আগামিকাল ফের জঙ্গলমহল যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত চার বছরে বহু বার জঙ্গলমহলের তিন জেলায় গিয়েছেন তিনি। কিন্তু বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক আগে এ বারের সফরের তাৎপর্য অনেক বেশি বলেই মনে করছে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে সম্প্রতি সুনির্দিষ্ট তথ্য এসেছে যে, ঝাড়খণ্ড থেকে বেশ কিছু মাওবাদী জঙ্গি জঙ্গলমহল এলাকায় ঢুকে পড়েছে। ঝাড়খণ্ডে বিজেপি সরকার গঠিত হওয়ার পরে সেখানে মাওবাদী দমন অভিযান শুরু হয়। তার জেরে ওই রাজ্য থেকে তাড়া খেয়ে কমপক্ষে কুড়ি-পঁচিশ জন মাওবাদীর একটি দল জঙ্গলমহলের প্রত্যন্ত এলাকাগুলিতে ডেরা বেঁধেছে বলে জানা গিয়েছে। সম্প্রতি দিল্লি এসে মমতা কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহকে এ বিষয়ে তাঁর উদ্বেগ জানিয়েছিলেন। মুখ্যসচিব সঞ্জয় মিত্রও লিখিত ভাবে বেশ কিছু তথ্য কেন্দ্রকে জানিয়েছেন। সূত্রের খবর, পশ্চিমবঙ্গে ফের মাওবাদীদের গতিবিধির খবরে চিন্তিত রাজনাথও।  তিনি ঝাড়খণ্ডের মুখ্যমন্ত্রী রঘুবর দাসকে ফোন করে পশ্চিমবঙ্গের সমস্যা ও উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের পক্ষ থেকে ঝাড়খণ্ড সরকারকে সতর্ক করে দিয়ে বলা হয়েছে, কোনও রাজ্য চাইলে মাওবাদী দমন অভিযান চালাতেই পারে। কিন্তু তাদের এটাও নিশ্চিত করতে হবে যে, সেই অভিযানের ধাক্কায় জঙ্গিরা যেন পড়শি রাজ্যে পালিয়ে যেতে না পারে।

অতীতে অবিভক্ত অন্ধ্রপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী চন্দ্রবাবু নায়ডু যখন মাওবাদীদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছিলেন, তখন সে রাজ্যের মাওবাদীরা রেড করিডর দিয়ে পালিয়ে ওড়িশায় চলে এসেছিল। সেই দলে পরবর্তী কালে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্ব পাওয়া কিষেণজি-সহ মাওবাদীদের অধিকাংশ পলিটব্যুরো সদস্য ছিলেন। এখন আবার ঝাড়খণ্ড থেকে তাড়া খেয়ে মাওবাদীরা পশ্চিমবঙ্গ ও ওড়িশায় ঢুকে পড়ছে।

এই পরিস্থিতিতে নবান্নের দাবি, ঝাড়খণ্ড ও পশ্চিমবঙ্গের সীমানা সিল করে দেওয়া হোক। বিশেষ করে মাওবাদী অভিযান চালানোর সময়। সেই কাজের জন্য অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় বাহিনীর দাবিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের কাছে জানানো হয়েছে। রাজ্যের বক্তব্য, ঝাড়খণ্ডের সঙ্গে পুরুলিয়া বা পশ্চিম মেদিনীপুরের মতো জেলার সীমানা শুধু পুলিশ দিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। তা ছাড়া, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা রাজ্যের দায়িত্ব হলেও মাওবাদী দমনের দায় কেন্দ্রও এড়াতে পারে না। নজরদারির পাশাপাশি রাজ্যের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়ের ক্ষেত্রেও কেন্দ্রের সমন্বয়ে ঘাটতি রয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছে নবান্ন।

ইউপিএ আমলে দিল্লিতে মাওবাদী সংক্রান্ত বৈঠকগুলিতে নিয়মিত ভাবে হাজির থাকত পশ্চিমবঙ্গ। কিন্তু গত তিন বছরে রাজ্যে সেই অর্থে কোনও উপদ্রব না-হওয়ায় মাওবাদী অধ্যুষিত রাজ্যগুলির তালিকা থেকে পশ্চিমবঙ্গকে বাদ দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক। তবে মাওবাদীরা ফের পশ্চিমবঙ্গে বাসা বাঁধতে শুরু করেছে, এই খবর সামনে আসার পরে আগামী দিনে ফের ওই তালিকায় পশ্চিমবঙ্গের নাম অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে ভাবনা-চিন্তা শুরু হয়েছে। পাশপাশি, রাজনাথ তাঁর মন্ত্রকের আধিকারিকদের বলেছেন পশ্চিমবঙ্গ তালিকায় থাকুক বা না-থাকুক, সমন্বয়ের কাজে যেন সর্বদা পশ্চিমবঙ্গকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তাঁর কথায়, ‘‘তৃণমূল এবং বিজেপির রাজনৈতিক বিবাদ থাকতেই পারে। কিন্তু মাওবাদী দমনের ক্ষেত্রে আমরা রাজনৈতিক ঐকমত্য রচনায় বিশ্বাসী। অতীতে যখন মনমোহন সিংহ ক্ষমতায় ছিলেন, তখন ছত্তীসগঢ়ে বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী রমন সিংহ কিন্তু তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সুশীল শিন্দে বা পি চিদম্বরমের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রেখে চলতেন। এখনও সেই পরম্পরা জারি রয়েছে।’’ রাজনাথ জানাচ্ছেন, তাঁর সঙ্গে মমতার নিয়মিত ফোনে কথা হয়। জঙ্গলমহলে যে আবার মাওবাদীরা তৎপরতা বাড়াতে চাইছে, সে বিষয়েও তিনি ওয়াকিবহাল। মুখ্যমন্ত্রীর বারবার জঙ্গলমহল যাওয়ার প্রশংসা করে রাজনাথ বলেন, ‘‘এটা স্থানীয় মানুষের আস্থা বাড়াতে সাহায্য করেছে।’’

রাজ্যের শাসক দলের বক্তব্য, মাওবাদী সমস্যা মোকাবিলার শ্রেষ্ঠ রাস্তা হল অনুন্নত এলাকার উন্নয়ন। গত চার বছরে জঙ্গলমহল এলাকায় যা সফল ভাবে করা হয়েছে। তবে এই কাজে কেন্দ্রীয় সাহায্যও দরকার। প্রণব মুখোপাধ্যায় কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী থাকাকালীন অনুন্নত এলাকার উন্নয়ন খাতে রাজ্যের জন্য অর্থ বরাদ্দ করেছিল। কিন্তু একটি বড় অংশ এখনও রাজ্যের হাতে আসেনি বলে অভিযোগ তৃণমূলের।

অর্থাভাবের কারণে জঙ্গলমহলে উন্নয়নমূলক কাজকর্ম খানিকটা বাধা পাওয়া ছাড়াও চার বছরের শাসনের পর প্রকৃতির নিয়মেই সেখানে খানিকটা প্রতিষ্ঠান-বিরোধী মানসিকতা তৈরি হয়েছে। সেই ক্ষোভকে কাজে লাগাতে চাইছে মাওবাদীরা। তাদের চিরাচরিত কৌশল হল, বিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে মিশে গিয়ে নিজেদের জনভিত্তি বাড়ানো। মহারাষ্ট্রে বিদর্ভ আন্দোলনের সময় মাওবাদীরা সেই আন্দোলনে ঢুকে গিয়েছিল। এ রাজ্যেও তৃণমূল যখন বিরোধী দল, তখন তাদের আন্দোলনে মাওবাদীদের উপস্থিতির অভিযোগ উঠেছিল। সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামে মাওবাদীরা ছিল বলে একাধিক বার রিপোর্ট দিয়েছেন গোয়েন্দারা।

এখন তৃণমূলের অভিযোগ, সিপিএমের সঙ্গে হাত মিলিয়ে মমতাকে নিশানা বানাতে চাইছে মাওবাদীরা। বাম আমলে স্থানীয় সিপিএমের কর্মীরা শান্তিবাহিনী গঠন করে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাবাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় রাখত। তৃণমূলের বক্তব্য, তারাই এখন মাওবাদীদের সঙ্গে আঁতাঁত গড়ে তুলে জঙ্গলমহল অশান্ত করতে চাইছে।

এই চাপানউতোরের মধ্যে না-ঢুকলেও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক সূত্র বলছে, মাওবাদী দমনের প্রশ্নে সিপিএমের মধ্যে মতাদর্শগত পার্থক্য ছিল।
কিন্তু তৃণমূলে যে হেতু মমতাই
শেষ কথা, তাই এ বিষয়ে কোনও মতের অমিল নেই। মমতা ক্ষমতায় আসার পরেই মাওবাদীদের সম্পর্কে কড়া অবস্থান নিয়েছেন। যার জেরে মৃত্যু হয়েছে কিষেণজির। জঙ্গলমহলেও অনেকটাই স্তিমিত হয়েছে মাওবাদী দাপট।

সেই শান্তি যাতে বজায় থাকে, পড়শি রাজ্য থেকে জঙ্গলমহলে ঢুকে পড়া মাওবাদীরা যাতে স্থানীয় মানুষের মধ্যে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ না পায়, তা নিশ্চিত করাই এখন রাজ্য প্রশাসনের বড় দায়িত্ব। আর সেই দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মুখ্যমন্ত্রীর এ বারের জঙ্গলমহল সফর।