এক দিকে রাজনৈতিক নেতাদের গরমাগরম বক্তৃতা, হুঙ্কার, যুদ্ধ-জিগির জাগিয়ে তোলার নানা হিড়িক।

অন্য দিকে, কয়েক জন মহিলা, এবং তাঁদের কবিতা, অভিনয়, আর গানের মধ্য দিয়ে শান্তির বার্তা।

প্রথম দলটি ব্যস্ত ঘরোয়া রাজনীতি আর প্রতিবেশীর সঙ্গে কোন্দল নিয়ে।

দ্বিতীয় দলটি উড়িয়ে দিচ্ছে ভালবাসার ওড়না। এই আশায় যে, সীমান্তের কাঁটাতার পেরিয়ে তা পৌঁছে যাবে পড়শি বন্ধুর আঙিনায়। বন্ধুও পরম আদরে গায়ে জড়িয়ে নেবে সেই উষ্ণতা।

পাকিস্তানের তিন বোনের তৈরি এক মিউজ়িক ভিডিয়ো এ ভাবেই ছড়িয়ে দিতে চাইছে ভালবাসা ও শান্তির বার্তা। ৪ এপ্রিল ইউটিউবে পোস্ট করা সেই ভিডিয়ো দু’পারের দর্শকদেরই ভারী মনে ধরেছে। গত চার দিনে ৬৮ হাজার ১২৫ জন দেখেছেন ভিডিয়োটি। 

কাশ্মীরে পুলওয়ামায় পাক জঙ্গি গোষ্ঠী জইশ-ই-মহম্মদের হামলা এবং তার উত্তরে ভারতীয় বায়ুসেনার বালাকোট অভিযানের পর থেকেই দু’দেশের উত্তেজনার পারদ হুহু করে চড়ছে। ভারতীয় বায়ুসেনার উইং কমান্ডার অভিনন্দন বর্তমানকে ফিরিয়ে পাকিস্তান সৌহার্দ্যের বার্তা দিলেও সেই সম্প্রীতির বাতাবরণ বেশি ক্ষণ স্থায়ী হয়নি। ফুটন্ত তেলে ফোড়ন দিয়েছে ভারতের আসন্ন নির্বাচন।

সীমান্তের আঁচ শহরে বসেও বেশ টের পাওয়া যায়। লাহৌর হোক বা করাচি, দিল্লি বা মুম্বই, ড্রইংরুমের আলোচনাতেও অনুপ্রবেশ ঘটছিল সেই  চাপান-উতোরের। তেমনই এক বৈঠকখানায়, লাহৌরে, জনপ্রিয় গল্পকার নীলম আহমেদ বশিরের বাড়িতে এক সন্ধেয় তাঁকে ছেঁকে ধরেছিলেন এক দল তরুণ-তরুণী। তাঁরা ‘বাজ়ার মিডিয়া’ নামে একটি সংস্থা চালান। তাঁদের আর্জি, যা কাণ্ডটা হচ্ছে সীমান্তে, তা নিয়ে একটা কবিতা লিখে দিতে হবে নীলমকে। 

‘‘সত্যি কথা বলতে, কবিতা আমি খুব কম লিখি। বর‌‌ং গল্প লিখে ফেলি অনেক সহজে। কিন্তু ওরা সব ছেলেমানুষ। কিছুতেই বুঝতে চাইছিল না। তা ছাড়া, বিষয়টি নিয়ে আমার অনেক কিছু বলারও ছিল,’’ লাহৌর থেকে ফোনে বললেন নীলম। ‘‘তখনই বসে লিখে ফেললাম ‘হামসায়ে মা জায়ে (একই মাটির সন্তান)’। পঞ্জাবি ভাষায়।’’ সাধারণত উর্দুতে লেখালেখি করেন নীলম। হঠাৎ পঞ্জাবিতে কেন? নীলম বললেন, ‘‘পঞ্জাবি আমার মাতৃভাষা। এই ভাষাতেই কথা বলি, গান গাই। তা ছাড়া, দেশভাগের সময়ে ভাগ হয়েছিল দু’টো প্রদেশ, বাংলা আর পঞ্জাব। এই দু’টো জায়গার মানুষকে যত ভুগতে হয়েছিল, ততটা মনে হয় আর কাউকে হয়নি। এই পঞ্জাবেই আমার জন্ম। তাই পঞ্জাবিতেই কবিতাটি লিখি।’’

