Manna Dey respected Uttam Kumar - Anandabazar
  • manna dey
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

উত্তমকুমারকে খুব শ্রদ্ধা করতেন মান্না দা

লিখছেন দেবপ্রসাদ চক্রবর্তী।

manna dey
—ফাইল চিত্র।
  • manna dey

Advertisement

‘হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গলা খুব ভাল ছিল, কিন্তু গাইতে পারতেন না।’ কে বলেছেন এ কথা? স্বয়ং মান্না দে। মান্না দে-র ইন্টারভিউ ছাপা হয়েছে কলকাতার এক নামী পত্রিকায়। বহু লোকে পড়লেন, যারা পড়েননি, তাঁরা অন্যের মুখে শুনলেন। মান্না দে-র মতো হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ও অত্যন্ত প্রাণের গায়ক, বিশেষ করে বাঙালিদের কাছে। মান্না দা-র এমন মন্তব্যে সকলেই দুঃখ পেলেন। কথাটা মান্না দা-র কানে গেল। শুনে তিনি তো আকাশ থেকে পড়লেন। লেখাটার এমন হেডিং করেছে? মান্নাদা একদম সরাসরি ফোন করলেন সেই পত্রিকা গোষ্ঠীর মালিককে। হেমন্তবাবুকে গায়ক হিসেবে এত শ্রদ্ধা করি, আর কি না আমার মুখ দিয়ে এমন কথা বলানো হল? এ নিয়ে মান্নাদা পরে অনেক দুঃখ করেছেন। কথায় কথায় অনেক সময় অনেক কথা হয়। আগের-পরের কথা বাদ দিয়ে হঠাৎ একটা কথাকে হাইলাইট করলে বক্তার বক্তব্য সম্পূর্ণ বোঝা যায় না। মান্নাদা-র ক্ষেত্রে বিষয়টা একটু অন্য রকম ছিল। মেলামেশার ব্যাপারে তিনি ছিলেন অত্যন্ত ‘চুজি’। সাক্ষাৎকারের বিষয়েও মান্নাদার একটা ‘পছন্দ’ ছিল। আবার বেশ কিছু সাংবাদিক ছিলেন মান্নাদার অত্যন্ত প্রিয়। শুধু গান-বাজনা, খেলাধুলা নয়, মান্নাদা অনেকের সঙ্গে কত ব্যক্তিগত বিষয়ও ‘শেয়ার’ করতেন। আবার তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার এমন এমন গল্প বলেছেন, যা অন্য কেউ শুনলে চমকে যাবে। কিন্তু মান্নাদার বন্ধুস্থানীয় সাংবাদিকরা কখনও সেই সব ঘটনা কাগজে ছেপে মান্নাদাকে বিব্রত করেননি। এই প্রসঙ্গে আমি একটা ঘটনার কথা পুনরুল্লেখ করছি। একবার কিশোরকুমার নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। মান্নাদা বললেন, ‘মুম্বাইয়ের সিংগিং স্টাইল একটু অন্য রকম ছিল। আমার-রফি-তালাতের গানের মধ্যে, গায়কির মধ্যে ‘হরকত’ থাকত। সেটি অনেক শিক্ষা ও ফিলিংস দিয়ে আরম্ভ করতে হয়। কিশোর ও সব ‘হরকত’-এর ধার ধারেনি। স্ট্রেট গাইত। সোজা-সাপ্টা। হিন্দি গান থেকে ‘হরকত’ ব্যাপারটা অনেকটাই হারিয়ে গেল—বেশির ভাগ গান তো কিশোরই গাইত।’ এখন কেউ যদি মান্নাদাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে তার লেখার হেডিং করতেন ‘মান্না দে বললেন—কিশোরের গলায় হরকত ছিল না, সোজাসাপ্টা গাইত।’ সেটা কি মান্নাদার প্রতি সুবিচার হত? কিশোর কুমার সম্পর্কে সেই আলোচনায় মান্নাদা তার পরে কী বলেছিলেন? ‘বুঝলেন, কিশোরের মতো ট্যালেন্ট আর হবে না। ও সব কিছু শিখেই জন্মেছিল। আশ্চর্যের ব্যাপার, ওকে কোনও দিন বেসুরো গাইতে শুনিনি। আমি আর কিশোর রেকর্ড করব। আমি কত রিহার্সাল করছি, হোম-ওয়ার্ক করছি। কিশোরকে কেউ ধরতে পারছে না। সবাই চিন্তিত। এ তো আর যেমন-তেমন গান নয়। কী হবে? রেকর্ডিংয়ের দিন কিশোর এল, এমনই ইম্প্রোভাইজ করে গাইল, আমি থ’ হয়ে গেলাম। আমি কেন, সবাই। এ শুধু ওর পক্ষেই সম্ভব।’

