মাথাটা ছাই-ছাই। আর বডিটা পুরো সবুজ। কড়া নিরাপত্তায় মোড়া ট্রেন। কামরা থেকে নেমে এলেন উত্তর কোরিয়ার শাসক কিম জং উন। তত ক্ষণে লাল কার্পেটে মোড়া হয়ে গিয়েছে প্রায় পুরো স্টেশন চত্বর। ফেব্রুয়ারির শেষে এ ভাবেই কিম পা রেখেছিলেন ভিয়েতনামে। সেই সবুজ ট্রেন থেকেই আজ নামলেন রাশিয়ার বন্দর শহর ভ্লাদিভস্তকে। পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে হ্যানয়ে তাঁর বৈঠক ছিল মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে। এখানে কিমের সঙ্গে এক টেবিলে বসবেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। সব ঠিক থাকলে আগামী কালই।

কিন্তু সব ঠিক আর থাকল কই— বলছেন আন্তর্জাতিক কূটনীতিদের একটা বড় অংশ। কিমের দেওয়া শর্ত পোষায়নি বলে হ্যানয়ের বৈঠক থেকে মাঝপথেই উঠে গিয়েছিলেন ট্রাম্প। কিম চেয়েছিলেন পিয়ংইয়্যাংয়ের উপরে চাপানো সব নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক। কিন্তু সম্পূর্ণ পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ ছাড়া তা সম্ভব নয় বলে স্পষ্ট জানিয়েছিলেন ট্রাম্প। বৈঠক ভেস্তে যাওয়ার দু’মাস পরেও তেমন উল্লেখযোগ্য কোনও বৈঠক হয়নি দু’দেশে। উল্টে গত সপ্তাহেই ফের নতুন একটি ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করেছে উত্তর কোরিয়া। এখানেই শেষ নয়, কিম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন এই সংক্রান্ত আলোচনায় মার্কিন বিদেশসচিব মাইক পম্পেয়ো থাকলে তাঁরা আর একটি কথাও বলবেন না। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি ঘোরালো। তাই এমন একটা সময়ে কিমের রাশিয়া-সফরে জল্পনা বাড়ছে। ক্রেমলিন জানিয়েছে, কোরীয় উপদ্বীপ এলাকায় শান্তিরক্ষা এবং পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ সংক্রান্ত বিষয় নিয়েই কথা হবে দুই রাষ্ট্রনেতার।

২০১৮-র মার্চ থেকে ধরলে কিম এখনও পর্যন্ত চিনা প্রেসিডেন্ট শি চিনফিংয়ের সঙ্গে চার বার, দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জায়ে ইনের সঙ্গে তিন বার, ট্রাম্পের সঙ্গে দু’বার এবং ভিয়েতনামি প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এক বার বৈঠক করেছেন। রাশিয়ার সঙ্গে আগোগাড়া সম্পর্ক ভাল থাকলেও, দুই প্রেসিডেন্টের মুখোমুখি সাক্ষাৎ হতে চলেছে এ বারই প্রথম। এবং তা যথেষ্ট আটঘাট বেঁধেই বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের দাবি, আমেরিকার সঙ্গে হালে তৈরি হওয়া জটিলতা কাটাতেই যত বেশি সম্ভব আন্তর্জাতিক শক্তিকে হাতে রাখতে চাইছেন কিম।

কিন্তু রাশিয়ার এতে কী লাভ? পিয়ংইয়্যাংয়ের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে মস্কো তেমন গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রভাব খাটাতে পারবে না বলেই মত বিশেষজ্ঞদের একাংশের। তাঁদের দাবি, কিমের সঙ্গে এক টেবিলে বসার পরে পুতিন এ বার নিশ্চিত ভাবেই কোরীয় উপদ্বীপে নাক গলাতে চাইবেন। খনিজ সম্পদ এবং কিছু বিরল ধাতুতে সমৃদ্ধ উত্তর কোরিয়ার প্রতি স্বাভাবিক আকর্ষণ আছে অনেক দেশেরই। কূটনীতিকদের একাংশ বলছেন, কিম আসলে দেখাতে চাইছেন আমেরিকার মতো রাশিয়া-চিনের দিকেও সহযোগিতার হাত বাড়াতে চাইছে তাঁর দেশ। কিন্তু এর প্রতিদানে রাশিয়া-চিন কি ডলার-বৃষ্টি করতে পারবে? 

তেমন আশার আলো দেখছেন না কোরীয় বিশেষজ্ঞরা।

তাই কিমের এই হঠাৎ রাশিয়া সফরকে অনেকেই কূটনৈতিক চাল বলছেন। আট বছর আগে রাশিয়া এসেছিলেন কিমের বাবা কিম জং ইল। কিম এলেন এ বারই প্রথম। বন্ধু দেশের তরফে উষ্ণ অভ্যর্থনাও পেলেন। শোনা যাচ্ছে, এখান থেকে পিয়ংইয়্যাং ফেরার পথে বেজিং-ও ঢুঁ মেরে যাবেন কিম।