• দেবেশ রায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষের বিষাদ

Russian Revolution
সমাবেশে লেনিন।

১৯১৭-র ফেব্রুয়ারি হয়ে গেছে। জারতন্ত্রের অবসান হয়েছে। এক অস্থায়ী সরকার তৈরি হয়েছে। সেই সরকারের প্রতি সমর্থন বা সেই সরকারের বিরোধিতা নিয়ে রাশিয়ার গণতান্ত্রিক ও বামপন্থী পার্টিগুলি নানা ধরনের মতপার্থক্যে পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন। বলশেভিক পার্টির মধ্যেই চারটি মত। ১৯০৫ সালের বিপ্লব ব্যর্থ হওয়ার পর পার্টি যে লাইন নিয়েছিল, সেই লাইনের বাইরে যাওয়ার কথা কেউ বলতে পারছে না। কিন্তু তার মধ্যেই স্তালিন, কামেনেভ, এঁরা সাইবেরিয়ার নির্বাসন থেকে ফিরে এসে সরকারকে সমর্থনের কথা বললেন ও জার্মানির সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার কথাও। তাঁরা একটা সংবিধান সভা গঠনের উপর জোর দিলেন। পেত্রোগ্রাদ সোভিয়েতের সব নেতা হয় জেলবন্দি, নয় নির্বাসিত। তাঁরা বললেন, এ সরকারের শ্রেণিচরিত্র কী? এঁরা কি গণতান্ত্রিক বিপ্লব সম্পন্ন করবে? পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির যাঁরা বাইরে আছেন, তাঁরা বললেন, জারতন্ত্রের পতন নিঃসন্দেহে গণতান্ত্রিক বিপ্লবের একটা বড় নিশানা। কিন্তু এই সরকার তো কৃষকদের জমির অধিকার মানেনি এখনও, ও শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টা কাজের কথাও বলছে না, অথচ এই দুটোই তো ছিল ১৯০৫-এ পার্টির প্রধান কাজ গণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রসঙ্গে। তাঁরাও সংবিধান সভার কথা বললেন। পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রই মোটামুটি সবার লক্ষ্য ছিল।

প্রায় অবিকল আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থায় সিপিআই (এম)-এর মতো। তারা পাঁচ বছর আগে কংগ্রেসে প্রস্তাব নিয়েছিল যে বিজেপি আর কংগ্রেস, এই দুই থেকেই সমান দূরত্বে থাকতে হবে। তাই কংগ্রেস রাজি থাকলেও সীতারাম ইয়েচুরিকে কংগ্রেসের সমর্থনে রাজ্যসভায় তারা পাঠাল না। তাদের পলিটব্যুরো বা কেন্দ্রীয় কমিটি এখনও বলে উঠতে পারেনি, নরেন্দ্র মোদী সরকার ফ্যাসিস্ত কি না। কারণ তারা ইতিপূর্বেই ইন্দিরা গাঁধীকে ফ্যাসিস্ত বলে নির্বাচন জিতেছেন।

ফেব্রুয়ারি বিপ্লবের পর বলশেভিক পার্টির একটা সম্মেলন ডাকা ছিল ১, ২ ও ৩ এপ্রিল। দীর্ঘ নির্বাসনের পর লেনিন রাশিয়ায় ফিরলেন ৩ এপ্রিল। লেনিনের প্রত্যাবর্তনে শ্রমিকদের উচ্ছ্বাস, দুনিয়ার সাংবাদিকদের ভারাক্রান্ত কৌতূহল ও অস্থায়ী সরকারের উদ্বেগ নিয়ে অনেক ঘটনার বিবরণ হাতের কাছে থাকা সত্ত্বেও শুধু একজন প্রত্যক্ষ সাক্ষী রাজনৈতিক নেতার কথাই বলি। এন এন সুখানভ একজন মেনশেভিক নেতা। তিনি লিখছেন, ‘বলশেভিক পার্টির প্রধান দফতরের বাইরে মানুষজন জড়ো হয়েছে। লেনিনের কথা শুনতে চায়। পার্টি তখনও কোনও সিদ্ধান্ত নেয়নি। লেনিন সেই সমাবেশকে যা বললেন তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি। আমাদের কোনও পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র চাই না, আমরা কোনও ধরনের বুর্জোয়া গণতন্ত্র চাই না, আমরা চাই সোভিয়েতের সরকার— শ্রমিক, সৈনিক, ক্ষেতমজুর জনপ্রতিনিধিদের সরকার।’

