×

আনন্দবাজার পত্রিকা

Advertisement

২৬ জুলাই ২০২১ ই-পেপার

এসএমএসে খুলছে আউটডোর, ডাক্তারেরা আসেন দেরিতেই

সোমা মুখোপাধ্যায়
কলকাতা ২৫ নভেম্বর ২০১৪ ০২:৫২

স্বাস্থ্য দফতরের দায়িত্ব নিয়ে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম প্রতিশ্রুতি ছিল সরকারি হাসপাতালের আউটডোরকে বাগে আনা এবং ডাক্তারদের সময়ানুবর্তী করা। সেই কারণেই বছর দুই আগে চালু হয়েছিল ‘ওপিডি ট্র্যাকিং সিস্টেম’। আড়াই বছরের মাথায় দেখা যাচ্ছে, নিয়মকে স্রেফ কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ রেখে যথেচ্ছাচারের অভ্যাসে ফিরে গিয়েছেন অনেকেই। স্বাস্থ্য দফতরে এসএমএস করে সময়ে আউটডোর খোলার কথা জানানো হচ্ছে ঠিকই, কিন্তু ডাক্তারদের অনেকেই আসছেন বেশ দেরিতে। স্বাস্থ্যকর্তারা মানছেন, নিয়ম না মেনেও দিব্যি পার পেয়ে যাওয়ার ট্র্যাডিশনই এই বেপরোয়া মনোভাবের জন্য দায়ী।

স্বাস্থ্য দফতরের এক কর্তা বলেন, “শুধু আউটডোর নয়, এক-একটা কাজের দিনে ডাক্তাররা কতক্ষণ হাসপাতালে থাকছেন, সেটাও হিসেব করে দেখছি। সপ্তাহে ৪০ ঘণ্টা ডিউটি করার পরিবর্তে ১৬ থেকে ১৮ ঘণ্টা ডিউটি করেন অনেকেই। সেই তালিকার তথ্যগুলোও খতিয়ে দেখা হবে। ফাঁকিবাজ ডাক্তারদের নামের তালিকা তৈরি হবে এ বার।” কিন্তু সেই তালিকাই সার হবে, নাকি তালিকাভুক্ত ডাক্তারদের জন্য কোনও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে, সে ব্যাপারে স্পষ্ট সিদ্ধান্ত এখনও নেওয়া হয়নি।

হাসপাতালের আউটডোরগুলিকে বাগে আনতে ক্ষমতায় আসার কিছু দিনের মধ্যেই নজরদারি চালু করেছিল তৃণমূল সরকার। দেরি করে আউটডোর খোলা, ডাক্তারদের খেয়ালখুশিমতো হাসপাতালে আসা ঠেকাতে চালু হয়েছিল মোবাইল বার্তার ব্যবস্থা। কোন হাসপাতালে সকাল ক’টায় কতগুলি আউটডোর খুলছে, কত জন ডাক্তার আসছেন তা এসএমএস করে স্বাস্থ্য ভবনে জানানোর ব্যবস্থা চালু করা হয়। সরকারি রেকর্ডেই দেখা যাচ্ছে, জেলা তো বটেই, খাস কলকাতার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালগুলিতেও বহু ডাক্তার নির্দিষ্ট সময়ে হাজির হচ্ছেন না। নিয়ম ভাঙার এমন নজির হাতেনাতে পেয়েও তাঁদের কারও বিরুদ্ধে ন্যূনতম ব্যবস্থাও নেওয়া হয়নি। যে নিয়ম বছরের পর বছর না মেনেও পার পাওয়া যায়, সেই নিয়ম থাকার কী যৌক্তিকতা সেই প্রশ্ন তুলেছেন স্বাস্থ্যকর্তাদেরই একটা বড় অংশ।

Advertisement

সরকারি হাসপাতালে সকাল সাড়ে ন’টার মধ্যে সমস্ত আউটডোর পুরোদমে চালু হয়ে যাওয়ার কথা। হাজির হওয়ার কথা ডাক্তারদেরও। কিন্তু কোথাওই তা হয় না। ওপিডি ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় হাসপাতালের তরফে এসএমএস করে স্বাস্থ্য দফতরকে জানাতে হয় প্রতিদিন কখন আউটডোর খুলছে, কত জন ডাক্তার সময়ে হাজিরা দিচ্ছেন। সরকারি রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যাচ্ছে, সাড়ে ন’টার মধ্যে প্রায় সমস্ত আউটডোরই খুলে যাওয়ার এসএমএস আসছে। কিন্তু ডাক্তারদের হাজিরা অনেকটাই কম।

যেমন অক্টোবর মাসে আরজিকরে ১৫৯ জন ডাক্তার দেরিতে এসেছেন। নীলরতন সরকার মেডিক্যাল কলেজে ২৩৮ জন, বিধানচন্দ্র রায় শিশু হাসপাতালে ৪৮ জন আর এসএসকেএমে ৯৬ জন। নভেম্বরের প্রথম দু’সপ্তাহে আরজি করে ১১৮ জন, নীলরতন সরকারে ১৪৩ জন, বি সি রায়-এ ২০ জন এবং এসএসকেএমে ৬২ জন দেরিতে এসেছেন।

স্বাস্থ্য দফতরের এক শীর্ষ কর্তা বলেন, “এটা তো সাম্প্রতিক তথ্য। আর এই চারটি হাসপাতাল তো নমুনা মাত্র। এর আগেও সর্বত্রই ডাক্তারদের হাজিরার ক্ষেত্রে এমন গড়িমসির ছবি ফুটে উঠেছে।”

কী ব্যবস্থা নিয়েছেন তাঁরা? ওই শীর্ষকর্তার স্বীকারোক্তি, “কিছুই নেওয়া হয়নি। বহাল তবিয়তে দেরিতে আসার ট্র্যাডিশন চালিয়ে যাচ্ছেন ওই ডাক্তারেরা। ব্যবস্থা নেওয়া হয় না বলে তাঁদের ভয়ডরও নেই। তাঁরা জানেন, যা খুশি করে পার পেয়ে যাবেন।”

আউটডোর সব জায়গায় ঠিক সময়ে খোলার ব্যাপারে যে তথ্য স্বাস্থ্যকর্তাদের কাছে পৌঁছয়, তা ঠিক কি না যাচাইয়ের বন্দোবস্তও হয়নি। গোড়ায় বলা হয়, এ নিয়ে নজরদারির জন্য একটি দল গড়া হবে। তাঁরা সকালে আচমকা এক-একটি হাসপাতালে হানা দেবেন। এসএমএসের তথ্য আর বাস্তব ছবিটা এক কি না, তা যাচাই করবেন হাতেনাতে। গোড়ায় দু’তিন মাস এমন চলার পরে সেটাও বন্ধ হয়েছে।

অতএব সেই বজ্র আঁটুনি ফস্কা গেরোর প্রবাদের পুনরাবৃত্তি!

Advertisement