গান-বাজনার ব্যাপারে মান্নাদার কোনও ছুতমার্গ ছিল না। ‘রিয়েলিটি শো’ মানেই যে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যের বিষয় মান্নাদা এমনটি কখনও ভাবেননি। সব কিছুর মধ্যে তিনি পজিটিভ দিকটা বেশি করে খুঁজতেন। তবে মান্নাদা নিজে বিচারক থাকতে চাইতেন না। একবার মজা করে বলেছিলেন, ‘বিচারকদের যদি কোনও রিয়েলিটি শো হয়, তবে আমি বিচারক থাকতে পারি’। অনেক আগে একটা শো হয়েছিল ‘মেরি আওয়াজ শুনো’—ফাইনাল বিচারক ছিলেন মান্নাদা, লতাজি। পরে মান্নাদা বলেছিলেন, ‘ওই বাচ্চা মেয়েটা (সুনিধি চৌহান) কি গানটাই না গায়! ভাবা যায় না। এ রকম একটা প্ল্যাটফর্ম না থাকলে আমরা তো ওর কথা জানতেই পারতাম না।’ এ প্রসঙ্গে আর একটা ঘটনা মনে পড়ে গেল। কেরলের একটা কলেজে গানের প্রতিযোগিতা। বিচারক মান্নাদা। আরও একজন বিচারক ছিলেন। মূলত পরিচালক এবং অভিনেতা। অসাধারণ সাংগীতিক বোধে তাঁর ছবিতে বহু যুগোত্তীর্ণ গান উপহার দিয়েছেন। দেবানন্দ। একটি ছেলের গান দেবানন্দের খুব ভাল লাগল। মান্নাদাকে বললেন, কী দারুণ গায় ছেলেটা। মান্নাদার কানটা তো আরও তৈরি। বললেন, ‘নিশ্চয় খুব ভাল গায় ছেলেটা। আর একটু টিউনিং দরকার।’ দেবানন্দ বললেন, ‘সে জন্য তো আপনি আছেন’। অবধারিত ভাবে সে প্রথম হল। পরবর্তী কালে সেই ছেলেটি এক কিংবদন্তী গায়কে পরিণত হয়। দক্ষ জহুরির বিচারে প্রথম হওয়া সেই ছেলেটির নাম হরিহরণ। মান্নাদা তাকে কিছু পরামর্শও দিলেন। মান্নাদার পারফেকসনিস্ট মন সব সময় বলত—‘ভাবো, ভাবো, দ্যাখো আরও ভাল করা যায় কিনা।’ আর ভাবতেন আরও কী ভাবে ইম্প্রোভাইজড করা যায়। সমসাময়িকতাকেও ভীষণ ভাবে গুরুত্ব দিতেন মান্নদা।

রবীন্দ্রনাথের কিছু গান মান্নাদা হিন্দিতে গাইবেন। যন্ত্র-সঙ্গীত আয়োজনের দায়িত্ব দিলেন ‘ভায়োলিন ব্রাদার্স’কে। দেবশংকর রায়-জ্যোতিশংকর রায়। আউল-বাউল নামে বেশি পরিচিত। এই কাজের সময়ও একটা আধুনিকমনস্ক মান্না দে-র পরিচয় পাওয়া যায়। বাঁশীতে কে থাকছে? উদয়। সেতার? রাহুল। তবলা? তবলা কে বাজাবে? আউল-বাউল বলল, ‘রবীন্দ্রসঙ্গীতে তবলার উত্তমকুমার বিপ্লব মণ্ডল’। মান্নাদা বললেন, দ্যাখো রবীন্দ্রসঙ্গীত মানে যেন টিপিক্যাল রিদিম না হয়—ওই শুধু ‘ধাধিন ধিন না, ধা ধিন ধিন না’ আমার ভাল লাগে না। রিদিম নিয়ে একটু ভাবনা চিন্তা কোরো।’ দমদমে এইচএমভি-তে রেকর্ডিং। মান্নাদার সাজেশন, শুধু তবলা ন্যাড়া ন্যাড়া লাগছে। একটু ডাফ, পারকার্সনের নতুন প্যাটার্নের সঙ্গে জুড়ে দ্যাখো তো কেমন লাগে। সত্যিই তো একটু নতুন ভাবে ভেবে ব্যাকরণ ঠিক রেখে একটা চেনা গানকেও কত ইম্প্রোভাইজড করা যায়। গানগুলো হিন্দিতে অনুবাদ করা হয়েছে— সুরের মিটারে হিন্দি কথা মিলিয়ে। রবীন্দ্রসঙ্গীত তো মান্নাদার প্রাণের গান। হিন্দিতে গাইছেন কিন্তু মান্নাদার মন ভরছে না। এ বার হঠাৎ কী মনে হল, মান্নাদা বাংলাতে গানটি গাইতে লাগলেন—এই তো শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে ভরে যাচ্ছে — সুরের ভিতরে আসছে কাঙ্ক্ষিত অভিব্যক্তি। মান্নাদা বললেন, রবীন্দ্রনাথের অতুলনীয় শব্দ চয়ন, কথা-সুরে মিলে-মিশে যাওয়া—অন্য ভাষায় তার কি যথাযথ অনুবাদ করা সম্ভব? হয় না হয় না। তবু অসাধারণ প্রফেশনাল মানসিকতায় সর্ব ভারতীয় শ্রোতাদের কথা মাথায় রেখে মান্নাদা গাইলেন হিন্দিতে রবীন্দ্রসঙ্গীত। প্রতিবন্ধকতা ছিল—ভাষার। কিন্তু গায়কটির নাম মান্না দে। তাঁর কণ্ঠ-স্পর্শে সব কটি গানই খুবই শ্রুতি-মধুর হল। মান্নাদা রবীন্দ্রনাথের গানকে পৌঁছে দিলেন সারা ভারতবর্ষে।

মান্না দের কণ্ঠে তারুণ্য কম ছিল—একসময় লতাজি বলেছিলেন। একজন শিল্পীকে যখন নানা দিক থেকে বিচার করা হয়, তখন প্রসঙ্গক্রমে কিছু প্রসঙ্গ আসে। লতাজি নিজেই বলেছেন, মান্নাদা সব ধরনের কম্পোজিশন দক্ষতার সঙ্গে গাইতে পারেন। আলাদা ভাবে কণ্ঠ নিয়ে আলোচনারই বা প্রয়োজন কি? অনেকে বলেন, ঈশ্বর মান্নাদাকে ভারী কণ্ঠ দেননি। ভারী কণ্ঠের শিল্পীদের গায়কীর একটা সুবিধা তো থাকে—যেমন ফ্রাঙ্কি ভন, জিম রিভস, দেবব্রত বিশ্বাস, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়—অথবা মেহেদি হাসান। মান্নাদা নিজেও অনেক সময় বলেছেন, ‘ঈশ্বর তো আমাকে হেমন্তবাবুর মতো কণ্ঠ দেননি। এই জন্য আমাকে একটু অন্যরকম ভাবে গাইতে হয়।’ এই প্রসঙ্গে একটা ঘটনার কথা বলি। তরুণ মজুমদারের ‘গণদেবতা’র ছবির রেকর্ডিং চলছে। সুরকার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। শিল্পী মান্না দে। মান্নাবাবু গাইতে গাইতে একসময় বললেন, ‘বুঝলেন হেমন্তবাবু, আপনি সামনে থাকলে আমার গাইতে একটু অসুবিধাই হয়।’ হয়তো কথাটা একটু মজা করেই বলেছিলেন। কিন্তু সে কথার মধ্যে শ্রদ্ধাবোধ ছিল একশো শতাংশ। এমন হয়েছিল ‘স্ত্রী’ ছবির রেকর্ডিংয়ের সময়েও। উত্তমকুমারের লিপে গাইছেন মান্না দে। সৌমিত্রের লিপে হেমন্তবাবু। সুরকার নচিকেতা ঘোষ। গান লিখেছেন গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার, পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়। এ রকম সম্মিলন বাংলা ছবিতে খুব কমই হয়েছে। সে দিন মান্নাদা এবং হেমন্তবাবু দু’জনেরই রেকর্ডিং। হেমন্তবাবু গাইছেন। গম গম করছে কণ্ঠ—‘খিড়কি থেকে সিংহদুয়ার’। মান্নাদা অস্ফুটে শ্রদ্ধা মিশ্রিত গলায় বললেন— ‘এই গানের পরে আমি আর কি গাইব’। সত্যি এমনই পরস্পরের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ নিয়েই তৈরি হয়েছে সঙ্গীতের দুটি অনড় স্তম্ভ। মান্নাদার কণ্ঠ নিয়ে বলছিলাম। এ প্রসঙ্গে শেষ কথা বোধহয় বলেছিলেন বেগম আখতার—‘গানা গলে সে বলতি হ্যায় থোরি’।

শিল্পীর প্রতি শিল্পীর শ্রদ্ধা। মিলে-মিশে কাজ। একটা গানকে কে কতটা গাইছেন সে হিসেব কেউ কোনও দিন করেননি। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় তখন বাংলা সিনেমার মহাগায়িকা। বিশেষ করে সুচিত্রা সেনের লিপে তাঁর গান—মানেই মুখে মুখে ফিরবে। অথচ হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ‘সপ্তপদী’ ছবিতে ‘এই পথ যদি না শেষ হয়’ গানে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়কে ব্যবহার করলেন শুধুমাত্র হামিং-এর জন্য আর এর একটা সংলাপ ‘না, না, তুমিই বলো’। সন্ধ্যাদি খুশি মনেই সেই কাজটুকু করলেন। হেমন্তবাবুর দূরদর্শিতা ভাবুন। সে গান আজও সবাই সমান ভাললাগায় শুনছে। দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়কে সলিল চৌধুরী মুম্বই নিয়ে গেলেন হিন্দি গান গওয়াতে। দ্বিজেনবাবু তখন মুম্বইতে একেবারে অচেনা। আর লতা মঙ্গেশকর তখন কিংবদন্তী। পরিচালক-সুরকাররা লতাজির জন্য যেকোনও মূল্য দিতে রাজি। মূল্য মানে শুধু আর্থিক ব্যাপারটাই বলছি না। ভাবতে পারেন, সলিল চৌধুরী গানটি গাওয়ালেন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়কে দিয়ে। লতাজি সানন্দে রাজি হলেন সেই গানে শুধু হামিং দিতে।

এ প্রসঙ্গে মান্নাদার কথা তো আসবেই। হৃষিকেশ মুখোপাধ্যায়ের ‘বাবুর্চি’ ছবিতে সুকরকার মদনমোহন বিলাওল আশ্রয়ে একটি অসাধারণ গান বেঁধেছেন ‘ভোর আয়ি গয়ি আন্ধিয়ারা’। দুর্দান্ত লিখেছেন কায়ফি আজমি। গানটি চিত্রায়িত হচ্ছে একটি ড্রামাটিক পারিবারিক দৃশ্যে। মূল গায়ক মান্নাদা। সঙ্গে লক্ষ্মীশংকর, নির্মলাদেবী, হারীন্দ্রনাথ চট্টোপাধ্যায়। সহশিল্পী ছিলেন আরও একজন গায়ক, মূল শিল্পী নয়, কেবল মাত্র মূল শিল্পী মান্নাদার সঙ্গে গাইছেন। তিনি তখন হিন্দি গানের সম্রাট। কিশোরকুমার। গাইছেন তো মান্না দে। তাঁর সঙ্গে যদি এক লাইনও গাওয়া যায়, সে তো ভাগ্যের ব্যাপার।