সুখানভ তাঁর স্মৃতিকথায় বলছেন, লেনিনের এই কথায় তিনি বা তাঁর মতো মেনশেভিকরা তো চমকে উঠলেনই, এমনকী লেনিনের বলশেভিক পার্টির নেতারাও একেবারে থ! কেউ দূর কল্পনাতেও ভাবতে পারেননি সোভিয়েতগুলি কোনও রাষ্ট্রব্যবস্থা বা সরকারের অংশ হতে পারে! তাদের দিয়েই একটা স্থায়ী সরকার তৈরি হতে পারে ও সেই সরকার জনসাধারণের সমর্থন ও আনুগত্য পেতে পারে? সেই জমায়েতে উপস্থিত এক বলশেভিক নৌসেনা, রাসকলজিকভ তাঁর স্মৃতিকথায় সুখানভের মতোই বলেছেন, ‘লেনিন এই হঠাত্ মিটিংয়ের প্রথম বক্তৃতায় পার্টির সবচেয়ে বড় ও দায়িত্বশীল নেতাদের সামনে যেন একটা রুবিকন নদী বইয়ে দিলেন— অতীতের নির্ধারিত পার্টি নীতি আর এই মুহূর্তের কর্তব্যের মধ্যে।’

এই মুহূর্তটি অনেক ঐতিহাসিককে ভাবিয়েছে ইতিহাসে ব্যক্তির ভূমিকা নিয়ে। কেউ কেউ তো বলতেন, লেনিন বিদেশে মারা গেলেও রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব হত (নভেম্বর)— রাশিয়া বিপ্লবের জন্য এতটাই প্রস্তুত ছিল। স্তালিনের সোভিয়েত পার্টির ইতিহাসে এমন একটা কথা বলা হয়েছিল। ত্রৎস্কিই বলেছিলেন, ‘ইতিহাস কোনও অটোমেটিক পদ্ধতি নয়।’ কার্ল রাদেক বিখ্যাত এক ঐতিহাসিক লেনিনের নেতৃত্ব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে লিখেছিলেন, ‘কখনও কোনও ঘটনার বাস্তব চমত্কারিত্বে লেনিনের চোখ ধাঁধিয়ে যেত না। কখনওই তিনি পুরনো কোনও সিদ্ধান্তের প্রতি আনুগত্য দেখিয়ে নতুন পরিস্থিতিকে বিচার করতেন না। মুহূর্তের মধ্যে তিনি সেই পুরনো নীতি-সিদ্ধান্তকে ছুঁড়ে ফেলে দিতেন।’

সেই ৩ এপ্রিলের প্রত্যাবর্তনের পর লেনিন পার্টির সম্মেলনে, অসংখ্য মিটিংয়ে, লেখায় বলশেভিক পার্টির মধ্যেই ‘সোভিয়েতের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা চাই’, এই কর্মসূচিকে স্লোগানে পরিণত করলেন। প্রায় একজনও তাঁর সমর্থক ছিলেন না যখন তিনি এই কথাটি প্রথম বললেন এক টুলের উপর দাঁড়িয়ে বলশেভিক পার্টির সদর দফতরের সামনের মাঠটাতে। আর, মাসখানেকের মধ্যে এটাই হয়ে উঠল পার্টির ও তার সমর্থকদের একমাত্র স্লোগান আর সাত মাস পেরোতে-না-পেরোতেই নভেম্বর বিপ্লব! কেমন করে লেনিন রাষ্ট্র ও বিপ্লবের এই বিজয়ের সম্পর্ক, প্রবাসে বসে, বুখারিনের সঙ্গে তর্কের সূত্রে আবিষ্কার করছিলেন সে বিষয়ে আধুনিক কালে অনেক গবেষণা হয়েছে ও অনেক তথ্য হাতে এসেছে। কৌতূহলী পাঠক সেগুলি দেখতে পারেন, কিন্তু লেনিনের এই কথা মনে রেখে যে ‘যারা এক কালে কমিউনিস্ট হয়ে তোতাপাখির মতো তত্ত্ব আওড়ায় অথচ নির্দিষ্ট বাস্তব পরিস্থিতি দেখতে পায় না তাদেরকে অ্যান্টিক-কমিউনিস্ট নাম দিয়ে তাকে তুলে রাখা দরকার।’

সিপিআই (এম) এ কথা ভুলে গেছে, চিরকালই ভুলে থাকে যে মার্কসবাদ ও কমিউনিস্ট পার্টি নিরন্তর তত্ত্বের বিচার করে ও শ্রমিক-কৃষক-মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সংগঠিত করে। ইউরোপের ইতিহাসে এমন তাত্ত্বিক সংগ্রাম এমনকী এনলাইটেনমেন্টের সময়ও হয়েছিল কি না সন্দেহ। অথচ সিপিআই (এম)-এর মুখপত্রগুলিতে কোনও তাত্ত্বিক বিতর্কের লেশমাত্র দেখা যায় না। তাঁদের কোনও তাত্ত্বিক নেতা নেই। বা তাঁদের দলের সব নেতাই নীরব তাত্ত্বিক। তাই ইরফান হাবিবের মতো ঐতিহাসিক ও মার্কসবাদী তাত্ত্বিক আমাদের দেশের বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকার যে সুনিশ্চিত ও সুপরিকল্পিত ফ্যাসিবাদী তত্ত্ব ও কর্মসূচি পালন করছে সেই বিষয়ে সিপিআই (এম)-এর সাধারণ সম্পাদককে চিঠি লিখলেও তা নিয়ে কোনও তাত্ত্বিক তর্ক তৈরি হয় না।

নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষে লেনিনের এই কথাগুলি মনে রাখা দরকার: ‘এখন আমাদের, যাকে বলে খুঁড়ে বের করতে হবে অবিকৃত মার্কসবাদ ও জনসাধারণকে সেই তত্ত্ব জানাতে হবে।’ সিপিআই (এম) কোনও দিনই ভাবল না যে রাশিয়ায় তো বটেই, কিউবা, চিন, ভিয়েতনাম— সমস্ত সফল বিপ্লব একই সঙ্গে তত্ত্বের লড়াই ও বন্দুকের লড়াই। সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় পৃথিবীর ইতিহাসের নিরাশ্রয়িতা ঘটেছে বটে কিন্তু তাতে কমিউনিজমের বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব মিথ্যা হয়ে যায় না। পৃথিবীর প্রথম শ্রমিক শ্রেণির রাষ্ট্র, প্যারি কমিউন মাত্র কয়েক মাস বেঁচে ছিল কিন্তু দুনিয়াকে শিখিয়ে ছিল এক নতুন ধরনের রাষ্ট্রের আদল। সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীর দীর্ঘায়ুতম কমিউনিস্ট রাষ্ট্র। মাত্র ৭২ বছরের অস্তিত্বে সোভিয়েত ইউনিয়ন পৃথিবীকে দেখিয়েছে, দরিদ্রতম একটি দেশ অর্থনীতিকে পরিকল্পনায় বেঁধে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে পৃথিবীর অগ্রসরতম দেশে পরিণত হতে পারে, নাৎসি জার্মানির আদিগন্ত আক্রমণকে প্রতিহত করে বার্লিনে রাইখস্টাগে লালঝাণ্ডা তুলতে পারে, নারী স্বাধীনতা বলতে কী বোঝায় তা পাশ্চাত্য সভ্যতাকে শেখাতে পারে ও মানুষ তার সৃষ্টিশক্তিতে মর্ত্যসীমা চূর্ণ করে দিতে পারে— গ্যাগারিন।

নভেম্বর বিপ্লবের শতবর্ষে আমার দুঃখ— ভারতীয় ফ্যাসিবাদকে চিহ্নিত করে ‘মোদী হঠাও, ফ্যাসিবাদ হঠাও, দেশ বাঁচাও’, এই আওয়াজ কমিউনিস্টরা প্রায় তুলল না!

মার্কসবাদ ও নভেম্বর বিপ্লব তাদের কী শিক্ষা দিল?

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন