×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৪ জুন ২০২১ ই-পেপার

বিকল্প চিকিৎসায় ভরসার ফাঁকে ছড়াচ্ছে ক্যানসার, মত সমীক্ষায়

সোমা মুখোপাধ্যায়
কলকাতা ২৪ ডিসেম্বর ২০১৪ ০২:২২

বিকল্প চিকিৎসায় অতিরিক্ত আস্থা কি বহু ক্ষেত্রে ক্যানসার রোগীদের দ্রুত অন্তিম পর্যায়ের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে? কলকাতার একটি বেসরকারি ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্র ১০ হাজারেরও বেশি ক্যানসার রোগীকে নিয়ে এ সম্পর্কে একটি সমীক্ষার আয়োজন করেছিল। সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে, যে রোগীরা আগে বেশ কিছু দিন বিকল্প পদ্ধতিতে চিকিৎসা করিয়ে তার পরে ক্যানসার চিকিৎসকদের কাছে আসছেন, তাঁদের অনেকেরই তত দিনে রোগটা তৃতীয় বা চতুর্থ পর্যায়ে চলে গিয়েছে। যাঁরা সরাসরি অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসা শুরু করেছেন, তাঁদের তুলনায় রোগ ছড়ানোর এই অনুপাত অনেকটাই বেশি। বিকল্প চিকিৎসার প্রতি অতিরিক্ত আস্থাই পূর্বাঞ্চলে ক্যানসার রোগের ভয়াবহ আকার নেওয়ার অন্যতম কারণ বলে সমীক্ষকদের দাবি। চলতি মাসের গোড়ায় অস্ট্রেলিয়ায় ওয়ার্ল্ড ক্যানসার কংগ্রেসেও এই সমীক্ষাটি পেশ করেছেন তাঁরা।

যদিও বিকল্প চিকিৎসকদের একটি অংশের পাল্টা অভিযোগ, অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসায় রোগীরা সর্বস্বান্ত্ব হচ্ছেন। অথচ তাতে কাজের কাজ কিছু হচ্ছে না। ফলে ওই চিকিৎসার প্রতি রোগীদের অনেকেরই আস্থা কমছে। খানিকটা বিপন্নতার বোধ থেকেই ক্যানসার চিকিৎসকেরা বিকল্প চিকিৎসার বিরুদ্ধে প্রচার শুরু করেছেন।

ক্যানসার সংক্রান্ত ওই সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, বিকল্প চিকিৎসা করিয়ে যাঁরা ক্যানসার চিকিৎসকের কাছে এসেছেন, এমন রোগীদের মধ্যে রোগের তৃতীয় পর্যায়ে রয়েছেন ৫০ শতাংশ, চতুর্থ পর্যায়ে রয়েছেন ৪০ শতাংশ এবং প্রথম ও দ্বিতীয় পর্যায়ে রয়েছেন মাত্র ১০ শতাংশ। অন্য দিকে, যাঁরা সরাসরি অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসকের কাছে এসেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রথম পর্যায়ের রোগী ২২ শতাংশ, দ্বিতীয় পর্যায়ের ১৮ শতাংশ, তৃতীয় পর্যায়ের ১২ এবং চতুর্থ পর্যায়ের ৪৮ শতাংশ।

Advertisement

টানা ১০ বছর ধরে এক বছর থেকে ৯১ বছর বয়সের ক্যানসার রোগীদের নিয়ে চলেছে ওই সমীক্ষা। যাঁদের উপরে সমীক্ষা চালানো হয়েছে, তাঁদের মধ্যে ৫৪ শতাংশ পুরুষ এবং ৪৬ শতাংশ মহিলা। পুরুষদের ফুসফুস, মুখ এবং কোলোন ক্যানসারের রোগীই বেশি। আর মহিলাদের বেশি স্তন, জরায়ু মুখ, গল ব্লাডার, ডিম্বাশয়ের ক্যানসার। এঁদের মধ্যে বিকল্প চিকিৎসা নিয়েছিলেন ৪২ শতাংশ রোগী। আর নেননি ৫৮ শতাংশ রোগী।

কী ধরনের বিকল্প চিকিৎসা? সমীক্ষকেরা জানাচ্ছেন, বিকল্প চিকিৎসার মধ্যে আয়ুর্বেদ ২৫ শতাংশ, হোমিওপ্যাথি ২২ শতাংশ, আকুপাংচার-সিদ্ধা-রেইকি ১৪ শতাংশ এবং অন্যান্য ৩৯ শতাংশ।

সমীক্ষক দলের অন্যতম সদস্য, ক্যানসার চিকিৎসক আশিস মুখোপাধ্যায় বলেন, “এই সমীক্ষার মাধ্যমেই স্পষ্ট হচ্ছে, বহু ক্ষেত্রেই বিকল্প চিকিৎসা করিয়ে অনেকটা সময় পেরিয়ে গিয়েছে। ফলে প্রথাগত চিকিৎসার জন্য এঁরা যখন ডাক্তারদের কাছে গিয়েছেন, তখন রোগ অনেকটাই ছড়িয়ে পড়েছে।

সংশ্লিষ্ট বিকল্প চিকিৎসা পদ্ধতিগুলির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের একটা বড় অংশেরই বক্তব্য, ক্যানসার রোগটাই দুরারোগ্য। তাঁরা কম খরচে রোগ সারানোর চেষ্টা করেন। আর অ্যালোপ্যাথি ধনেপ্রাণে মারে। তবে অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তাকে উড়িয়েও দেননি তাঁরা। আয়ুর্বেদ চিকিৎসক অমলকান্তি ভট্টার্চায বলেন, “আমরা আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রকে অস্বীকার করতে পারি না। আগে কেমোথেরাপি দিয়ে কোষ বিভাজনটা বন্ধ করতে হবে। তার পরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য আয়ুর্বেদের ব্যবহার শুরু করা যায়। যদি কোনও আয়ুর্বেদ চিকিৎসক দাবি করেন যে, শুধুমাত্র আয়ুর্বেদেই ক্যানসার সেরে যাবে, তা হলে সেটা মিথ্যাচার ছাড়া কিছু নয়।”

হোমিওপ্যাথি চিকিৎসক আদিত্য নারায়ণ সাহা বলেন, “শুধু হোমিওপ্যাথি কেন, কোনও চিকিৎসা পদ্ধতিতেই ক্যানসার সারানো সম্ভব নয়। অ্যালোপ্যাথি ডাক্তারের কাছে গেলে রোগীরা ধনেপ্রাণে মারা যান। হোমিওপ্যাথি বা আয়ুর্বেদে আর যা-ই হোক, সেটা হয় না।”

ক্যানসারের সোরিনাম থেরাপির চিকিৎসক অসীম চট্টোপাধ্যায় বলেন, “কেমো এবং রেডিওথেরাপি বা সার্জারিকে এক কথায় বাদ দেওয়া যাবে না। কিন্তু যৌথভাবে কাজ করা যায়। আসল দায়িত্ব হল রোগটা সারানো। ফুসফুস, লিভার, প্যাংক্রিয়াস, গল ব্লাডার, পাকস্থলীর ক্যানসারের ক্ষেত্রে তেমন কার্যকরী চিকিৎসা কিছুই নেই। তাই আমরা চেষ্টা করে দেখি। কিন্তু স্তন, জরায়ু মুখ, লিম্ফোমার ক্যানসারের ক্ষেত্রে চিকিৎসায় ভাল সাড়া পাওয়া যায়। সে ক্ষেত্রে অ্যালোপ্যাথি চিকিৎসকের কাছে দেখানো উচিত। তার পরে আমরা সহায়ক চিকিৎসার দায়িত্ব নিই।”

Advertisement