পশ্চিমবঙ্গে বাম-কংগ্রেস সমঝোতা ইস্যুতে নরম সুরই নিল সিপিএম পলিটব্যুরো। কেরল লবির তীব্র আপত্তি সত্ত্বেও বাংলায় বাম-কংগ্রেস জোট আটকানো যায়নি। কিন্তু ভোটে ভরাডুবির পর মুজফ্ফর আহমেদ ভবনের মাথারা আশঙ্কা করেছিলেন নয়াদিল্লির একেজি ভবনে পা দিয়েই ঝড়ের মুখে পড়তে হবে তাঁদের। সিপিএম পলিটব্যুরো কিন্তু সে পথে হাঁটল না। বৈঠক শেষে পলিটব্যুরো সিদ্ধান্তে পৌঁছল— বাংলায় একটি রাজনৈতিক রণকৌশল নিজে থেকেই ‘উদ্ভুত’ হয়েছিল। সীতারাম ইয়েচুরির আহ্বান, পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ লড়াই চালাতে হবে বিরোধী দলগুলিকে।

বাংলা থেকে সিপিএম পলিটব্যুরোতে যে তিন সদস্য রয়েছেন, সেই বিমান বসু, সূর্যকান্ত মিশ্র এবং মহম্মদ সেলিম বৈঠকের শুরু থেকেই জোটের সিদ্ধান্তের পক্ষে জোরদার সওয়াল করার চেষ্টা করেছেন। রবিবার বাংলার জোট নিয়ে পলিটব্যুরোর বৈঠকে খুব বেশি আলোচনা হয়নি। আজ, সোমবারই মূলত তা নিয়ে আলোচনা হয়। কিন্তু পলিটব্যুরো কাউকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা পথে হাঁটেনি। বিশাখাপত্তনম পার্টি কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কোনও পরিস্থিতিতেই কংগ্রেসের সঙ্গে জোট গড়ার পথে হাঁটতে পারে না সিপিএম। সেই সিদ্ধান্ত অগ্রাহ্য করে বাংলার নেতারা কেন্দ্রীয় কমিটিকে রাজি করিয়েছিলেন বাম-কংগ্রেস সমঝোতা মেনে নিতে। কিন্তু তা মেনে নিয়েও নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সাফল্য তো মেলেইনি। পশ্চিমবঙ্গে ভোট এবং আসন দুই-ই কমে গিয়েছে সিপিএমের। আসনসংখ্যার বিচারে পশ্চিমবঙ্গে তৃতীয় স্থানে চলে গিয়েছে দল। অর্থাৎ ভোটে ভাল ফল করার আশায় পার্টি কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত বিসর্জন দেওয়া হয়েছে। কিন্তু লাভ কিছু হয়নি, আরও সঙ্কুচিত হয়েছে জনভিত্তি। সিপিএমের শ্যামও গিয়েছে, কূলও গিয়েছে।

বাংলার সিপিএমের আশঙ্কা ছিল, এই পরিস্থিতির দায় রাজ্য নেতৃত্বের মাথায় চাপবে এবং তুমুল ঝড়ের মুখে পড়তে হবে বাংলা লবিকে। সীতারাম ইয়েচুরির নেতৃত্বাধীন পলিটব্যুরো কিন্তু দায় চাপানোর রাস্তায় হাঁটেনি। বৈঠক শেষে পলিটব্যুরোর বিবৃতিতে বাংলা সম্পর্কে যে মন্তব্য করা হয়েছে, তা যথেষ্ট নরম। বলা হয়েছে, ‘‘দলের রাজনৈতিক কৌশলের ভিত্তিতে কেন্দ্রীয় কমিটির যে সিদ্ধান্ত, তার সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গে উদ্ভুত নির্বাচনী কৌশলের কোনও সামঞ্জস্য নেই।’’ পলিটব্যুরোর বিবৃতির এই ভাষাতেই কংগ্রেস সম্পর্কে নরমপন্থী লাইনের ইঙ্গিত রয়েছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মত। পলিটব্যুরো বলছে, কংগ্রেসের সঙ্গে যে সমঝোতা, তা একটি ‘উদ্ভুত নির্বাচনী কৌশল’। অর্থাৎ এই নির্বাচনী সমঝোতা আগ বাড়িয়ে করা হয়নি, এই সমঝোতার উদ্ভব হয়েছিল। পরিস্থিতিই সমঝোতার দিকে নিয়ে গিয়েছিল। নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে পলিটব্যুরোর মন্তব্য, যা হয়ে গিয়েছে, তা অতীত। ভবিষ্যতে কংগ্রেসের হাত ধরে চলা হবে কি না, সে প্রসঙ্গে পলিটব্যুরোর দস্তাবেজ যা বলেছে, তা আরও তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমবঙ্গে তৃণমূলের বিরুদ্ধে লড়ে অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হলে সব ধর্মনিরপেক্ষ দলকে সঙ্গে নিয়েই লড়তে হবে বলে পলিটব্যুরো সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে। সেই জোট যে কংগ্রেসকে বাদ দিয়ে হবে না, তাও পলিটব্যুরোর অবস্থানে স্পষ্ট।

আরও পড়ুন:

দলে থেকেই এখন অন্য সুরে গাইতে চাইছেন দেবপ্রসাদ

সূর্যকান্ত মিশ্ররা পলিটব্যুরোর বৈঠকে জানিয়েছেন, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে বাংলায় আরও কঠিন হয়েছে বামেদের পরিস্থিতি। কারণ বাম-কংগ্রেসের জোট যে সব বুথে বা ওয়ার্ডে এগিয়ে রয়েছে, সেই সব বুথ এবং ওয়ার্ড চিহ্নিত করে বিরোধীদের উপর হামলা চালাচ্ছে তৃণমূল। আগামী পাঁচ বছরে এই সব এলাকা থেকে বিরোধীদের ঘাঁটি নিশ্চিহ্ন করে দিতে চায় বাংলার শাসক দল। এই পরিস্থিতিতে বুথে বুথে কংগ্রেসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে না লড়লে যে তৃণমূলের হামলা রোখা যাবে না, সে কথা পলিটব্যুরোকে বোঝানো গিয়েছে বলে আলিমুদ্দিন স্ট্রিট সূত্রের খবর। তাই কংগ্রেসের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার জন্য বাংলার নেতৃত্বের উপর কোনও চাপ সৃষ্টি করা হয়নি এ দিন। বরং বৈঠক শেষে সিপিএম সাধারণ সম্পাদক সীতারাম ইয়েচুরি বলেছেন, ‘‘বাংলায় বিরোধীদের উপর যে ভয়ঙ্কর সন্ত্রাস চলছে, তা রুখতে পলিটব্যুরো ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের ডাক দিচ্ছে।’’

বাংলা, অসম, কেরল ও তামিলনাড়ু রাজ্য কমিটিকে পলিটব্যুরোর নির্দেশ, নির্বাচনী ফলাফল সম্পর্কে বিশদ রিপোর্ট তৈরি করতে হবে। সেই রিপোর্ট নিয়ে আগামী ১৭ জুন পলিটব্যুরোর বৈঠকে ফের কথা হবে। তার পর ১৮ থেকে ২০ জুন সিপিএম কেন্দ্রীয় কমিটির বৈঠক। সেই বৈঠকে চার রাজ্যের নির্বাচনী ফলাফল নিয়ে বিশদে কাটাছেঁড়া হবে।