মান্নাদার ওই পার্টিকুলার ইন্টারভিউতে কী হয়েছিল। আসলে মান্নাদা যখন ‘আড্ডা’ দেন তখন তো একদম ফরমাল থাকেন না। মন খুলে ‘গল্প’ করেন। অসম্ভব স্মৃতি-শক্তি। ৫০-৬০ বছরের আগের ঘটনা এমন ভাবে বলেন মনে হয় এই তো সে দিনের ঘটনা। তেমন করে উঠল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কথা। মান্নাদা সব সময়ই বলতেন হেমন্তর কণ্ঠ ঈশ্বর-প্রদত্ত। সে দিনও বললেন সে কথা। ‘গাইতে পারত না’ বলতে মান্নাদা বলতে চেয়েছিলেন সব ধরনের গানের কথা। হেমন্তবাবু কখনও ‘লাগা চুনারি মে দাগ’ গাইতেন না। এটি তো সত্যি কথা। যিনি ইন্টারভিউ করেছিলেন, ওই প্রথম লাইনটি শুনে তিনি ভাবলেন একটা অভাবিত ‘কোট’ পাওয়া গেছে, তাও আবার মান্না দে-র মুখ থেকে। তার কাছে ব্যক্তিগত আবেগের চেয়ে সাংবাদিকতার প্রফেশনালিজমই বেশি কাজ করল। মান্নাদা হেমন্তবাবুর গান নিয়ে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। যেমন কিশোরকুমার সম্পর্কে বলেছিলেন। কিন্তু সেই সাংবাদিক করলেন কি মান্নাদাকে অন্য কোনও কথা বলার সুযোগ না দিয়েই প্রশ্ন করলেন— ‘আচ্ছা মান্নাদা আপনি ড্রিংক করেন?’ হেমন্তবাবুর  গান সম্পর্কে আলোচনার সঙ্গে এ প্রশ্ন যায় না। কথা চলে গেল অন্য দিকে। মান্নাদা হেমন্তবাবুর প্রসঙ্গে আর কিছু বলার সুযোগ পেলেন না। তিনি কল্পনাই করতে পারেননি যে এই অসম্পূর্ণ লাইনটিই তার ইন্টারভিউর হেডিং হবে।

অনেকটা একই রকম ঘটনা ঘটেছিল উত্তমকুমারের ক্ষেত্রে। মান্নাদা কলকাতায় এসেছেন। তাঁর খুবই স্নেহভাজন একজনের বাড়িতে ডিনারের নিমন্ত্রণ। তখন আইপিএল চলছে। সে দিন আবার নাইট রাইডার্সের খেলা। টিভিতে খেলা দেখা, সঙ্গে ডিনার এবং আড্ডা। এমনই প্রোগ্রাম ছিল। একেবারেই ঘরোয়া ব্যাপার। মান্নাদাকে তো কলকাতায় খুবই কম পাওয়া যায়। গৃহকর্তাকে অনেক কষ্টে রাজি করিয়ে সেই সাংবাদিক ভদ্রলোক চলে গেলেন সেখানে। মান্নাদা তাকে বেশ পছন্দ করতেন। ফলে অখুশি হলেন না। খানিকক্ষণ মন খুলে গল্প-গুজব চলল। এল উত্তমকুমারের প্রসঙ্গ। অভিনেতা হিসেবে উত্তমকুমারকে অসম্ভব শ্রদ্ধা করতেন। বলতেন এমন ডেডিকেশন দেখা যায় না। মান্নাদার গানের টেপ নিয়ে উত্তমকুমার ঘুরছেন, বারবার শুনছেন। কঠিন গান, ভাল ভাবে আত্মস্থ করতে না পারলে ঠিক মতো লিপ দেবেন কি করে। মান্নাদা একদিন উত্তমকুমারকে আবিষ্কার করলেন মুম্বইয়ের রাস্তায় টেপরেকর্ডার-সহ। দেখে এবং শুনে চমৎকৃত হয়েছেন। অকুণ্ঠ ভাবে উত্তমকুমার এই ইনভলভমেন্টের কথা সবাইকে বলতেন। এখন ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দের একটা ব্যাপার থাকে। মান্না দে-র পছন্দের মানুষ ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সৌমিত্রবাবুর ইনটেলেকচুয়ালিটি তার খুব পছন্দের ছিল। বলতেন, একাধারে কবি, নাট্যকার, অগাধ পাণ্ডিত্য, শিক্ষিত মানুষদের সঙ্গে মেলামেশা করতেন। ওর সঙ্গে কথা বলতে খুব ভাল লাগে। সৌমিত্রবাবুর চাল-চলন, সব কিছুতেই একটা শিক্ষার ছাপ রয়েছে। ব্যক্তিগত ভাবে উত্তমকুমারের সাঙ্গোপাঙ্গ, নিত্য দিনের সান্ধ্য মজলিস মান্নাদার পছন্দ ছিল না। এ ক্ষেত্রে সৌমিত্রবাবুর ‘খুঁত’ মান্নাদা পাননি। সে দিন এই সব হাল্কা আলোচনা চলছিল। কোনও ইন্টারভিউ নয়। মান্নাদা মন খুলে গল্প করছেন। বোমা ফাটল তার পরে। মান্নাদার সেই কথোপকথন নিয়ে একটা ‘স্টোরি’ ছাপা হল। লেখার হেডিং এবং বিষয় এমন করে লেখা হল, মনে হল মান্নাদা বলছেন উত্তমকুমারের শিক্ষা-দীক্ষা বিশেষ ছিল না। এতে খুব হইচই হল। জেনে, শুনে মান্নাদা খুব ব্যথিত হলেন। জানি না এই সব কারণে কিনা কলকাতায় মান্নাদা তাঁর বন্ধুর সংখ্যা অত্যন্ত সীমিত রেখেছিলেন। আড্ডা হোক, ইন্টারভিউ হোক, মান্নাদা তো কখনও মেপে-জুপে কথা বলতেন না। তাঁর বিশ্বাস ছিল সাংবাদিকরা ঠিক বুঝে নেবেন কোনটা লেখার জন্য, আর কোনটা শুধু শোনার জন্য। অনেক সাংবাদিক মান্নাদার সেই মনটাকে বুঝতেন। এ জন্য দেখবেন কলকাতায় যে মুষ্টিমেয় মানুষকে তাঁর কাছে ‘অ্যালাউ’ করতেন, তার একটা বড় অংশই ছিল মান্নাদার প্রিয় সাংবাদিকেরা।

মান্নাদার সহজ সরল খোলা মনের একটা ঘটনা বলি। যে কোনও কারণে কলকাতায় এলে মান্নাদা উঠতেন মদন ঘোষ লেনের বাড়িতে। খুব সামান্য ক্ষেত্রে হোটেলে থাকতেন। সে বার সঙ্গে ম্যাডামও এসেছেন। মান্নাদা আছেন ধর্মতলায় পিয়ারলেস-ইন-এ। মান্নাদার পরিচিত এক ভদ্রলোকের মেয়ের পাঁচ বছরের জন্মদিন। অনুষ্ঠান হচ্ছে পিয়ারলেস-ইনেরই ব্যাংকোয়েট হলে। অনুষ্ঠানে মান্নাদাও নিমন্ত্রিত। যেমনটি ঘটার তেমনই ঘটছে। মান্নাদাকে ঘিরে সব সময় জটলা। মান্নাদাকে সামনে থেকে দেখার সুযোগ কে আর ছাড়ে। মান্নাদা সবার সঙ্গে হাসিমুখে কথা বলছেন, যে চাইছে অটোগ্রাফ দিচ্ছেন, ছবি তুলতেও আপত্তি করছেন না। এমন সময় ফুটফুটে একটা বাচ্চাকে দেখে মান্নাদা তাকে কাছে ডাকলেন। বাচ্চাদের ভীষণ ভালবাসতেন। কিন্তু তাঁর এমনই দুর্ভাগ্য যে দু’ মেয়ের কারও বাচ্চাই হল না। মান্নাদার আর দাদু হয়ে ওঠা হয়নি। বাচ্চাটির সঙ্গে ওর মা-ও এল। টেকনো ইন্ডিয়ার মিঠু ভট্টাচার্য। মান্নাদাকে প্রণাম করল। স্বপ্নের গায়ক। মান্নাদা বাচ্চাটাকে আদর করতে করতে তার নাম জিজ্ঞাসা করলেন। ও নাম বলল— সোহিনী। মান্নাদা খুব খুশি হয়ে বললেন ‘এমন সুন্দর নাম  কে রেখেছে তোমার?’ সোহিনী মিঠুর দিকে আঙুল তুলে দেখাল। মান্নাদা বললেন, ‘সোহিনী একটা রাগের নাম। খুব সুন্দর রাগ। তোমাকে শোনাই।’ মান্নাদা সোহিনী গাইতে থাকলেন। মুগ্ধ হয়ে শুনছে উপস্থিত অতিথিরা। এক স্বর্গীয় পরিবেশ। এ তো শুধু গান। যে কোনও পরিবেশই গান তার মতো করে নেয়। যেমন করতেন মান্নাদা।

এমন এক সাঙ্গীতিক ব্যক্তিত্ব ছিল বলেই প্রত্যেকেই মুখিয়ে থাকতেন মান্নাদার সঙ্গে কাজ করার জন্য। মান্নাদা এবং রাধাকান্ত নন্দী— সঙ্গীতে এমন যুগলবন্দি বিরল। তখন রাধুবাবুর লাং ক্যানসার ধরা পড়েছে। খুবই অসুস্থ। ভর্তি করা হল বেলভিউ নার্সিংহোমে। যখন ছাড়া পেলেন শরীর খুবই দুর্বল। ডাক্তাররা বারবার বলেছেন অন্তত কিছু দিন পুরোপুরি বিশ্রাম নিতে। দু’এক দিনের মধ্যেই মান্নাদার অনুষ্ঠান। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এবং অপর্ণা সেন অ্যাংকরিং করছেন। পয়লা বৈশাখের  অনুষ্ঠান। রাধুবাবু বাজাবেন। সবাই নিষেধ করছে। শরীর এমনই অসুস্থ। রাধুবাবু একগাল হেসে বললেন—‘শরীরের কথা ছাইড়া দ্যান, বছরের প্রথম দিনই যদি মান্নাদার সঙ্গে বাজাইতে না পারি, তাহলে সারা বছর তো বাজাইতে পারুম না।’

সবাই যা পড়ছেন

Advertisement

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন
বাছাই খবর

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন