• ঋজু বসু
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

জগন্নাথের মানবলীলার সাক্ষী আধ কোটি

1
নবকলেবরে মন্দির থেকে রথের পথে জগন্নাথদেব।

মন্দির লাগোয়া রাজপথ গ্র্যান্ড রোড থেকে গুন্ডিচা মন্দিরের কিনারে সেই সরদা নদীর আজ চিহ্ন নেই। কিন্তু তার নাম এখনও লোকের মুখে মুখে ফেরে। গুন্ডিচা লাগোয়া রাজপথ এখনও সরদাবালু বা সরদার তট বলেই অনেকে উল্লেখ করেন।

শনি-সন্ধ্যায় রথের গন্তব্য গুন্ডিচার কাছে দাঁড়িয়েই কোনও এক বিস্মৃত ওড়িয়া পদকর্তার আখর গুণগুণ করছিলেন, পুলিশের প্রবীণ এএসআই নরেশ মোহান্তি। ‘প্রভু কিছি মাগু নাহি তোতে / ধন মাগু নাহি /জন মাগু নাহি / মাগুছি সরদা বালিরু হাতে!’ এই নিয়ে ১১ বার প্রভুর রথযাত্রার ডিউটির সুযোগ পাওয়া সাদাসিধে উর্দিধারী বিগলিত। প্রভুর রথযাত্রার দিনে তাঁর সম্পদ, সন্তান কী-ই বা চাওয়ার আছে! শুধু রথচক্রের স্পর্শধন্য সরদা চরের বালুকণাটুকু ছুঁতে পারলেই জীবন ধন্য।  

জগন্নাথদেবের নবকলেবরের রথযাত্রায় তাঁর যাত্রাপথের পাশে একবার এই ঠাঁই পাওয়াটুকুই যে একমাত্র প্রার্থনা, আজকের পুরীর সকাল তা আবার বুঝিয়ে দিল। পুলিশের হিসেবে, সারা দিনে কমপক্ষে ৫০ লক্ষ লোক আজ জগন্নাথধামে ঢুকেছেন। ভোরের আলো ফোটার মুহূর্ত থেকে জনবিস্ফোরণ। রথ ঘিরে থাকা পুলিশি ব্যারিকেড কোনও মতে প্রবল চাপ নিয়েও দুর্গরক্ষা করে গেল।


পুরীতে রথযাত্রা দেখতে এসে ভিড়ে অসুস্থ হয়ে পড়া এক মহিলাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হল কি? রাস্তায় রাস্তায় জলসত্রের ব্যবস্থা থাকলেও ঠা-ঠা রোদে সকাল থেকেই অজস্র ভক্ত অসুস্থ হয়েছেন। স্ট্রেচারে করে তাঁদের সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন স্বেচ্ছাসেবীরা। এরই মধ্যে দুই ভক্তের মৃত্যুসংবাদ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ল গোটা পুরীতে। মুখে মুখে রটে গেল, পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যু হয়েছে তাঁদের। পদপিষ্টের ঘটনা যে আদৌ ঘটেনি, তা সাংবাদিকদের বোঝাতে তখন ঘর্মাক্ত শরীরেও নতুন করে ঘাম ছুটতে থাকে প্রশাসনের কর্তাদের। খোদ রাজ্য পুলিশের ডিরেক্টর জেনারেল সঞ্জীব মারিক প্রায় পনেরো মিনিট ধরে বোঝালেন, নবকলেবরের রথযাত্রার দিন যে দু’জনের জগন্নাথ প্রাপ্তি হল, তাঁরা এই গরমে অসুস্থ হয়েই মারা গিয়েছেন। বড় দণ্ডের উপরে টাউন থানার কাছে এক মহিলা মাথা ঘুরে পড়ে যান। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিত্সকরা মৃত ঘোষণা করেন। অন্য দিকে, বড় দণ্ডেরই অন্যত্র অপর এক মহিলা হঠাত্ করে বুকে ব্যথা বলে অসুস্থ হয়ে পড়েন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পর তাঁরও মৃত্যু হয়।

