাত্রার সঙ্গে সঙ্গে। পদব্রজে বান্দ্রা থেকে জুহু অবধি। কাঁসর-ঘণ্টা-ঢাক-ঢোলের বাজনা-বাদ্যির তালে তালে নাচ-গান ও ‘দুগগা মাঈকি জয়’ ইত্যাদি সহযোগে। সারা লিংক রোডে, বিশেষত এই ভিন রাজ্যে সে ভারি অভিনব দৃশ্য। বাঙালিদের ভাসান উৎসবের শোভা দেখতে দু’ ধারের বারান্দা-জানালায় জড়ো হয়।.....

সে যাক গে। যে কথা বলা হচ্ছিল। সেই বিজয়াদশমীর দিন ছাড়া যাতায়াতের পথে সৈকত দেখতে পেয়েছি এক ঝলক। ব্যাস, ওই পর্যন্তই। নেমে, সময় নিয়ে, ঘুরে-ফিরে দেখার মতন, মুক্ত মনে বিশুদ্ধ বাতাস বুক ভরে নেওয়ার সময় হয়ে ওঠেনি, হায়! এই অ্যাতগুলো দশক এ রাজ্যে বসবাস করেও। ফলে আজ বালির ওপর খালি পায়ে হাঁটতে দারুণ ভাল লাগছে। রক্ষেকালীও আমার দেখাদেখি বাঁ-হাতে চটি নিয়ে খালি পায়েই হেঁটে চলেছে।

সৈকতের বালি তিন ভাগে ভাগ করা যায়। গোড়ালি অবধি জলে বালি ডুবে যাচ্ছে ঢেউয়ের আনাগোনায়। ক্রমশ পায়ের দিকে স্রেফ স্যাঁতসেঁতে ভেজা বালি। আর আমরা হাঁটছি পুরোপুরি শুকনো বালিতে। যার বালুকণা দমকা বাতাসে ওড়াওড়ি করে। কী হল, হঠাৎ রক্ষেকালী শুকনো বালি উড়িয়ে দৌড়োতে লাগল। এক্কেবারে কচি বালিকাটির মতন। ভারী শরীর। ভয় পেলুম, হুমড়ি খেয়ে পড়ে না যায়। ভেজা বালি পেরিয়ে এক্কেবারে জলের কিনারায়। ভাটার নিস্তেজ ঢেউ ওর পা ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছে। অঞ্জলি ভরে হাতে খানিকটা জল নিয়ে পেরথম ঠেকাল মাথায়। দ্বিতীয় অ়ঞ্জলি মুখে দিয়েই বলে উঠল, ‘‘ভারী নোনতা!’

আসলে ও তো এই প্রথম সমুদ্র দেখছে। চেখেও।

আমিও ওর দেখাদেখি জলের কাছে নেমে এসেছি। রক্ষেকালী বললে, ‘‘সমুদ্দুরের জল তো কাজে লাগানো যায়, দা’বাবু!’’

‘‘কী রকম’’? ও একেবারে দেখি খুশিতে ডগোমগো। বললে, ‘‘ক্যানো? ছেঁকে, চামরমণি চাল, আলু ঢেলে উনুনে চাপিয়ে দিলেই হল। ফাস্টো কেলাশ ভাতে-ভাত হয়ে যাবে। কাঁচা লংকা ডলে খেয়ে নাও। লবণ লাগবে না। হে হে!’’

অ্যাতো দিনে বোঝা গেল সমুদ্দুরের দলের প্রধান উপকারিতা!

পায়ের পাতা ডোবা জলে হাঁটছি দক্ষিণ মুখো। পশ্চিমে, আমাদের ডান হাতে সূর্য নেমে গেছে জলে অর্ধেকের বেশি। বা দিকে সার বাঁধা সব বড় বড় হোটেলের পেছনে দেওয়াল শুরু হচ্ছে। দু’চার কদম এগোতেই হঠাৎ রক্ষেকালীর চাপা চিৎকার,

‘‘ম্যাঁ—গো’’।

চমকে উঠে ওর দিকে নজর ফেলতেই দেখে, আঁচল দিয়ে নাক চেপে প্রায় লাফিয়ে সরে যাচ্ছে জলের দিকে। কী হল, কী হল করে একটু এগোতেই অদৃশ্য দেওয়ালে ধাক্কা খেলুম। ‘অদৃশ্য’ এই জন্যে যে, এ দেওয়াল না ইটের তৈরি, না পাথরের। মাটিরও নয়। বাঁ দিকে হোটেলের দেওয়াল সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রয়েছে, সেদিক থেকেই বীভৎস কটু গন্ধ ছড়াচ্ছে। উগ্র, ঝাঁঝালো। কটু গন্ধে ম’ ম’ করছে এমন সুন্দর অপাপবিদ্ধ প্রকৃতি। যেখানে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ভাষাভাষি, জাতি, ধর্ম নির্বিচারে বিশুদ্ধ ‘হাওয়া খেতে’, সমুদ্র ও তার বিস্তীর্ণ বেলাভূমিতে মন-প্রাণ-ভাল করতে আসে, সেখানে অকস্মাৎ বিপরীত বোধের আক্রমণের মতো প্রস্রাবের দুর্গন্ধ ঝাঁপিয়ে পড়ে, পাঁচটি ইন্ডিয়াকে তছনছ করে দেয়। বিষাক্ত করে অস্তিত্ব, মন, প্রাণ এবং যাবতীয় পরিপার্শ্বের সুন্দরতাকে।



আরব সাগরের মুম্বইতে বেশ কয়েকটি বিস্তীর্ণ বেলাভূমি ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তাদের মধ্যে পাঁচটি বেশ নামজাদা। ভারসোবা, জুহু, বান্দ্রা, দাদর বা শিবাজি পার্ক এবং গেরগাঁও ‘চৌপাটি’ (সৈকতের মরাঠি প্রতিশব্দ) অথবা মেরিন ড্রাইভ। এই পঞ্চ সৈকতের দশা প্রায় একই রকম। অসাধারণ প্রকৃতির সৌন্দর্যের মাঝমধ্যিখানে সহসা পরিস্থিতি বিষাক্ত করে দেয়। জ্ঞানেন্দ্রিয়ের তাবৎ সুখ ছিন্ন ভিন্ন করবার ফলে মানুষজন পলাতে পথ পায় না। সব ‘ভাল লাগাকে’ হত্যা করে মুহূর্তে।

হ্যাঁ, বলবেন চাঁদেও কলঙ্ক আছে। তাই বলে কি চাঁদের কিরণ বা সৌন্দর্য ব্যাহত হয়েছে? মোটেই নয়। আমরা রোমান্টিক হয়ে অভিসার করি, কবিতা লিখি, ভালবাসি চাঁদের আলোকে সাক্ষী রেখে। আহা, সে কলঙ্ক যে প্রকৃতিরই অঙ্গ। প্রকৃতির সৃষ্টি। আর, এ ক্ষেত্রে, প্রকৃতিকে, প্রকৃতির দানকে কলুষিত করছে কে? সম্মিলিত ‘পাবলিক হিসি’র কটুগন্ধে দিগ্বিদিক বিষিয়ে তুলছে কে? না পাবলিক! আমরাই। ‘আমরা মানুষ নহি তো মেষ’!

ও ধারে জলের কিনারায় হাবড়া কামারথুবার মানুষি রক্ষেকালী তখনও ‘ওয়াক ওয়াক’ করে চলেছে। হয়তো ভেতরকার তাবৎ কলুষ ‘উলটি’ করে বের করতে চাইছে।....

দেশের পশ্চিম বাতাসে লাগা, তথাকথিত ‘আধুনিকতম’ শহর মুম্বইয়ের ‘অক্সিজেন’-ঘাঁটিগুলির অবস্থা পরিদর্শন করার আশায়, তার পর বেরিয়ে পড়লুম ‘বেড়াতে’। একা একা। প্রথমে গেলুম ‘দাদর’ বা শিবাজি পার্ক এলাকার সৈকতে। বালুকণার আস্তরণের ওপর হাঁটতে হাঁটতে আলাপ হল, এলাকার বাসিন্দা পিটার রড্রিক্সের সঙ্গে। শুকনো বালিতে উবু হয়ে বসে খেলছিলেন কয়েকটি ছেলেমেয়ের সঙ্গে। বালি দিয়ে গড়ছিলেন দুর্গ-মন্দির—এই সব। ‘‘— বিকের ছ’টার আগেই এদের নিয়ে চৌপাটি থেকে চলে যেতে হয়।’’

‘‘কেন? এখনও তো যথেষ্ট বেলা আছে। এখানে সন্ধে তো হয় সাতটার পর!’’

