অসমের রাজনৈতিক, সামাজিক, ব্যক্তি ও পারিবারিক জীবনে বর্তমানে একটিই ‘ইস্যু’—এনআরসি। পথে-ঘাটে, হাটে-বাজারে, গ্রামে-নগরে শুধু এনআরসি নিয়ে হয়রানির কথা। অর্থাত্ জাতীয় নাগরিক পঞ্জি নবায়ন প্রক্রিয়া শুরু হওয়ার পরই রাজ্যের বিপুল সংখ্যক নাগরিক ভয়ঙ্কর সমস্যায় পড়েছেন। এই ‘ইস্যু’ নিয়ে বিস্তর রাজনীতি চলছে। সুবিধা অনুযায়ী নানা ব্যাখ্যাও পক্ষে-বিপক্ষে উঠছে। কিন্তু লক্ষ লক্ষ বিপন্ন মানুষের এই সমস্যা সমাধানে সদর্থক পদক্ষেপ তেমন হচ্ছে না।

কেন এই এনআরসি?

স্বাধীনতা লাভের পরই মুখ্যমন্ত্রী গোপীনাথ বরদলৈ বিধানসভায় বলেন, অসম শুধুমাত্র অসমিয়াদের জন্য (আসাম ফর আসামিজ ওনলি)। এই ঘোষণায় স্বয়ং জাতির জনক মহাত্মা গাঁধী আঁতকে উঠে বলেছিলেন, ‘‘ইফ আসাম ফর আসামিজ, দেন ইন্ডিয়া ফর হুম?’’ অর্থাত্ বরদলৈয়ের মনোভাবকে গাঁধীজি নাকচ করে দেন। কিন্তু তখন থেকে যে ‘নীল নক্‌শা’ প্রস্তুত করা হয়, তারই পূর্ণাঙ্গ রূপ বিভিন্ন পর্যায় পার হয়ে বর্তমানে নাগরিক পঞ্জি নবায়নে এসে দাঁড়িয়েছে। এর মাধ্যমে ভাষিক সংখ্যালঘুদের নাগরিকত্ব হরণের অপচেষ্টা আরও তীব্র হয়েছে।

পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় গোয়ালপাড়া জেলায় রাতারাতি প্রায় ২৫০ বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়কে অসমিয়া মাধ্যমে রূপান্তর, ষাট সালের ‘বঙাল খেদা’, ৭৮-৭৯ সালে বহিরাগত বিতাড়ন এবং এর পর ‘বিদেশি খেদা’-র পরিণতি ১৯৮৫ সালের ১৪ অগস্টের অসম চুক্তি। অসম চুক্তির আধারে ১৯৫৫ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধন। ১৯৫৫ সালের আইনে প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভারতীয় মূলের নাগরিকদের যে সুযোগ-সুবিধা ছিল, তা অসমের ক্ষেত্রে রদ করা হয়। অসম চুক্তি রূপায়ণ রাজনৈতিক কারণেই গত ২৯ বছর ধরে সম্ভব হয়নি। ২০১১ সালের লোকগণনায় ভাষাগত প্রতিবেদন (যা এখনও প্রকাশ করা হয়নি) অসমিয়া বর্ণহিন্দুদের আতঙ্কিত করে তুলেছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে। তাই অসম চুক্তি রূপায়ণে তোড়জোড় শুরু হয়েছে। এক দিকে ‘অসমিয়া’-র সংজ্ঞা নির্ধারণ, অন্য দিকে ১৯৫১ সালের জাতীয় নাগরিক পঞ্জি নবায়ন প্রক্রিয়াকে গতিশীল করা হয় সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশে। অসমিয়াদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা বজায় রাখার নানা প্রবণতা আজ সমগ্র রাজ্যকে এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