একই মাটির সন্তান
ও-বাড়ির সই লো, ও-বাড়ির সই
পাঁচিলের ধারে আয় কটা কথা কই
শুনি দুই দেশে নাকি বিরাট ঝামেলা?
আরে ধুস! সে একটা খোরাকের কথা
মোড়লির ঢং করে যত ধেড়ে খোকা
ছেলেখেলা-রাজনীতি করে দুই দেশে।
ছাড় ছাড়, আয়, চল অন্য কথা বলি।
প্রায়ই ভাবি, তোর বাড়ি ভিতরে কেমন
হরবখত আমিও তো সে কথাই ভাবি!
মনে হয়, তোর ঘরও আমাদেরই মতো
একটাই দু’জনের ছাদের আকাশ
সেই আকাশে তো একটাই চাঁদ।
টিভিতে বলছে, শত্রু নাকি তোরা!
ও লো সই, ও-বাড়ির সই, বল তো কী রাঁধি?
শাকভাত নাকি বেশ ফোড়ন দিয়ে ডাল?
চল্, আজ দু’জনের হাঁড়ি চেখে দেখি।
শোন না, ও সই লো, কত বার ভাবি
দু’বাড়ির জানালায় সূর্যেরই আলো
চাঁদটাও একই থাকে রাতের আঁধারে
কুয়ো থেকে দু’জনে জলই তো তুলি
সেই মেঝে, সেই ছাদ, নামটা আলাদা
এখানে পাকিস্তান, আর ওখানে ভারত।
অথচ দু’ঘরে দেখ্ বাড়ন্ত চাল
জল নেই, আলো নেই, কষ্টে কাটে দিন
ভরপেট ভাত নেই ছেলেমেয়েগুলোরও
আমাদের কথা তো ছেড়েই দিলাম।
পাঁচিলে উঁচিয়ে থাকা ভাঙা যত শিশি
সে সবের তোয়াক্কা কখনও করে না।
টিভিতে বলেছে সই, তোদের বাড়িতে
পরমাণু বোমাটোমা আছে তুলে রাখা
এ দিকে শুনছি, বোমা তোদেরও ঘরে
ফাটে যদি দুম করে কাক চিল ছাদে মরে
বসে বসে পেরোব পগার
ছাইপাঁশ বোমে চল নুড়ো দিই জ্বেলে
ঝিনচ্যাক গান বেঁধে দুমদাম তালে
ধুমধাম নাচ করি দু’জনাতে মিলে।
চল চল নাচি গাই আমরা দু’বোন।
টপকে পেরোই চল ভাগের পাঁচিল
কী করে বল না ভাই, এর উপরে চড়ি?
ভাঙা কাচে ঘষা লেগে চিরে যাবে বুক
রক্ত চুঁইয়ে যাবে দেওয়ালের গায়ে
কেউ কি তবুও তার কাচ বেছে দেবে?
বোমাটাকে বাজি করে চ’ যাই পোড়াই
কানেটানে তালা লেগে প্রাণে হোক সুখ
ওড়না বদল করি চল সই আজ
তুড়ি দিয়ে দুঃখকে তাড়িয়ে নাচি
প্রাণ খুলে আজকে চ’ খুব হাসি।
পাত্তা দেব না ছেঁদো ব্যাপারে যত
সোনার দেশের পড়শি হিরের টুকরো
চল, চুলো জ্বেলে সব বোম-টোম ফেলি
হাততালি দিয়ে নাচি ধেই ধেই করে
দু’বাড়ির দুই সই বকুলের ফুল
দু’জনাকে জড়িয়ে আজকে জুড়োই।
অনুবাদ: ঋকদেব ভট্টাচার্য

কবিতাটি নীলমকে দিয়ে পাঠ করিয়ে নেন ‘বাজ়ার মিডিয়া’র ছেলেমেয়েরাই। তার পরে নীলমের ফেসবুক পেজে পোস্ট করে দেন সেটি। কয়েক মিনিটের মধ্যে ভাইরাল হয়ে যায় সেটি। অনেকেই ফেসবুকে অনুরোধ করেন, কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদ করার জন্য। ‘‘সে-দিনই রাত জেগে কবিতাটি অনুবাদ করে ফেলি। যাতে পঞ্জাবি ভাষা না-জানলেও বুঝতে কারও অসুবিধা না হয়।’’ কবিতাটি নীলম পড়তে শুরু করেছিলেন ‘আমার প্রিয় ভারতীয় বন্ধুদের জন্য’ এই কথা বলে। সেই বন্ধুদের প্রতি তাঁর বার্তা— ‘‘এই যে ওড়নাটা আমার গায়ে জড়ানো, সেটিও পাঠিয়েছিল এক ভারতীয় বন্ধু।’’

কবিতাটি থেকে মিউজ়িক ভিডিয়ো তৈরি করার গল্পটাও শোনা গেল নীলমের কাছ থেকে। ‘‘আমার দুই বোন, আসমা আব্বাস ও বুশরা আনসারি নামকরা টিভি অভিনেত্রী। থাকে করাচিতে। ফেসবুকে আমার কবিতাপাঠ শুনে আমাকে ফোন করে বলল— ‘দিদি, করেছ কী! এই কবিতাটা আরও অনেক লোকের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।’ আসমা ও বুশরাই দু’জনে মিলে মিউজ়িক ভিডিয়োর নির্দেশক খুঁজে বার করল। প্রায় দেড় লক্ষ টাকা খরচ করে তৈরি হয় ভিডিয়ো। র‌্যাপ গান করে কবিতাটি গেয়েছে দুই বোন-ই। মাঝখানে জুড়ে দিয়েছে জনপ্রিয় দু’টি ছবির গান, একটা বলিউডের, আর একটা পাকিস্তানের।’’

ও-পার পঞ্জাবের ভালবাসার বার্তা নেটদুনিয়ায় ছড়িয়ে দিয়েছেন এ-পারের এক পঞ্জাবি কন্যা। তিন পাক শিল্পীর এই সৃষ্টিকে তিনিই ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। তিনি সনিকা ভরদ্বাজ। থাকেন লুধিয়ানায়। একটি তথ্যপ্রযুক্তি সংস্থা চালান। ফেসবুকে আসমার অফিশিয়াল ফ্যান পেজটিও চালান তিনি। ফোনে বললেন, ‘‘আমরা সাধারণ মানুষ। কেউই যুদ্ধ চাই না। নীলমজির লেখা কবিতা আমাদের কথাই বলে। অনেক সময়েই মনে হয়, এক ছুট্টে ও-পারে চলে যাই। কিন্তু পারি না। আমাদের সেই না-পারাটা, সেই দুঃখটাই দারুণ ভাবে তুলে ধরেছেন নীলম-আসমা-বুশরারা।’’

মিউজ়িক ভিডিয়োটির একদম শেষের দিকে দুই প্রতিবেশী কাঁটাতার পেরিয়ে পরস্পরের কাছে পৌঁছে যেতে চাইছেন, কিন্তু বুঝতে পারছেন, সেটা সম্ভব নয়। তখন তাঁরা নিজেদের ওড়না উড়িয়ে দিচ্ছেন। কাঁটাতারের প্রাচীর পেরিয়ে সেই ওড়না পৌঁছে যাচ্ছে প্রতিবেশীর আঙিনায়। নীলমের কথায়, ‘‘ভিডিয়োর এই অংশটি দেখে আমাকে ফোন করেছিল আমাদের বন্ধু, আমেরিকাবাসী এরাম সৈয়দ। ‘উইমেন স্ট্যান্ডিং ফর পিস’ নামে একটি সংস্থা চালায় সে। আমায় বলল, ঠিক এ-রকমই একটা ওড়না-বিনিময়ের পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। দু’দেশের অনুমতি পেলে ওয়াঘা-আট্টারি সীমান্তে এ মাসের ১৮ তারিখে দোপাট্টা বিনিময় করবেন দু’দেশের মেয়েরা।’’

এই আশায় যে, ওড়নার ওম গলিয়ে দেবে বিভেদের বরফ।