‘‘তবু চলে যেতে হয়, ভাই। কারণ এর পরেই আর দশ পনেরো মিনিটের মধ্যেই অশালীন দৃশ্যাবলী দেখতে হয়।’’

মনুষ্য বসতির সীমানায় বাড়ির, হোটেলের, দোকানপাটের অজস্র দেওয়াল। তার পর বেলাভূমি ও সমুদ্র। সেই দেওয়ালের গায়ে মানুষের লাইন পড়ে যায়। সমুদ্রের দিকে পেছন ফিরে সব হাল্কা হবার প্রয়োজনে জলত্যাগের আনন্দে মশগুল হয়ে পড়ে। কে দেখল, না দেখল—তাতে ওদের বয়েই গেল। ‘ইন্ডিয়ান সিভিক সেন্সে’র সাক্ষাৎ প্রামাণ—মুক্ত স্বাধীন আকাশের নীচে ‘মুক্তাঙ্গন’ মূত্রালয়।

তা বলে ভাববেন না আমজনতার উক্ত ‘সিভিক সেন্স’ চাগাবার চেষ্টা সরকার করেনি। তট থেকে কমবেশি পৌনে কিলোমিটার দূরেই (বা অদূরেই) পরিচ্ছন্ন একেবারে চকচকে ‘সুলভ শৌচালয়ে’র উদঘাটন করেছেন ঢাক-ঢোল পিটিয়ে। জনসাধারণের মুখ চেয়েই তো। বেশ ক’ বছর হয়ে গেল। কিন্তু ব্যবহারটা করবে কে? গণ্ডগোল বাঁধে দূরত্বে। ত্যাগের বেগ পেলে সৈকতে বেড়াতে আসা পাবলিক কি দশ মিনিট হাঁটার জন্যে প্রস্তুত? না। ফলে দৈনিক হাজার হাজার ভ্রমণবিলাসী জনতা দিল খুলে ‘ত্যাগানন্দে’র তাগিদে সারমেয়-সম প্রক্রিয়ায় দেওয়াল ভাসিয়ে বেড়ায়।

ভোর রাতে যাঁরা আসেন স্বাস্থ্যোন্নতির আশায়, তাঁদের দেখতে হয় ভিন্ন দৃশ্য। উবু হয়ে বসা মানুষের লাইন—একই দেওয়াল ঘেঁষে। লোটা, তোবড়ানো ঘটি, দালদার টিনে (শৌচকার্যের নিমিত্ত) জল ভরে নিয়ে। তা টিন ঘটিতে কি তার অর্ধনগ্ন শরীর ঢাকা যায়, না, ‘অপকম্মো’?!

শহরের বিচে সাতটি টয়লেটই ব্যবহৃত হয় পথ-চলতি মানুষের জন্যে। আর সকালে ‘বড়’ ত্যাগের তাগিদে দেখা যায় লোটা হাতে লাইনে দাঁড়ানো কাছাকাছি বাড়ির বাসিন্দারা। তাও স্রেফ পকেটে রেজগি আছে। আর আছে কি়ঞ্চিৎ লজ্জা-শরম। সুতরাং, হে আদিগন্ত সমুদ্রের মুম্বই-তটরেখা, ধৌত লাঞ্চিত হতে থাকো, যেমন বেশির ভাগ ভারতীয় নদীরা হয়ে আসছে। বহু যুগ ধরে ভারতীয় সভ্যতার নজির হিসেবে। এমনকী, এই তালিকায় ‘মা গঙ্গা’ও যুক্ত হয়ে আছেন। রক্ষেকালীর মতন আঁচল, আমার মতো রুমালের বদলে তোমার বিখ্যাত ঢেউ-চাপা দিয়ে দুর্গন্ধ মুছে দাও, হে বিশাল!

Advertisement