পঞ্জি নবায়নের ‘মডালিটি’ প্রস্তুতের সময় শুধু মাত্র ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার জাতীয়তাবাদী সংগঠনের মতামত অনুযায়ী মন্ত্রিসভার উপ-সমিতি তা চূড়ান্ত করে। এর পর পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভা তা অনুমোদন করে কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে পাঠিয়ে দেয়। এই মডালিটি প্রণয়নে বরাক উপত্যকার মতামত নেওয়া হয়নি। তেমনই ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার ভাষিক সংখ্যালঘুদেরও উপেক্ষা করা হয়। রাজ্য মন্ত্রিসভার প্রস্তাবই মনমোহন সিংহের মন্ত্রিসভা সর্বোচ্চ আদালতে প্রেরণ করে। নাগরিক পঞ্জি নবায়নের ক্ষেত্রে নির্ধারিত ফর্ম ও শর্তাবলি এতই জটিল যে বিপুল সংখ্যক মানুষই গভীর সঙ্কটে পড়েছেন। তা ছাড়া ঘোষিত সময়ের প্রায় দেড় মাস পর ফর্ম বিতরণ শুরু করা হয়। অথচ জমা দেওয়ার নির্দিষ্ট তারিখ, ৩১ জুলাই, কিন্তু অপরিবর্তিতই রয়েছে।

পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, ১৫ জুলাই পর্যন্ত মাত্র ১৬ শতাংশ আবেদন পত্র জমা পড়েছে। তাই বিভিন্ন মহল থেকে আবেদন পত্র জমা দেওয়ার তারিখ বর্ধিত করার দাবি উঠেছে। দাবি উঠেছে, আবেদন পত্র-সহ শর্তাবলি সরলীকরণের। পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে রাজ্য সরকারও সর্বোচ্চ আদালতে সময় বাড়ানোর আর্জি জানিয়েছে। বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলন সুচিন্তিত ভাবে এ ব্যাপারে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে আর্জি জানিয়েছে: বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা করে, আবেদন পত্র সরল করা হোক। লিগ্যাসি ডেটার উপর জোর দেওয়া যাবে না। পূর্ব পাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের মানবিকতার কারণে পঞ্জির অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। আবেদনপত্র গ্রহণের মেয়াদ ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানো হোক। জাতীয় নাগরিক পঞ্জি বা এনআরসি নবায়নের প্রেক্ষাপটে আরও গূঢ় কারণ অবশ্যই আছে। এই নাগরিক পঞ্জিকে জাতীয় বলা হলেও তা শুধু অসমেই হচ্ছে। সারা ভারতে নয়।

নাগরিক পঞ্জি নবায়ন করতে গিয়ে এই রাজ্যের নাগরিকদের দু’ভাগে ভাগ করা হচ্ছে। এটা সংবিধানের মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। বর্তমান ব্যবস্থায় এক শ্রেণির নাগরিক চিহ্নিত হবে শুধু

মাত্র অসমের নাগরিক হিসেবে। অন্য দিকে, জন্মসূত্রে ভারতীয় হলেও বিহারি, মাড়োয়ারি, পঞ্জাবি, বাঙালি-সহ বিভিন্ন রাজ্য থেকে আসা মানুষ নাগরিক হতে পারবেন না! বৈবাহিক সূত্রে যে সব মহিলা অসমে এসেছেন তাঁদের ক্ষেত্রেও সমস্যা একই—লিগ্যাসি ডেটা নেই। এমনকী মেঘালয়, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম প্রভৃতি রাজ্যে যাঁরা কর্মসূত্রে ছিলেন, অসম বিভাজিত হওয়ার পর তাঁরা ফিরে এসেছেন, তাঁদেরও একই সমস্যা। অবিভক্ত অসমের এ সব অঞ্চল থেকে লিগ্যাসি ডেটা পাওয়া সম্ভবই হচ্ছে না। প্রত্যন্ত অঞ্চলে সচেতনতার অভাবে বিধবারা প্রয়াত স্বামীর সঙ্গে ‘লিংকেজ’ বের করতে পারছেন না।

বাংলাভাষী উদ্বাস্তুদের নাগরিকত্বের সমস্যা দীর্ঘকালের। এটা শুধুমাত্র অসমেই নয়, অন্য রাজ্যে পুনর্বাসিত বাঙালিদেরও সমস্যা রয়েছে। দেশ বিভাগের সময় দেওয়া প্রতিশ্রুতি ছয় দশকের অধিককাল সময়ের মধ্যেও সমাধান হয়নি। অথচ পশ্চিম পাকিস্তানের উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে নাগরিকত্ব-সহ সব রকম সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে। তাহলে বাঙালি উদ্বাস্তুদের ক্ষেত্রে সরকার নির্বিশেষ এই বৈষম্য কেন?

অসমে বাঙালি বসবাসের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকেও বিবেচনায় আনতে হবে। ১৮৭৪ সালে তত্কালীন বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি থেকে কেটে শ্রীহট্ট, কাছাড় এবং গোয়ালপাড়াকে অসমের অন্তর্ভূক্ত করা হয়। পূর্ণাঙ্গ রাজ্য হিসেবে অসমের রাজস্ব বৃদ্ধি এবং জনসংখ্যার প্রয়োজনে এ কাজটি করা হয়েছিল। তিনটি অঞ্চলই মূলত বাংলাভাষী। এর দায় কিন্তু বাঙালিদের উপর বর্তায় না। অসমিয়া নেতৃত্বও সে দিন আপত্তি করেনি শুধু রাজ্যের স্বার্থেই। আজ সেটা বেমালুম ভুলে গেলে হবে? দ্বিতীয়ত, দেশ বিভাগের সময় শ্রীহট্টের অধিকাংশ এলাকা (বর্তমান করিমগঞ্জ জেলা বাদ দিয়ে) পাকিস্তানকে উপঢৌকন দেওয়া হয়। তখন, বিভিন্ন সময়ে যারা সাবেক পাকিস্তান থেকে বর্তমান অসমে চলে আসে, তাদের কী হবে? ১৯৫১ সালের ভোটার তালিকায় আনেকেরই নাম নেই। তাদের বংশধরদের লিগ্যাসি ডেটা পাওয়া যাচ্ছে না। বহু মানুষের এ ক্ষেত্রে জীবনমরণের লড়াই চলছে। অসংখ্য মানুষই নাগরিক পঞ্জি থেকে নাম বাদ পড়ার আশঙ্কায় রয়েছে। নিজেদের ভিটেমাটি ছেড়ে অখণ্ড ভারত থেকে খণ্ডিত ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে মানুষ আসতে বাধ্য হয়েছে। তাদের প্রতি সুবিচার করা হচ্ছে না। যে সব নথির কথা বলা হয়েছে, তা অনেকের পক্ষেই দুস্প্রাপ্য। অথচ এরা ভারতীয় নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রহীন হয়ে যাবে!

উপজাতিরা দাবি করেছে, লিগ্যাসি ডেটা ছাড়াই তাদের নাম তুলতে হবে। অর্থাত্ সমস্যার পাহাড়। এই পাহাড় অতিক্রম করে রাজ্যের সকল অধিবাসীর নাম যথাযথ ভাবে পঞ্জিভুক্ত হবে কিনা—এ নিয়ে ঘোর সংশয় দেখা দিয়েছে। মানবতাই আজ বিপন্ন। এই বিপন্নতা থেকে রাজ্যবাসীকে মুক্ত করার কোনও প্রয়াস নেই। তাই বিপুল সংখ্যক মানুষ অজানা আশঙ্কায় প্রহর গুণছেন। স্বাধীন গণতান্ত্রিক ভারতে, একুশ শতকে দাঁড়িয়ে এই বিড়ম্বনা প্রত্যক্ষ করতে হচ্ছে। এর থেকে পরিতাপের বিষয় আর কী হতে পারে? শীঘ্রই সর্বোচ্চ আদালতের মাধ্যমে পরিস্থিতি বিবেচনা করে সময়সীমা বৃদ্ধি, আবেদনপত্র সরলীকরণ, শর্তাবলি সহজ না করলে এ রাজ্যে নতুন করে অশান্তির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় কী?

 

( লেখক বরাক উপত্যকা বঙ্গ সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্মেলনের কেন্দ্রীয় সভাপতি)