ডিজিপি জানান, এই ভিড়ে প্রবল ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কিতে বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছু নারী-পুরুষ পড়ে যান, আঘাত পান। তাঁদের তত্ক্ষণাত্ হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হয়। তবে তাঁদের কারও মৃত্যু হয়নি। ‘পদপিষ্ট’ জাতীয় শব্দ ব্যবহার করতে তাই রাজ্য প্রশাসন নারাজ। পুরীর জেলাশাসক অরবিন্দ অগ্রবালের বক্তব্য, ‘‘এই বিপুল সংখ্যক মানুষের সমাগম। আমরা উদ্বেগে ছিলাম। জগন্নাথদেবই আমাদের বিপদ থেকে বাঁচিয়েছেন। বড় অঘটন ঘটেনি।’’

বেলা ১২টায় জগন্নাথদেবের ‘পহুন্ডি বিজয়’ বা রথারোহণ পর্যন্ত বাকি সব কিছু অবশ্য ঠিকঠাকই চলছিল। কিন্তু যাত্রার দ্বিতীয়ার্ধ শুরুর আগে পুরীর গজপতি রাজার জন্য প্রতীক্ষা পর্বেই গোল বাধল। প্রথামাফিক ‘ছেরা পহরা’ বা সোনার ঝাড়ু দিয়ে রথ ঝাঁট দিতে পালকি করে রাজা আসেন প্রতি বার। এ বার তাঁর আসতে আসতেই বিকেল তিনটে বাজল। এখানে কেউ কেউ অবশ্য বলছেন, পুরীর শঙ্করাচার্য রথে উঠে প্রভুকে দর্শন করা পর্যন্তই রাজা অপেক্ষায় ছিলেন। তবে দেরির জেরে বলভদ্রের রথ বিকেল তিনটে চল্লিশ মিনিটে, সুভদ্রার রথ বিকেল চারটে কুড়ি মিনিটে আর জগন্নাথের রথ বিকেল পাঁচটায় ছাড়ল। গুন্ডিচা পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকা ভক্তকুল তখন

ধৈর্যের শেষ সীমায়।

এর মধ্যেই অবশ্য বহুকষ্টে রথের কাছে এসে পৌঁছেছেন কেউ কেউ। টালিগঞ্জের গৃহবধূ সুপর্ণা মাইতি কোন ফাঁকে ভিতরে ঢুকে একেবারে প্রভু জগন্নাথের রথের সিঁড়ির নীচে এসে বসে পড়েছেন। বাড়ি থেকে কেউ নাকি তাঁকে এই সময় পুরী আসার অনুমতিই দিতে চাননি। সুপর্ণাদেবী ভেবেছিলেন হাওড়া স্টেশনে ভিক্ষে করে ট্রেনে উঠে পড়বেন। ছেলে অবশ্য শেষ মুহূর্তে মা আর ছোট মামার জন্য বাসের টিকিট কিনে দেন। তবে সুপর্ণার ভাই পুরী এলেও রথের দিন ভিড়ের ভয়েই মন্দিরমুখো হননি। প্রৌঢ়া তাই একাই চলে এসেছেন। লক্ষ্মীঠাকুরের মতো মুখ। কাঁচাপাকা চুলের সুপর্ণাদেবী রথে আসীন নবকলেবরের জগন্নাথকে দেখে কখনও কেঁদে, কখনও হেসে একের পর এক গান গেয়ে চলেছেন। বললেন, ‘‘জগন্নাথের পহুন্ডি বিজয়ের সময়ে আমি রথের নীচে ঢুকে গিয়েছিলাম। উপর থেকে পদ্মের পাপড়ি আমার গায়ে এসে পড়ল।’’

এই জগন্নাথ-দর্শন থেকে জীবনের একটা শিক্ষাও নিয়েছেন সুপর্ণা। বিপদে আর কখনও কারও মুখ চেয়ে বসে থাকবেন না।

আসলে দিনভর এত ভিড়ে জগন্নাথদেব ছাড়া বাকি সবই যেন অবান্তর হয়ে উঠেছিল আজ। রাজ্যপাল আর মুখ্যমন্ত্রী আসার পরই কি বিগ্রহের পহুন্ডি বা রথারোহণ শুরু হবে? জেলাশাসক অরবিন্দ অগ্রবাল এ কথা শুনেই জিভ কাটলেন। ‘‘সবই প্রভুর ইচ্ছে,’’ বলে খালি পায়ে তদারকিতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। প্রোবেশনারি পর্যায়ে থাকা ছয় আইএএস তরুণ-তরুণীও রথযাত্রার আবহে বিহ্বল। কোরাপুটের ছেলে সিদ্ধার্থশঙ্কর সোয়াঁইন রথের সামনে নারকোল ফাটাবেন বলে হাতে দু’টো নারকোল নিয়ে ঘুরছেন। নিজেই বললেন, ‘‘বড় দণ্ডে এ বার নারকোল বিক্রি নিষেধ বলে কম নারকোল ফাটানো হবে।’’

সকাল সাড়ে সাতটায় রথ প্রতিষ্ঠার পরে পহুন্ডির উন্মাদনা, মন্দিরের সিঁড়ি থেকে রথ পর্যন্ত নারীবেশী পুরুষ শিল্পীদের উত্কলীয় গোটিপুয়া নৃত্যকলা, কাঁসর-মৃদঙ্গের উল্লাস বা ল্যাজবিশিষ্ট হনুমানবেশী ছেলেবুড়োর ছোটাছুটিতে মুখ্যমন্ত্রী, রাজ্যপাল তখন নেহাতই পার্শ্বচরিত্র।

রথের দিনে জগন্নাথের ‘স্পেশ্যাল’ শুকনো লঙ্কা দেওয়া টক-ঝাল চরণামৃত তোরাপানি একটু বিতরণ করেই মুখ্যমন্ত্রী নবীন পট্টনায়ক মন্দিরের পাশে, তথ্য কেন্দ্রের ছাদে নির্দিষ্ট আসনে বসে পড়লেন। তিনি আসার আগেই অবশ্য মন্দির থেকে রথে চড়তে বেরিয়ে পড়েছেন জগন্নাথের বড়দা বলভদ্র। বোন সুভদ্রার পরে বেলা ১২টা নাগাদ নবকলেবরের জগন্নাথ মন্দিরের বাইরে ভক্তদের সামনে প্রকট হলেন। আশপাশের ছাদ, সামনের ব্যারিকেডের ও-পারে জনতা মুহূর্তে যেন কানফাটা উচ্ছ্বাসে গর্জন করে উঠল। পুরীর সমুদ্রের জলোচ্ছাসের শব্দের কাছে সেই গর্জন কি হার মানল? এ নিয়ে অবশ্য তর্ক চলতেই পারে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী কিন্তু প্রভুকে দেখামাত্র জোড় হাতে উঠে দাঁড়ালেন। রথ ঝাঁট দেওয়ার সময়ও নেতা-মন্ত্রীদের মধ্যে ছবি তোলার জন্য রীতিমতো প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল।

ওড়িশার গাঁধী বলে পরিচিত, গোপবন্ধু দাসের মূর্তির পাশে ‘ভিআইপি বক্সে’ মন্ত্রীদের বসার বন্দোবস্ত হয়েছিল। সেই গোপবন্ধুর একটি উদ্ধৃতিও এ দিন মন্দির-চত্বরে মূর্ত হয়ে উঠেছে। ‘উত্কলে বিশেষে নাহি প্রয়োজন / উত্কল নেতা নিজে নারায়ণ’। অর্থাত্ ওড়িশার নেতা স্বয়ং একমেবাদ্বিতীয়ম নারায়ণ।

সন্ধের মুখে পর পর বলভদ্র, সুভদ্রা ও জগন্নাথের রথ বেরিয়ে যাওয়ার পরেও দেখা গেল, ভক্তদের উন্মাদনায় খামতি নেই। ভক্তদের চোখে রথযাত্রা হল প্রভুর মানবলীলা। নবকলেবরের রথযাত্রায় শরীরের শেষ শক্তি উজাড় করে ভক্তরাও যেন অতি মানব হয়ে উঠতে চাইলেন।

 

শনিবার পুরীতে রণজিৎ নন্দীর তোলা ছবি।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন