×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

১৪ জুন ২০২১ ই-পেপার

পরিবার থেকেও ছড়ায় কোলন ক্যানসার, মত চিকিৎসকদের

সোমা মুখোপাধ্যায়
কলকাতা ০৭ জুন ২০১৪ ০৩:০২
রহমত আলি। (ডান দিকে) আহমেদ আলি।  নিজস্ব চিত্র

রহমত আলি। (ডান দিকে) আহমেদ আলি। নিজস্ব চিত্র

শুধু কি স্তন ক্যানসার, যা পরিবারে কারও থাকলে অন্যদেরও হওয়ার আশঙ্কা থাকে? বিশেষজ্ঞেরা জানাচ্ছেন, মহিলাদের স্তন ক্যানসারের মতো পুরুষদের কোলন ক্যানসারেও এই একই ‘পারিবারিক’ ঝুঁকি রয়েছে। জিনবাহিত হয়ে যা ছড়িয়ে পড়তে পারে অন্যদের মধ্যেও। এরই উদাহরণ হিসেবে কলকাতার এক বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন দুই ভাইয়ের ‘কেস হিস্ট্রি’ এখন পৌঁছে গিয়েছে ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিক্যাল রিসার্চ-এর কাছে। চিকিৎসকেরা জানাচ্ছেন, এ ব্যাপারে সামান্য সচেতনতাই বাঁচিয়ে দিতে পারে অনেকগুলো প্রাণ।

দুই ভাই। রহমত আর আহমেদ আলি। এক জনের বয়স ২৮, অন্য জনের ৩০। কলকাতার ক্যানসার মানচিত্রে সচেতনতা বাড়ানোর কাজে আপাতত এই দুই ভাইকেই হাতিয়ার করেছেন শহরের কিছু চিকিৎসক। কোলন ক্যানসারে আক্রান্ত এই দুই ভাইয়ের কথা জানিয়েই তাঁরা প্রচার করছেন, খানিকটা সচেতনতা কী ভাবে গোড়াতেই এই রোগ নির্ণয় করতে সাহায্য করতে পারে।

বর্ধমানের হারানপুর গ্রামের রহমত ও আহমেদ পার্ক স্ট্রিটের এক বেসরকারি ক্যানসার হাসপাতালে ভর্তি। কোলন ক্যানসারে অস্ত্রোপচার করে আপাতত এঁরা নতুন জীবনের পথে। আর এঁদের জীবনের আখ্যানকেই এখন কোলন ক্যানসার ঠেকানোর হাতিয়ার করছেন এই শহরের কিছু ক্যানসার চিকিৎসক। পার্ক স্ট্রিটের ওই হাসপাতালের অধিকর্তা আশিস মুখোপাধ্যায় জানিয়েছেন, রহমত ও আহমেদের জেঠুর মৃত্যু হয়েছিল কোলন ক্যানসারে। পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছিল, তাঁর শরীরে যে বিশেষ জিন ছিল, তা রয়েছে দুই ভাইয়ের শরীরেও। আশিসবাবু বলেন, “ওঁরা দু’জন সচেতন ছিলেন বলে গোড়াতেই ওঁদের রোগটা ধরা পড়েছে। আমরা এখন বাকি চার ভাইয়েরও জিন পরীক্ষা করে দেখব। হয়তো তাঁদেরও কারও শরীরে ওই জিন থেকে যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বাড়তি সতর্কতা তাঁদের এই রোগ থেকে মুক্তির উপায় বাতলে দিতে পারে।”

Advertisement

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, মহিলাদের স্তন ক্যানসার, পুরুষের কোলন ক্যানসার এবং মহিলা-পুরুষ নির্বিশেষে চোখের ক্যানসার (রেটিনা ব্লাস্টোমা) জিনবাহিত হয়ে ছড়ায় বহু ক্ষেত্রেই। তবে কোলন ক্যানসার মূলত পুরুষদের হলেও মহিলাদের হয় না, তা নয়। মূলত তিন ধরনের জিন রয়েছে, যা কোলন ক্যানসারের জন্য দায়ী। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ওই জিন পজিটিভ হলে কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি বেড়ে যায়। কিন্তু কোলন ক্যানসারের এই চরিত্রটি নিয়ে এখনও পর্যন্ত তেমন কাজ হয়নি।

ক্যানসার শল্যচিকিৎসক গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেন, “কোলন এবং রেকটাল ক্যানসার একসঙ্গে যাকে কোলোরেকটাল ক্যানসার বলা হয়, সেটা একই পরিবারে অনেকেরই হয়ে থাকে। গোড়ায় ধরা পড়লে ভাল ফল পাওয়া যায়। জেনেটিক বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। তাই সতর্ক থাকাটাই সবচেয়ে জরুরি।”

ঠিক কী ধরনের সতর্কতা? আশিসবাবু বলেন, “নিয়মিত ফলোআপ, বয়স ৪০ পেরোলে এক বছর অন্তর কোলোনোস্কোপি এবং খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন জরুরি। ফাইবার যুক্ত খাবার বেশি খাওয়া দরকার। অতিরিক্ত প্রোটিন, বিশেষত রেড মিট খাওয়া বন্ধ করে দিতে হবে। ওই দুই ভাই নিয়মিত রেড মিট খেতেন। কোলন ক্যানসারের ঝুঁকি নিয়মিত রেড মিট খেলে অনেকটাই বেড়ে যায়।” ক্যানসার চিকিৎসক সুবীর গঙ্গোপাধ্যায় বলেন, “ইরিটেবল বাওয়েল হ্যাবিট’ অর্থাৎ কখনও কোষ্ঠকাঠিন্য, কখনও পেট খারাপ, পাশাপাশি মলের সঙ্গে রক্তপাত। এটাই হল মূল উপসর্গ। অনেকেই তাই অর্শের সঙ্গে উপসর্গ গুলিয়ে ফেলেন। ফলে রোগটা ধরা পড়তে অনেক দেরি হয়ে যায়।”

বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য, নির্দিষ্ট কিছু জিন থাকে যা থেকে কোলনে পলিপ হয়। পরে তা থেকেই ক্যানসার ছড়ানোর ভয় থাকে। যে পরিবারে কারও কোলন ক্যানসার রয়েছে, সেখানে বাকিদেরও এ ব্যাপারে খেয়াল রাখতে হবে। সে ক্ষেত্রে পলিপ হলে তা দ্রুত অস্ত্রোপচার করে নেওয়াই শ্রেয়।

অর্থাৎ এই ক্যানসারে শুধু রোগীর নয়, গোটা পরিবারের ফলোআপ চিকিৎসাটাই জরুরি। রহমত আর আহমেদের জীবনের গল্পের মাধ্যমে সেটাই জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা।



Tags:

Advertisement