একটা সময়ে তারা আফগানিস্তানে গিয়েছিল আল কায়দা-র কাছে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিতে। বছর বিশেক আগে তাদের ‘ঘর ওয়াপসি’ ধীরে ধীরে শুরু হয়। এখন অনেকেই স্বদেশে থিতু। আর ওসামা বিন লাদেনের হাতে গড়া সেই বাংলাদেশি জঙ্গিরা এখন ভারতের নিরাপত্তার পক্ষে বড় ঝুঁকি বলে মনে করছেন দু’দেশের গোয়েন্দারাই। এ ক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গের মালদহকে ঘাঁটি করে জঙ্গিরা এগোতে পারে বলে জাতীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনআইএ) সূত্রে দাবি করা হয়েছে।

বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু সম্প্রতি মন্তব্য করেছেন, আফগানিস্তানে ওসামা বিন লাদেন তিন থেকে পাঁচ হাজার বাংলাদেশিকে প্রশিক্ষণ দেন। আনন্দবাজারকে ইনু বলেন, ‘‘ওই তিন থেকে পাঁচ হাজার বাংলাদেশি আফগানিস্তানে সাবেক সোভিয়েত সেনার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। তারা তখন ছিল মাদ্রাসার ছাত্র। এখন তাদের অনেকেই বাংলাদেশে ফিরে এসেছে। জঙ্গি হামলার ঝুঁকি সেই জন্যই।’’

বাংলাদেশের গোয়েন্দা-কর্তাদের একাংশ স্বীকার করে নিচ্ছেন, ওই ‘মুজাহিদ’-দের থেকে বিপদের ঝুঁকি শুধু বাংলাদেশের নয়, পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতেরও।

এনআইএ-র আইজি সঞ্জীব সিংহ বলেন, ‘‘বাংলাদেশের তিন থেকে পাঁচ হাজার লোক যদি আল কায়দায় প্রশিক্ষণ নিয়ে থাকে, তবে পশ্চিমবঙ্গ নিয়ে দুশ্চিন্তা আছে বই কি।’’ কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের বক্তব্য, জঙ্গি কার্যকলাপ বা নাশকতা পশ্চিমবঙ্গের যে কোনও জায়গায় হতে পারে, তবে বাংলাদেশ থেকে আসা জঙ্গিরা মালদহ জেলা— বিশেষ করে কালিয়াচক, বৈষ্ণবনগর এলাকাতেই বেসক্যাম্প করে তার পর নিজেদের ছড়িয়ে দিতে চাইবে।

কিন্তু মালদহ কেন?

কারণ হিসেবে সম্প্রতি হাতে আসা কয়েকটি তথ্য পেশ করেছেন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা।

এক, জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি)-এর নেতারা এসে সম্প্রতি কালিয়াচকের সীমান্ত ঘেঁষা একটি আমবাগানে প্রকাশ্যে জেহাদি প্রশিক্ষণ দিয়ে গিয়েছে। এনআইএ জেনেছে, এক ডজন স্থানীয় যুবক সেখানে অন্তত চার দিন প্রশিক্ষণ নিয়েছে। তার পর আর তাদের হদিস মিলছে না। গুলি ছোঁড়া না হলেও রাইফেল ধরার তালিম দেওয়া হয় সেখানে, সেই সঙ্গে ছিল শারীরিক কসরত ও জেহাদি মতাদর্শের পাঠ। প্রশিক্ষকদের অন্তত এক জন ‘মুজাহিদ’ বলে খবর পেয়েছেন গোয়েন্দারা। তাকে শনাক্ত করার চেষ্টা চলছে।

দুই, এ বছর জানুয়ারি মাসে কালিয়াচকে যে অশান্তি, হিংসা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে, তাতে শুধু স্থানীয় দুষ্কৃতীদের একাংশই জড়িত ছিল না। এনআইএ-র কাছে নির্দিষ্ট খবর, বাংলাদেশ থেকে মোট ৫৪ জন চোরাপথে সীমান্ত পেরিয়ে কালিয়াচক এলাকায় ঢুকেছিল গোলমাল আরও বেশি করে ছড়াতে। আর এই পরিকল্পনা চাপাই নবাবগঞ্জ জেলায় জেএমবি-র একটি ডেরায় বসে করেছিল মুজাহিদরা। দফায় দফায় ওই ৫৪ জনকে মালদহে ঢোকানো হয়েছিল এবং তারা প্রায় সপ্তাহ খানেক কালিয়াচকে ঘাঁটি গেড়ে ছিল।

তিন, বেআইনি কার্যকলাপ প্রতিরোধ আইনে (ইউএপিএ) অভিযুক্ত এক ব্যক্তিকে বৈষ্ণবনগরের একটি গ্রাম থেকে গ্রেফতার করে আনার সময়ে কেন্দ্রীয় গোয়েন্দারা প্রবল প্রতিরোধের মুখে পড়েন। বোমা ছোঁড়া হয়, মূল সড়কে দু’দিকে পথ অবরোধ করে রাখা হয় এবং গাড়ি ভাঙচুর করে জ্বালিয়ে দিয়ে আসামিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ছক কষা হয়েছিল। এই কাজ যারা করছিল, তাদের দু’জন অনবরত তখন বাংলাদেশের দু’টি মোবাইল নম্বরে ফোন করে কথা বলছিল এবং সেখান থেকেই নির্দেশ পাচ্ছিল।

কেন্দ্রীয় গোয়েন্দাদের মতে, এই জেলার সীমান্তবর্তী তল্লাটের মাটি সব দিক দিয়ে জঙ্গিদের মদত দেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে আছে। তা ছাড়া, বেআইনি ভাবে ভারতে ঢোকার সব চেয়ে সহজ পথ মালদহ সীমান্ত। এর ভৌগৌলিক অবস্থানও জঙ্গিদের পক্ষে অনুকূল।       

মালদহের ঠিক ও পারে বাংলাদেশের চাপাই নবাবগঞ্জ জেলা। যা রাজশাহি ডিভিশনের অন্তর্গত। এই রাজশাহি জেএমবি-র অন্যতম প্রধান ঘাঁটি বলে চিহ্নিত। এনআইএ-র এক কর্তা জানাচ্ছেন, চাপাই নবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ এলাকা জাল নোটের কারবারিদের অন্যতম প্রধান ঘাঁটি। গত বছর নভেম্বরে সেই শিবগঞ্জ থানায় গিয়ে ভারতীয় গোয়েন্দারা জানতে পারেন, পুলিশের কাছে এগারো মাসে জাল নোট সংক্রান্ত মাত্র তিনটি মামলা রুজু হয়েছে। তাজ্জব হয়ে যান তাঁরা। এনআইএ জানাচ্ছে, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ন (র‌্যাব) কিংবা গোয়েন্দা সংস্থাগুলো হস্তক্ষেপ করলে ব্যাপারটা অন্য রকম হয়ে থাকে।

বাংলাদেশের গোয়েন্দারা বলছেন, আফগানিস্তান থেকে ফিরে এসে বাংলাদেশি মুজাহিদরা হরকত-উল-মুজাহিদিন বাংলাদেশ ও জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ— এই দু’টি সংগঠনে ভাগ হয়ে পড়েছিল। কিন্তু হরকতের শীর্ষনেতা মুফতি হান্নান জেলে যাওয়ার পর ও তাঁর ফাঁসির আদেশ আদালত ঘোষণা করার পর হরকতের বহু ‘মুজাহিদ’ সদস্যই এখন জেএমবি-তে। বাংলাদেশের গোয়েন্দা অফিসারদের একাংশের বক্তব্য, ‘মুজাহিদ’-দের বেশির ভাগই এখন জেএমবি-তে যোগ দিয়েছে। আর ওই জঙ্গি সংগঠনই কৌশলগত ভাবে নিজেদের আড়ালে রাখতে কখনও আইএস, কখনও আনসারুল্লা বাংলা টিম-এর নাম নিয়ে বাংলাদেশে মুক্তমনাদের হত্যা করছে বলে ও পার বাংলার পুলিশ ও গোয়েন্দাদের দাবি।

ঢাকায় ডিআইজি পদমর্যাদার এক গোয়েন্দা-কর্তার কথায়, ‘‘জেএমবি-র অনেক নেতাই এখন আর সংগঠনের নাম জামাতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ বলে না, জামাতুল মুজাহিদিন বাংলা বলে। পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশ— দুই বাংলা মিলে তারা খিলাফত প্রতিষ্ঠা করতে চায়।’’

জেএমবি যে নিঃশব্দে বছরের পর বছর ধরে পশ্চিমবঙ্গে কত দূর জাল বিছিয়েছে, সেটা বর্ধমানের খাগড়াগড় বিস্ফোরণের সূত্রে বেরিয়ে পড়ে। আর সেই তদন্তেই বেরোয়, আল কায়দার শেখানো পথেই তারা বিস্ফোরক ও আইইডি (ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস) বানানো শিখেছিল।