ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচনে আগামিকাল ভোট দেবেন ব্রিটেনের নাগরিকরা। ইউকে ইন্ডিপেনডেন্স পার্টি (ইউকেআইপি)-র প্রাক্তন নেতা নাইজেল ফারাজ এখন ব্রেক্সিট পার্টির প্রধান। তিনিই এই নির্বাচনে সব চেয়ে বেশি আসন পাবেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তবে এখনকার শাসক দল কনজ়ারভেটিভ পার্টিকে চতুর্থ স্থানে রাখছেন তাঁরা। বিরোধী লেবার পার্টি এবং লিবারেল ডেমোক্র্যাটদেরও (লিব ডেম) পিছনে চলে গিয়েছে প্রধানমন্ত্রী টেরেসা মে-র দল। 

আর এই ভোটেও সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে ব্রেক্সিট প্রসঙ্গ। ভোটাররা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে যাবেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়া অথবা ইইউ-তেই থেকে যাওয়ার অবস্থানে।  

ইউরোপীয় পার্লামেন্টে ব্রিটেনের ৭৩টি আসন রয়েছে। আর তাদের সদস্য সংখ্যা ৭৫১। ইইউভুক্ত ২৮টি দেশের ৫০ কোটি নাগরিকের প্রতিনিধি হিসেবে পার্লামেন্টে আসেন নির্বাচিত সদস্যরা। দেশের আয়তনের উপরে নির্ভর করে সেই দেশ কত আসন পাবে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে।

ইইউ পার্লামেন্টের মূল কাজ আইন পাশ করা, সদস্য-রাষ্ট্রগুলির মন্ত্রীদের সঙ্গে কাজ করা। মন্ত্রীদের এই গোষ্ঠীকে বলা হয় কাউন্সিল। এই পার্লামেন্টের সদস্যরা ইউরোপীয় কমিশনের কাজকর্মেও নজর রাখেন। কমিশনই ইউরোপীয় ইউনিয়নের আইনের খসড়া তৈরি করে এবং সেগুলিকে বলবৎ করে।   

এর আগে ২৯ মার্চ ইউরোপীয় ইউনিয়ন ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়ার কথা ছিল ব্রিটেনের। কিন্তু তা শেষ পর্যন্ত সম্ভব না হওয়ায় ইইউয়ের আইন মেনে ব্রিটেনকেও এই নির্বাচনে প্রার্থী দিতে হয়েছে। তবে বিশ্লেষকদের অনেকেই মনে করছেন, গোটাটাই ঠাট্টার বিষয়ে পরিণত হয়েছে! ইইউ থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পক্ষে ভোট দিয়েছে ব্রিটেন। আগামী ৩১ অক্টোবর সেটা হয়ে যাওয়ারও কথা। কিন্তু ইইউয়ের নিয়মকানুন ছেড়ে এখনই অন্য পথে হাঁটা সম্ভব নয় ব্রিটেনের পক্ষে। তাই নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় অংশ নিতেই হচ্ছে তাদের।   

নাইজেল ফারাজের মতো ব্রেক্সিটপন্থী নেতারা এই নির্বাচনকে কাজে লাগাচ্ছেন অন্য ভাবে। তিনি   এ বার ইউরোপীয় পার্লামেন্টে জিতে দেশের অন্য গুরুত্বপূর্ণ দলগুলিকে বার্তা দিতে চাইছেন। ইউকেআইপি-র প্রাক্তন নেতা এমনিতেই সব চেয়ে বেশি রেটিং পেয়ে এগিয়ে রয়েছেন। তাঁর দল চায়, যত দ্রুত সম্ভব ইইউ থেকে বেরিয়ে যেতে। ফারাজ গতকালই বলেছেন, বিপ্লবের শুরুটা ইউরোপীয় পার্লামেন্ট নির্বাচন দিয়ে হচ্ছে যা ওয়েস্টমিনস্টাকে কাঁপিয়ে দেবে। শাসক দলের প্রতি ব্রেক্সিট পার্টির সদস্য অ্যান উইডিকমের (যিনি কনজ়ারভেটিভ পার্টি ছেড়ে এই দলে যোগ দেন) বার্তা, ‘‘হয় ইইউ থেকে ব্রিটেনকে বেরিয়ে যেতে দিন, না হলে আপনাদের ওয়েস্টমিনস্টার ছাড়তে বাধ্য করব আমরা।’’ 

যদিও নাইজেল ফারাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদও চলছে ব্রিটেনের বিভিন্ন জায়গায়। গত কালই নিউক্যাসেল-এ তাঁর দিকে মিল্কশেক ছোড়েন এক যুবক। তাঁর গ্রেফতারির পরেও আজ কেন্ট-এর রচেস্টারে নাইজেলের প্রচার-বাস কিছু ক্ষণের জন্য ঘিরে ধরেছিলেন কালো পোশাকের তিন বিক্ষোভকারী। তাঁদের হাতেও ছিল মিল্কশেক। নাইজেল অবশ্য বাস থেকে নামেননি। 

তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো লেবার পার্টির রোহীত দাশগুপ্ত প্রচারে বলেছেন, ব্রেক্সিট পার্টি বর্ণবৈষম্যে বিশ্বাসী, ওদের হারাতেই হবে। কনজ়ারভেটিভ দলের প্রবীণ নেতারা আবার বলছেন, এই ভোটে তাঁরা লিবারেল ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে। গ্রিন পার্টিকেও ভোট দিতে চান লেবার পার্টির অনেক সদস্য। লিব ডেম, স্কটিশ ন্যাশনালিস্ট পার্টি, গ্রিন পার্টি এবং সদ্য গঠিত চেঞ্জ ইউকে পার্টি— এরা সবাই ইইউয়ে থেকে যাওয়ার পক্ষে এখনও সওয়াল করছে। এরা চায়, দ্বিতীয় বার গণভোট হোক। তবে দ্বিতীয় গণভোট নিয়ে কোনও অবস্থান না নেওয়ায় সমালোচিত হচ্ছেন লেবার পার্টির নেতা জেরেমি করবিন। এটা স্পষ্ট, যে তিনি ইউরোপীয় পার্লামেন্টের ভোটে তেমন কিছুই দাগ কাটতে পারবেন না। 

স্থানীয় কাউন্সিল ভোটে দেখা গিয়েছে, ব্রেক্সিট সঙ্কট নিয়ে জেরবার সাধারণ নাগরিকরা প্রধান দলগুলির পরিবর্তে ভরসা রেখেছেন গ্রিন পার্টি এবং লিব ডেম-এর উপরে। এর মধ্যে টেরেসা মে আবার ঘোষণা করেছেন, ইইউ থেকে সরে যাওয়ার জন্য তিনি চতুর্থবার বিল পেশ করবেন পার্লামেন্টে। করবিন আগেই জানিয়েছেন, তিনি এ বারও সমর্থন করবেন না মে-র প্রস্তাব। কনজ়ারভেটিভ দলের অনেকেও এতে সম্মতি জানাবেন না বলেই আভাস মিলেছে। তাই আবারও মুখ থুবড়ে পড়তে পারে টেরেসার প্রস্তাব। জুনে তিনি ইস্তফা দেওয়ার কথা বলেছেন। সে ক্ষেত্রে জনপ্রিয়তার দৌড়ে এগিয়ে বরিস জনসন। তিনি ব্রেক্সিটপন্থী। ফলে নয়া নেতৃত্বকে ৩১ অক্টোবর চুক্তিহীন ব্রেক্সিট হলেও বেরিয়ে যেতে হবে ইইউ ছেড়ে। দেশের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও অন্যান্য সংগঠনেরও মনে হচ্ছে তেমনটাই।