বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের কথাই ছিল তাঁর হৃদয় জুড়ে। জন্মদিন মানে তাঁর কাছে উৎসব নয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরুর কয়েক দিন আগে, ১৭ মার্চ ছিল বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৫২তম জন্মদিন। ১৮ মার্চে সেই সময়ের ‘দৈনিক পাকিস্তান’ পত্রিকার শিরোনাম ছিল, ‘আমি জন্মদিনের উৎসব পালন করি না: এই দু:খিনী বাংলায় জন্মের আজ নেই কোন মহিমা’। সেই প্রতিবেদন লেখা হয়েছিল, বঙ্গবন্ধু বলেছেন, ‘আমি আমার জন্মদিনের উৎসব পালন করি না। এই দু:খিনী বাংলায় আমার জন্মদিনই বা কি আর মৃত্যু দিনই বা কি? আপনারা বাংলাদেশের অবস্থা জানেন। এদেশের জনগণের কাছে জন্মের আজ নেই কোন মহিমা। যখনি কারো ইচ্ছা হলো আমাদের প্রাণ দিতে হয়। বাংলাদেশের জনগণের জীবনের কোন নিরাপত্তাই তারা রাখেনি। জনগণ আজ মৃতপ্রায়। আমার আবার জন্মদিন কি? আমার জীবন নিবেদিত আমার জনগণের জন্যে। আমি যে তাদেরই লোক।’ ৫২তম জন্মদিনের এই বক্তব্যেই স্পষ্ট হয়ে ওঠে এই বিশাল হৃদয় মানুষটির কোমল মনটি।

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ জন্ম নেওয়া বঙ্গবন্ধু ’৭১ সালের উত্তাল দিনগুলোত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়ার খানের সঙ্গে দ্বিতীয় দফা বৈঠকের পর তাঁর বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপের সময়ে একজন সাংবাদিক বঙ্গবন্ধুকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। এর জবাবে বঙ্গবন্ধু তাঁকে বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, আজ আমার জন্মদিন। তবে ৫৩তম নয়। পত্রিকায় ভুল ছাপা হয়েছে, আজ আমার ৫২-তম জন্মদিন।’ তখন একজন বিদেশি সাংবাদিক তাঁকে প্রশ্ন করলেন, জন্মদিনের উৎসবের কোনও অনুষ্ঠান আজ আপনার হয়নি? মোমবাতি জ্বালিয়ে জন্মদিনের কেক সাজানো হয়নি? আপনি এক এক করে সেই মোমবাতি ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে ফেলার পর শুভেচ্ছা জানিয়ে কেউ গান গেয়ে ওঠেনি? বঙ্গবন্ধু জবাবে বললেন, জন্মদিনের উৎসব! আমি আমার জন্মদিনের উৎসব পালন করিনি।

বঙ্গবন্ধুর বাড়িতেও ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের কয়েক দিন আগে ১৭ মার্চ কোনও জন্মদিনের উৎসব পালিত হয়নি। তবে হাজার হাজার জনগণ সে দিন তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে গিয়েছিলেন। অনেকেই সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন শুভেচ্ছা সামগ্রী। শুধু তাই নয়, প্রিয় সংগ্রামী নেতার মঙ্গলময় জীবন কামনা করে শহরের বিভিন্ন স্থানে প্রার্থনার আয়োজন করা হয়েছিল। বিভিন্ন স্থান থেকে এসেছিল শুভেচ্ছা বাণী।

আরও পড়ুন: নির্মম হত্যার পরেও তিনি থেকে গেলেন বাঙালির হৃদয় জুড়ে​

১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধুর জন্মদিবসে ঢাকার একটি গ্রামোফোন রেকর্ড প্রতিষ্ঠান, ঢাকা রেকর্ড ৭ মার্চের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের রেসকোর্স ময়দানের সেই ঐতিহাসিক ভাষণের রেকর্ড বের করেছিল। ঢাকা রেকর্ডের জনাব সালাহউদ্দিন ও নবনির্বাচিত এমএনএ জনাব আবুল খায়ের বাজারে রেকর্ড ছাড়া উপলক্ষ্যে বঙ্গবন্ধুর বাসভবনে একটি রেকর্ড আনুষ্ঠানিক ভাবে বঙ্গবন্ধুকে উপহারও দেন সে দিন।

আরও পড়ুন: যে কোনও বয়সেই বঙ্গবন্ধুর প্রতিবাদী চরিত্র অমলিন

১৯২০ সালের ১৭ মার্চ ফরিদপুর জেলার গোপালগঞ্জ মহাকুমায় টুঙ্গীপাড়া গ্রামে শেখ মুজিবের জন্ম। রাম জন্মের আগে যেমন রামায়ণ লেখা হয়েছিল। বাঙালির জাতির দিশারী হিসেবে জন্ম নিয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ৮০ বছর বয়সে লিখেছিলেন, সভ্যতার সঙ্কট। তিনি লিখেছিলেন, ‘ভাগ্যচক্রের পরিবর্তনের দ্বারা একদিন না একদিন ইংরেজকে এই ভারতসম্রাজ্য ত্যাগ করে যেতে হবে। কিন্তু কোন ভারতবর্ষকে সে পিছনে ত্যাগ করে যাবে? কী লছাড়া দীনতার আবর্জনাকে। একাধিক শতাব্দীর শাসনধারা যখন শুষ্ক হয়ে যাবে, তখন এ কী বিস্তীর্ণ পঙ্কশয্যা দুর্বিষহ নিষ্ফলতাকে বহন করতে থাকবে।’ ব্রিটিশ শাসনে বাঙালি জাতি নিষ্পেশিত হওয়ায় রবীন্দ্রনাথের মনোযন্ত্রণার ভীষণ কারণ ছিল। কিন্তু তিনি আশা ছেড়ে তবু আশা রেখে দিয়েছিলেন। বাঙালি জাতির এক ভবিষ্যৎ নেতাকে দেখেছিলেন। ‘আজ আশা করে আছি, পরিত্রাণকর্তার জন্মদিন আসছে আমাদের এই দারিদ্র্য লাঞ্ছিত কুটিরের মধ্যে; অপেক্ষা করে থাকব, সভ্যতার দৈববাণী সে নিয়ে আসবে, মানুষের চরম আশ্বাসের কথা মানুষকে এসে শোনাবে এই পূর্ব দিগন্ত থেকেই। যদি বলি সেই পরিত্রাণ কর্তার নাম ‘শেখ মুজিবুর রহমান’। চল্লিশের দশকে একজন মনীষী এস এম ওয়াজেদ বলেছিলেন, বাংলাদেশের এমন একটা অজ পাড়া গাঁয়ে তিনি জন্মাবেন। বাঙালি জাতিকে মুক্ত করে ছাড়বেন। যিনি সবাইকে মুক্ত করবার জন্যে জন্মালেন। তিনি তো কখনই শান্তিতে থাকতে পারেননি।” ‘ছেলেমেয়েদের জন্যে যেন একটু বেশি মায়া হয়ে উঠেছিল। ওদের ছেড়ে যেতে মন চায় না, তবুও তো যেতে হবে। দেশ সেবায় নেমেছি, দয়া মায়া করে লাভ কি? দেশকে ও দেশের মানুষকে ভালবাসলে ত্যাগ তো করতেই হবে এবং সে ত্যাগ চরম ত্যাগও হতে পারে।’ (পৃ. ১৬৪)

১৯৭২ সালে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে শপথ নিচ্ছেন শেখ মুজিবুর রহমান।—আনন্দবাজার আর্কাইভ থেকে।

আমরা লক্ষ করি টুঙ্গিপাড়ার বালক খোকা পরিবারের চেয়ে প্রতিবেশীর কথা, নিজের চেয়ে সহপাঠীদের প্রয়োজন নিয়ে ভাবে বেশি। আর পরিণত বয়সে সমগ্র জাতির জন্য ভাবনা চিন্তা। শেখ মুজিবই হয়ে উঠলেন বাঙালি জাতিসত্তার এক মহান নির্মাতা। এই জন্যই বোধ হয় ইউরোপীয়রা বঙ্গবন্ধুকে অভিহিত করে থাকেন, ‘ফাউন্ডিং ফাদার অব্ দ্য নেশন’। বাঙালি জাতিসত্তার নির্মাতা তিনিই।  বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল তাঁর ‘ধুমকেতু’র পথে’ প্রবন্ধে লিখেছিলেন, ‘আমাদের সকলের মধ্যে নিরন্তর এই ফাঁকির লীলা চলেছে। আর বাঙলা হয়ে পড়েছে ফাঁকির বৃন্দাবন। কর্ম চাই সত্য, কিন্তু কর্মে নামবার বা নামাবার আগে এই শিক্ষাটুকু ছেলেদের, লোকদের রীতিমত দিতে হবে যে, তারা যেন নিজেকে ফাঁকি দিতে না শেখে, আত্মপ্রবঞ্চনা ক’রে নিজেকেই পীড়িত ক’রে না তোলে।’ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব খাঁটি সোনার চেয়েও খাঁটি দেশপ্রেমিক ছিলেন। টুঙ্গিপাড়ায় জন্ম নেওয়া এই সন্তান কাজী নজরুলের মতো বুঝতেন, “স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা, ও-কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশীর অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূণ স্বাধীনতা-রক্ষা, শাষনভার, সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনো বিদেশীর মোড়লী কারবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ-দেশে মোড়লী ক’রে দেশকে শ্মশান-ভূমিতে পরিণত করছেন, তাঁদেরে পাততাড়ি গুটিয়ে, বোঁচকা-পুটলী বেঁধে সাগর-পারে পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন নিবেদন করলে তাঁরা শুনবেন না।”

ঢাকার একটি জনসভায় শেখ মুজিবুর রহমান। ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ থেকে।

১৮ মার্চে ১৯৭১ ‘দৈনিক আজাদ’ এর ৫৩তম (সেই দিনের পত্রিকায় ভুল লেখা ছিল) জন্মদিবসে বঙ্গবন্ধু ‘আমি তোমাদেরই লোক’ “গতকাল বুধবার সন্ধার পূর্বক্ষণে আমি যখন শেখ মুজিবুর রহমানের ধানমন্ডির বাসভবনে প্রবেশ করি, তখন তাহার মুখে রবীন্দ্র কাব্যের উপরোক্ত চরণ কয়টি ঘুরিয়া ফিরিয়া বারবার উচ্চারিত হইতেছিল।

গতকাল ছিল শেখ মুজিবের ৫৩তম জন্মদিন। কিন্তু এই জন্ম বত্রিশ নম্বর রোডের কালো পতাকা শোভিত এই বাড়িতে ছিল না কোনও বিশেষ আয়োজন। শেখ মুজিবের কথায়, ‘বাংলাদেশের মানুষের জন্মদিনই হ্যাঁ কি, আর মৃত্যুদিনই বা কি! যখন কেহ তাহাদের মারিতে উদ্ধত হয়, তখন তাহারা মরে। আর আমি তো সেই জনগণেরই একজন।’

জন্মদিবস সম্পর্কে বিদেশি সাংবাদিকদের কাছে এই রকম মনোভাব প্রকাশের পাশাপাশি ভক্ত, অনুরাগীদের বঙ্গবন্ধু বলেন, ‘আমার জন্মদিবসের একমাত্র বক্তব্য লক্ষ্য অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত সংগ্রাম চলিতে থাকিবে। সত্য ও ন্যায় আমাদের পক্ষে। জয় আমাদের অনিবার্য।’

শেখ মুজিবের মুখে এই সংগ্রামের আহ্বান ও বিজয়ের বাণীই গতকাল মুখ্য হইয়া উঠে। আর এই বাণী শোনার প্রস্তুতি লইয়াই গতকাল কেউ বা ফুলের তোড়া, কেউ বা কেক লইয়া প্রিয় নেতার বাসভবনে ভিড় জমায়।

এক পর্যায়ে জনৈক ছাত্রনেতাকে সঙ্গীদের বলিতে শুনি, ‘জন্মদিনে সবাই তো ফুল কিংবা শুভেচ্ছা লইয়া আসিতেছে। আমরা নেতাকে কি দিব?

হাতবোমা না রিভলবার?’ নেতার জন্মদিনে শ্রমিকরাও আসিয়াছে মিছিলের মুখে শুভেচ্ছার ডালি লইয়া। বিনিময়ে নেতার নিকট হইতে পাইয়াছে একই সংগ্রামী আহ্বান।

লেখক রাজনৈতিক বিশ্লেষক