ফের মাঝ আকাশে বিমান বিপর্যয়। মঙ্গলবার বার্সেলোনা থেকে ডুসেলডর্ফ যাওয়ার পথে ১৫০ জন আরোহী নিয়ে আল্পস পর্বতের দুর্গম এলাকায় ভেঙে পড়ল জার্মানউইঙ্গসের এয়ারবাস এ৩২০। দক্ষিণ ফ্রান্সের সৈকত শহর নিসের ১০০ কিলোমিটার উত্তরে বার্সেলোনেত শহরের কাছে বিমানের ধ্বংসাবশেষ দেখা গিয়েছে বলে বিমান সংস্থা সূত্রে খবর। দুর্ঘটনার খবর জানিয়ে এ দিন ফরাসি প্রেসিডেন্ট ফ্রাঁসোয়া ওলাঁদ বলেন, ১৪৪ জন যাত্রী ও ৬ বিমানকর্মীর কেউই আর জীবিত নেই বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এ দিন সন্ধের দিকে জানা যায়, উদ্ধারকারী বিমান ওই এলাকা থেকে এয়ারবাস এ৩২০-র ব্ল্যাক বক্স খুঁজে পেয়েছে।

গত বছর মার্চেই হারিয়ে গিয়েছিল মালয়েশীয় বিমান সংস্থার এমএইচ ৩৭০। সেই শুরু। তার পর কখনও গুলি করে বিমান নামিয়েছে জঙ্গিরা, কখনও আবার খারাপ আবহাওয়ায় জাভা সাগরে ভেঙে পড়ে যাত্রী বিমান। গত বছর থেকে লাগাতার বিমান বিপর্যয়ের তালিকায় এ বার নাম জুড়ল জার্মানউইঙ্গসের ফ্লাইট ৪ইউ ৯৫২৫-এর।

দুর্ঘটনাগ্রস্ত বিমানটির ১৪৪ জন যাত্রীর মধ্যে অনেকেই ছিলেন জার্মান। জার্মানির একটি স্কুলের ১৬ পড়ুয়া ও দুই শিক্ষকও ছিলেন ওই বিমানে। ছিল দুই শিশুও। যাত্রী তালিকা দেখে তাঁদের দেশের ৪৫ জন নাগরিক বিমানটিতে ছিলেন বলে দাবি করেছে স্পেন। জার্মান চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মের্কেল আগামী কাল দুর্ঘটনাস্থলে যাবেন।

জার্মানির জাতীয় বিমান সংস্থা লুফতহানসার একটি শাখা এই জার্মানউইঙ্গস। মূলত সস্তা উড়ান চালানোর দৌলতেই জনপ্রিয় এই সংস্থাটি। এ দিন স্পেনের উপকূল শহর বার্সেলোনা থেকে সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে(জিএমটি) ছাড়ে বিমানটি। দু’ঘণ্টার পথের প্রায় অর্ধেক পাড়ি দেওয়ার পর আর তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যায়নি। বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, প্রায় ৫২ মিনিট পর এয়ারবাস এ৩২০-র চালক একটি বিপদবার্তা পাঠান। কিছু ক্ষণের মধ্যেই রেডার থেকে মুছে যায় তার ছবি। কী ভাবে দুর্ঘটনা ঘটল, তা স্পষ্ট নয়।

একটি বেসরকারি বিমান ট্র্যাকিং ওয়েবসাইটের অবশ্য দাবি, জার্মানউইঙ্গসের ওই উড়ান প্রথমে ৩৮ হাজার ফুট উচ্চতায় ছিল। কিন্তু ভেঙে পড়ার আগে প্রতি মিনিটে তা তিন থেকে চার হাজার ফুট করে নীচে নামতে শুরু করে। বিমান যখন ৬৮০০ ফুট উচ্চতায়, তখনই ট্র্যাকিং সাইটটির সঙ্গে তাদের যোগ ছিন্ন হয়ে যায়।

বিমানের উচ্চতা হঠাৎ কমতে শুরু করেছিল বলে স্বীকার করে নিয়েছে জার্মানউইঙ্গসও। যে উচ্চতায় বিমানটির ওড়ার কথা ছিল তা ছুঁয়ে ফেলার এক মিনিট পর থেকেই বিমানটি নামতে শুরু করে। এয়ারবাস এ৩২০-র উচ্চতা এ ভাবে প্রায় সাত-আট মিনিট ধরে কমতে থাকে বলে দাবি বিমান সংস্থার। এর পর বিমানের সঙ্গে আর যোগাযোগ করতে পারেনি ফ্রান্সের এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোল। জার্মানউইঙ্গসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর টমাস উইঙ্কেলমান জানান, বিমানটি হারিয়ে যাওয়ার পর এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলই প্রথম বিপদ সঙ্কেত দেয়। চালক কোনও বার্তা পাঠাননি বলেও দাবি উইঙ্কেলমানের। উচ্চতা আচমকা কমলেও বিমান চালক কেন কিছু জানালেন না, সেই প্রশ্ন তুলছেন তিনি। বিমান বিশেষজ্ঞরা অবশ্য এখনই এর ভিত্তিতে সিদ্ধান্তে আসতে নারাজ। দুর্ঘটনার আগে ঠিক কী হয়েছিল তা বুঝতে বিমানের ব্ল্যাক বক্সের তথ্যের উপর ভরসা রাখছেন তাঁরা। 

কারণ যা-ই হোক, উদ্ধারকাজ যে সহজে হবে না তা নিয়ে এক মত সকলেই। আল্পস পর্বতের পাদদেশে যেখানে বিমানটি ভেঙে পড়েছে, সেখানে জনসংখ্যা এমনিতেই ভীষণ কম। চারিদিক বরফে ঢাকা। পাহাড়ের গায়ে স্কি, পর্বতারোহণ, র্যাফটিং-এর মতো অ্যাডেভেঞ্চার স্পোর্টসের নেশাতে সাধারণত এখানে জড়ো হন অনেকে। ফলে গাড়িতে দুর্ঘটনাস্থলে পৌঁছনো অসম্ভব। তবে ওই এলাকায় ছোট্ট একটা বিমানবন্দর আছে বলে ফরাসি প্রশাসন জানিয়েছে। বিমান ভেঙে পড়ার খবর পাওয়া মাত্র দশটি হেলিকপ্টার ও সেনা বিমান জোগাড় করে উদ্ধারকারীদের সেখানে পাঠানোর চেষ্টা হয়। কিন্তু আবহাওয়া খারাপ থাকায় উদ্ধার প্রথম দিকে শুরু করা যায়নি।

ফ্রান্সের প্রধানমন্ত্রী মানুয়েল ভল পরে পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, উদ্ধার কর্মীদের নিয়ে একটাই হেলিকপ্টার এ দিন ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। বিমানযাত্রীদের কেউই আর বেঁচে নেই বলে সেখান থেকে খবর পাঠিয়েছেন তাঁরা। বিমানটির ভগ্নস্তূপ দেখে এসে স্থানীয় কাউন্সিলর বলেন, “অল্প কিছুই আর অবশিষ্ট আছে।”

দেড়শো যাত্রী ও কর্মীকে হারিয়ে টুইটারে লুফতহানসা লিখেছে, ইতিহাসে আজ কালো দিন। এ দিন যে বিমানটি দুর্ঘটনার কবলে পড়েছে, তা ২৪ বছরের পুরনো এয়ারবাস। সাধারণত যাত্রী পরিবহণের ক্ষেত্রে বেশি ব্যবহৃত হয় এই এয়ারবাস-ই। তা হলে কি বহু ব্যবহারের জন্যই বিপদ? বিমান বিশেষজ্ঞদের অনেকেই বলছেন, ভারতে এর থেকেও পুরনো বিমান ওঠানামা করে। তাঁরা বরং জোর দিচ্ছেন চালকের দক্ষতা ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার উপরই।

কয়েক ঘণ্টা আগে প্রিয়জনকে ছাড়তে বিমানবন্দরে এসেছিলেন অনেকে। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ছুটে আসতে হয়েছে তাঁদের। বার্সেলোনার এল প্র্যাট বিমানবন্দরে তাঁদের সাহায্যের জন্য বিশেষ কেন্দ্র খোলা হয়েছে। যাত্রীদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনা যে নেই, সব মহল থেকে সে বার্তাও পেয়ে গিয়েছেন আত্মীয়রা।

তবু বুক বাঁধছেন তাঁরা অলৌকিকের আশায়!