বিদেশি ঋণের ভারে নুইয়ে পড়া পাকিস্তানের গত ১৪০ দিনে লোকসান হয়েছে নয় নয় করে ১০ কোটি ডলার! ভারতীয় মুদ্রায় যা ৬৮৫ কোটি টাকা। মানে, দিনে ৭০ লক্ষ ডলারেরও বেশি। ভারতের উপর ‘রাগ’ দেখাতে গিয়ে!

সেই লোকসানের ধাক্কাটা ইসলামাবাদকে গত সাড়ে ৪ মাস ধরে সইতে হয়েছে ‘নিজের নাক কেটে অন্যের যাত্রাভঙ্গ’ করতে গিয়ে! ভারতের কোনও বিমানকে পাকিস্তানের আকাশসীমায় ঢুকতে দেওয়া হবে না, ইসলামাবাদ এই গোঁ ধরে থাকায়।

কিন্তু পেটের টান বলে কথা! তা-ও আবার যখন ঘাড়েতে বিদেশি ঋণের বোঝা পর্বতপ্রমাণ, মাথার উপর ঝুলছে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারির আশঙ্কার খাঁড়া, তখনই জেদের বশে যে ডালে বসে রয়েছে, সেই ডালই কাটছিল ইসলামাবাদ! প্রায় সাড়ে ৪ মাস ধরে।

শেষমেশ পেটের টানই প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সরকারকে বাধ্য করল তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত বদলাতে। আকাশসীমা খোলার পূর্ব শর্ত আরোপের ৫ দিনের মাথায় ইসলামাবাদকে বলতে হল, আর দেরি না করে ঘোষণার সময় থেকেই খুলে দেওয়া হল পাক আকাশসীমা। আদতে যা ইসলামাবাদের পশ্চাদপসরণ!

আরও পড়ুন- পাক আকাশে ভারতীয় উড়ানে নিষেধাজ্ঞা উঠল, বালাকোট অভিযানের পর এই প্রথম​

ভারত না পিছলে, তারা এগবে না, জানিয়েছিল ইসলামাবাদ 

পাঁচ দিন আগেই তো পাক অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রকের সচিব ও পাক অসামরিক বিমান পরিবহণ কর্তৃপক্ষের ডিরেক্টর জেনারেল শাহরুখ নুসরত জানিয়েছিলেন, ভারত যদি সীমান্তবর্তী বায়ুসেনা ঘাঁটিগুলি থেকে যুদ্ধবিমান সরিয়ে না নেয়, তা হলে পাকিস্তানও আকাশসীমা খুলে দেবে না ভারতীয় বিমানগুলির জন্য। যা বালাকোটে জঙ্গিদের প্রশিক্ষণ ঘাঁটির উপর বায়ুসেনার বোমাবর্ষণের পরের দিন থেকেই ইসলামাবাদ বন্ধ করে দেয়। তার পর ভারতও বন্ধ করে দেয় তার আকাশসীমা পাক বিমানগুলির জন্য।

কেন হঠাৎই পাকিস্তানের একতরফা পশ্চাদপসরণ?

পরিসংখ্যান দেখাচ্ছে, রোজ ৪০০ ভারতীয় বিমান যায় পাক আকাশসীমা পেরিয়ে। সেই রুটের উপর নজর রাখা (নেভিগেশন) আর পাকিস্তানের বিভিন্ন বিমানবন্দরে সেই বিমানগুলির সামিক অবতরণের জন্য ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলির কাছ থেকে মোটা টাকা নেন পাক অসামারিক বিমান পরিবহণ কর্তৃপক্ষ। বোয়িং ৭৩৭-এর মতো একটি যাত্রীবাহী বিমানের উপর নিজেদের আকাশসীমায় নজরদারি আর পাক বিমানবন্দরে সাময়িক অবতরণের জন্য ইসলামাবাদ কড়ায়-গণ্ডায় বুঝে নেয় দিনে ৬০০ থেকে ৭০০ ডলার।

তার মানে, দিনে যদি ৪০০টি ভারতীয় যাত্রীবাহী বিমান পাক আকাশসীমা দিয়ে যাওয়া-আসা করে, তা হলে ইমরান খান সরকারের রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ হয় দিনে ৩ লক্ষ ডলার। তার ফলে ১৪০ দিনে পাকিস্তানের লোকসান হয়েছে ভারতীয় মুদ্রায় ৬৮৫ কোটি টাকা।

ভারতকে আকাশসীমা ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না, এই গোঁ ধরে রাখতে গিয়ে গত সাড়ে ৪ মাসে এই বিপুল লোকসানের ধাক্কাটাই সইতে হয়েছে ইসলামাবাদকে। যখন বিদেশি ঋণের বোঝায় উত্তরোত্তর ঝুঁকে পড়ছে ইমরান খান সরকার।

আরও পড়ুন- কাবুলে কোণঠাসা দিল্লি? উঠছে প্রশ্ন​

লোকসান ভারতেরও, তবে অনেক কম

ক্ষতি যে ভারতের হয়নি তা নয়। ওই সময় আরও দূরের রুট ধরে যাওয়ার জন্য ভারতীয় বিমান সংস্থাগুলিরও লোকসান খুব কম হয়নি। কেন্দ্রীয় অসামরিক বিমান পরিবহণ মন্ত্রী হরদীপ পুরি গত ৩ জুলাই রাজ্যসভায় জানান, গত ২৭ ফেব্রুয়ারি থেকে পাক আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য ভারতের লোকসান হয়েছে ৫৫০ কোটি টাকা। তার মধ্যে এয়ার ইন্ডিয়ার লোকসান হয়েছে ৪৯১ কোটি টাকা, স্পাইসজেটের ৩০ কোটি ৭৩ লক্ষ টাকা, ইন্ডিগোর ২৫ কোটি ১০ লক্ষ টাকা আর গোএয়ার-এর ২ কোটি ১০ লক্ষ টাকা। যদিও পাকিস্তানের লোকসানের পরিমাণের তুলানায় তা নস্যিই!

আমেরিকাও চাইছিল না

চাপ ছিল আমেরিকারও। তড়িঘড়ি ভারতীয় বিমানগুলির জন্য নিজেদের আকাশসীমা না খুলে দিলে নতুন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা জারির আশঙ্কা ছিল। কারণ, পাক আকাশসীমা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে ভারতীয় বিমানগুলিকে ঘুর-পথে ইরানের আকাশসীমা ধরে যেতে হচ্ছিল। ইরানের সঙ্গে হালের সম্পর্কের জেরে যা আমেরিকার আদৌ পছন্দ হচ্ছিল না।

ফলে, পেটের টান আর আমেরিকার বাড়তি চাপের আশঙ্কাই কি পিছু হঠতে বাধ্য করল না ইসলামাবাদকে?