• জয়ন্ত ঘোষাল
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

দিল্লির যুদ্ধে মমতার মোক্ষম চাল অণ্ণা

একটা পোস্টারে ব্যানারে ছয়লাপ দিল্লি শহর।

ছবিতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মুখ। তলায় লেখা, ‘সাদগি, সচ্চাই ঔর ইমানদারি’। যার অর্থ: অনাড়ম্বর জীবন, সত্য ও সততা।

সঙ্গে মমতার জবানিতে লেখা রয়েছে, ‘ম্যায় কিসিসে ডরতি নেহি হুঁ। জব তক জিন্দা রহুঙ্গি, শেরনি কী তরহা রহুঙ্গি অউর দেশকি রক্ষা করুঙ্গি।’ অর্থাৎ: আমি কাউকে ভয় পাই না। যত দিন বাঁচব, বাঘিনীর মতো বাঁচব এবং দেশকে রক্ষা করব।

শুধু পোস্টার-ব্যানার নয়, ১২ মার্চ রামলীলা ময়দানে অণ্ণা হজারে-মমতার যে যৌথ সভা হবে, তার প্রচার চলছে টিভি চ্যানেলগুলিতেও। দিল্লির জনসভা সেরেই মমতা-অণ্ণা যাবেন উত্তরপ্রদেশে। সেই সভারও প্রস্তুতি শুরু হয়ে গিয়েছে লখনউয়ে। উত্তর ভারতের আরও কিছু রাজ্যে পর পর সভা করবেন দু’জনে। জামা মসজিদের শাহি ইমামও বেশ কিছু জনসভায় থাকবেন বলে খবর।

অণ্ণা ও মমতার এই সমঝোতাকে রাজনৈতিক দিক থেকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। কংগ্রেস এবং বিজেপি-র শীর্ষ নেতাদের অনেকেই বলছেন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ঠিকমতো চাল দেওয়ার নামই হল রাজনীতি। মমতা সে কাজে দারুণ ভাবে সফল।

লোকসভা ভোটের দিকে তাকিয়ে একেবারে গোড়ায় মমতা চেয়েছিলেন নীতীশ কুমার, নবীন পট্টনায়ক, জয়ললিতাদের নিয়ে একটি ফেডেরাল ফ্রন্ট গঠন করতে। প্রথম প্রথম সে ব্যাপারে উৎসাহও দেখিয়েছিলেন নীতীশ। কিন্তু নরেন্দ্র মোদী লোকসভা ভোটে বিজেপি-র প্রধান মুখ হিসেবে উঠে আসার পরে এনডিএ ছেড়ে তিনি কংগ্রেস সম্পর্কে নরম মনোভাব নিতে শুরু করেন। ফলে ফেডেরাল ফ্রন্ট নিয়ে তাঁর আগ্রহ কমে। 

ফেডেরাল ফ্রন্টের বৃত্ত থেকে দূরে সরে গিয়েছেন নবীন পট্টনায়ক এবং জয়ললিতাও। জয়ললিতা নিজে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। তাই বামেদের সঙ্গে যোগাযোগ করে তৃতীয় ফ্রন্টের বিকল্প পরিকল্পনা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন। পায়ের তলায় রাজনৈতিক জমির খোঁজে তৃতীয় ফ্রন্ট গড়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে বামেদেরও। সিপিএম সাধারণ সম্পাদক প্রকাশ কারাট বুঝতে পারছেন, পশ্চিমবঙ্গে সিপিএমের অবস্থা শোচনীয়। সেখানে একের পর এক ভোটে বামেদের অবস্থা ক্রমেই খারাপ হচ্ছে। বাম ভোটের অবক্ষয় বন্ধ হওয়ার আশু কোনও লক্ষণই নেই। সেই কারণেই মরিয়া হয়ে মুলায়ম সিংহ যাদব, দেবগৌড়া, জয়ললিতা, নীতীশ কুমার প্রমুখকে নিয়ে তৃতীয় ফ্রন্ট গড়ার চেষ্টা শুরু করেছে সিপিএম।

এই পরিস্থিতিতে ফেডারেল ফ্রন্ট আপাতত শিকেয় তুলে রেখে অণ্ণা হজারের সঙ্গে মিলে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে একটি রাজনৈতিক পরিসর তৈরি করতে সচেষ্ট হয়েছেন মমতা। সম্প্রতি দিল্লি এসে তিনি বলেছেন, ‘এখন নির্বাচনী জোট প্রি-পেড নয় হবে পোস্ট পেড।’ অর্থাৎ, ভোটের আগে নয়, জোট যা হওয়ার হবে ভোটের পরেই। বস্তুত এমন কথা বলছেন প্রায় সব দলের নেতারাই।

কিন্তু অণ্ণার সঙ্গে মমতার জোট দু’টি রাজনৈতিক দলের সমঝোতা নয়। আসলে এর মধ্যে দিয়ে তৃণমূল নেত্রী এক ঢিলে অনেকগুলি পাখি মেরেছেন। প্রথমত, অণ্ণা-মমতার যৌথ জনসভার প্রচার হিন্দি বলয়ে তৃতীয় ফ্রন্টের লম্ফঝম্প অনেকটাই লঘু করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, উত্তর ও পশ্চিম ভারতে মমতার জন্য অণ্ণা খুবই সময়োপযোগী। কারণ, সেখানে অণ্ণার নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক রয়েছে। সেই ভরসায় বলীয়ান হয়েই ওই এলাকার বিভিন্ন রাজ্যে প্রচারে নামতে চলেছেন মমতা।

এর পিছনেও একটা লক্ষ্য রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিয়মমতো কোনও রাজনৈতিক দলকে সর্বভারতীয় দলের স্বীকৃতি পেতে গেলে ১) কোনও একটি রাজ্য থেকে অন্তত চারটি আসন এবং চার বা তার বেশি রাজ্যে লোকসভা বা বিধানসভায় মোট প্রদত্ত ভোটের অন্তত ৬ শতাংশ পেতে হয়। অথবা, ২) কমপক্ষে তিনটি রাজ্য থেকে লোকসভার ১১টি আসনে জিততে হয়। তৃণমূলের হিসেব হল, পশ্চিমবঙ্গ ছাড়া ত্রিপুরা, কেরল, অসম, উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানার মতো রাজ্যে যদি সব মিলিয়ে ১০০টি আসনে লড়া যায়, তা হলে এই দুই শর্তের কোনও একটি পূরণ করে ফেলা যাবে।

অণ্ণা-প্রশ্নে মমতা সুচতুর রণকৌশল নিয়েছেন, তেমনই অণ্ণার দিক থেকেও মমতার সঙ্গে হাত মেলানোর কারণ রয়েছে। নিজে রাজনৈতিক দল গড়বেন না বলে অনেক আগেই জানিয়ে দিয়েছেন অণ্ণা। তাঁর শিষ্য অরবিন্দ কেজরীবালও গোড়ায় সেই কথাই বলেছিলেন। কিন্তু পরে সেই মত থেকে সরে এসে আম আদমি পার্টি গড়েন কেজরীবাল। দিল্লির ভোটে বিপুল সাফল্যও পেয়েছেন তিনি। সঙ্গে সঙ্গে অণ্ণার সঙ্গে তাঁর দূরত্বও বেড়েছে। বস্তুত, গুরু-শিষ্যের মতপার্থক্য এখন চরম আকার নিয়েছে। অণ্ণা চাইছেন কেজরীবালের বিষদাঁত ভাঙতে।

কিন্তু কংগ্রেস বা বিজেপি, মায়াবতী বা মুলায়ম কারও পক্ষে প্রচার করাই অণ্ণার পক্ষে অসুবিধার। কারণ, এদের সকলের বিরুদ্ধেই দুর্নীতির অভিযোগ বিস্তর। আর তাই মমতার সততা, তাঁর সহজ-সরল জীবনযাপন, মূল্যবোধের রাজনীতিকে হাতিয়ার করেছেন অণ্ণা। মমতাকেই তিনি বেছে নিয়েছেন আম-আদমি ব্র্যান্ড হিসাবে।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন