বিজয় মাল্য, ললিত মোদী, নীরব মোদীদের দেশ ছেড়ে পালাতে সাহায্য করার অভিযোগে  নরেন্দ্র মোদী সরকারকে বার বার কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন বিরোধীরা। আজ লন্ডনে বিজয় মাল্য দাবি করেছেন, দেশ ছাড়ার আগে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করেছিলেন তিনি। এ-ও জানিয়েছিলেন যে লন্ডনে যাচ্ছেন।

অর্থমন্ত্রীর নাম করেননি মাল্য। কিন্তু তড়িঘড়ি ফেসবুকে বিবৃতি দিয়েছেন অরুণ জেটলি। মাল্য যে সংসদে এক বার তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন সে কথা স্বীকার করলেও জেটলির দাবি, মাল্যের ‘ভাঁওতা’-য় কান দেননি। কংগ্রেস সভাপতি রাহুল গাঁধী বলেছেন, ‘‘লন্ডনে মাল্য গুরুতর অভিযোগ করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর উচিত এখনই নিরপেক্ষ তদন্তের নির্দেশ দেওয়া। তদন্ত চলাকালীন অরুণ জেটলির অর্থমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানো উচিত।’’

বিজয় মাল্যের প্রত্যর্পণ নিয়ে শুনানি চলছে লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেটস কোর্টে। আজ আদালতের বাইরে সাংবাদিকেরা মাল্যকে প্রশ্ন করেন, ‘‘দেশ ছা়ড়ার আগে আপনাকে কি কেউ সতর্ক করেছিলেন?’’ মাল্য বলেন, ‘‘জেনিভায় একটি বৈঠকে যোগ দেওয়ার জন্য দেশ ছেড়েছিলাম। তার আগে অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে ব্যাঙ্কের পাওনা মেটানোর প্রস্তাব দিয়েছিলাম।’’ মাল্যের দাবি, ‘‘আমাকে নিয়ে ফুটবল খেলা হচ্ছে। কিন্তু আমার বিবেক পরিষ্কার। কর্নাটক হাইকোর্টেও ১৫ হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি বিক্রি করে পাওনা মিটিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছি।’’ মাল্যের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যাঙ্কের পাওনার পরিমাণ ৯০০০ কোটি টাকা।

মাল্যের মন্তব্যের পরে বিরোধীদের আক্রমণের মুখে অস্বস্তিতে পড়ে বিজেপি। জেটলি জানান, ২০১৪ সালে অর্থমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে তিনি কখনও মাল্যকে দেখা করার জন্য সময় দেননি। তবে মাল্য রাজ্যসভার সদস্য ছিলেন। সেই সুযোগের অপব্যবহার করে সংসদেই এক বার তাঁর সঙ্গে দেখা করেছিলেন। জেটলির কথায়, ‘‘সংসদ কক্ষ থেকে বেরিয়ে আমার ঘরে যাচ্ছিলাম। উনি দ্রুত পায়ে কাছে এসে জানান, পাওনা মেটাতে একটা প্রস্তাব দিতে চান। আমি জানতাম, উনি আগেও এমন ভাঁওতা দিয়েছেন। তাই ওঁকে স্পষ্ট বলে দিই, আপনি ব্যাঙ্কের সঙ্গে কথা বলুন। আমার সঙ্গে কথা বলে লাভ হবে না। ওঁর সঙ্গে যে সব নথি ছিল তা-ও আমি নিইনি।’’

যা শুনে বিরোধীদের প্রশ্ন, মাল্যের সঙ্গে দেখা হওয়ার কথা জেটলি এত দিন প্রকাশ করেননি কেন?

মাল্য অবশ্য অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে তাঁর কথাবার্তা সম্পর্কে বিশদে মুখ খুলতে রাজি হননি। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘‘আপনাদের বলতে যাব কেন?’’ পরে লন্ডনে ফের প্রশ্নের মুখে পড়ে বলেন, ‘‘সংবাদমাধ্যম বিতর্ক ছড়াচ্ছে। ঘটনাচক্রে জেটলির সংসদে দেখা হয়েছিল। আমি তাঁকে বলেছিলাম যে, লন্ডনে যাচ্ছি।’’ মাল্য যে কোনও ‘প্রভাবশালী’র সাহায্যেই দেশ ছেড়ে পালাতে পেরেছেন, সেই অভিযোগ শুধু বিরোধী শিবির থেকেই ওঠেনি। বিজেপি নেতা সুব্রহ্মণ্যম স্বামীরও অভিযোগ, অর্থ মন্ত্রকের কারও নির্দেশে মাল্যের বিরুদ্ধে ‘লুক আউট’ নোটিসে পরিবর্তন করে বলা হয়, মাল্যকে আটকানোর দরকার নেই। তাঁর যাওয়ার কথা সরকারকে জানালেই চলবে। মাল্যের অবশ্য দাবি, তাঁকে কেউ সতর্ক করে দেয়নি।

দলে স্বামী জেটলির বিরোধী হিসেবে পরিচিত। বিজেপি সূত্রের মতে, দল ও সরকারে জেটলি-বিরোধীরা অর্থমন্ত্রীকে বিপাকে ফেলতে আগে থেকেই ছক কষেছেন। এ বার মাল্য মুখ খোলার পরে দল জেটলির পাশে দাঁড়ায় কি না দেখার।

ব্রিটিশ আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, আর্থার রোড জেলের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের আট মিনিটের একটি ভিডিয়ো আজ পেশ করা হয়েছে ওয়েস্টমিনস্টার ম্যাজিস্ট্রেটস কোর্টে। মাল্যের আইনজীবীর মতে, যা কিনা জেলের ‘বার্নিশ করা সংস্করণ’। তাঁর কথায়, ‘‘পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, দেওয়ালগুলি বিশেষ ভাবে রং করা হয়েছে। মনে হয়, টয়লেটও নতুন।’’ বিচারক জানিয়েছেন, তিন বার ওই ভিডিয়োটি দেখেছেন তিনি। তবে এ নিয়ে আর কোনও মন্তব্য করেননি বিচারক। ভারতীয় কর্তাদের বক্তব্য,  স্বাধীন দেশ তার জেল রং করাবে, এতে কার কী বলার থাকতে পারে!  

সংবাদমাধ্যমের একাংশে আজ ‘ওই ভিডিয়োর কপি’ বলে দাবি করে যা প্রকাশ করা হয়েছে, তাতে দেখা গিয়েছে, যথেষ্ট আলো-হাওয়া ঢোকে ১৫ বাই ২০ ফুটের ওই সেলে। তিনটি জানলা। তিনটি ভেন্টিলেটর। ছ’টি টিউবলাইট। ২০ ফুট উঁচু সিলিং থেকে ঝুলছে তিনটি পাখা। দেওয়ালে একটি এলইডি টিভিও। সেলের গরাদের বাইরে করিডরটিও বেশ আলোকজ্জ্বল। বাইরে ১৭.৫ মিটার হাঁটার জায়গায় জগিং বা ব্যায়াম করতেও বাধা নেই। মাল্যের আইনজীবী অভিযোগ এনেছিলেন, ভারতে জেলের কুঠুরিতে যথেষ্ট আলো-হাওয়া আসে না। ওখানে পাঠালে মাল্যের মানবাধিকার লঙ্ঘিত হবে। তার পরেই ওই জেলের যে সেলে মাল্যকে রাখার কথা ভাবা হচ্ছে তার ভিডিয়ো দেখতে চান বিচারক। এ নিয়ে প্রশ্নের জবাবে মাল্য ব্যঙ্গের সুরে বলেন, ‘‘জেলের ব্যবস্থা বেশ ভালই!’’

এ দিনই ব্যাঙ্কগুলির দায়ের করা মামলায় ব্রিটেনের কোর্ট অব অ্যাপিলস-এ হেরে গিয়েছেন মাল্য। ফলে ব্রিটেনের হাইকোর্ট সব দেশে তাঁর সম্পত্তি ফ্রিজ করার যে নির্দেশ দিয়েছিল, তা বহাল রইল।  

 

পলাতক-যোগ

• ললিত মোদী: প্রাক্তন আইপিএল কর্তাকে ইউরোপে যেতে সাহায্য করায় অভিযুক্ত সুষমা স্বরাজ-বসুন্ধরা রাজে।

• নীরব মোদী: ডাভোসে বিশ্ব আর্থিক ফোরামে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছবি। অভিযোগ, নীরবের কেলেঙ্কারির কথা জানত সরকার।

• মেহুল চোক্সী: ‘হমারে মেহুলভাই’ বলে বক্তৃতায় সম্বোধন খোদ প্রধানমন্ত্রীর।