চার দিকে তাকিয়ে খুঁজলাম তেজশঙ্করকে। নেই, ত্রিসীমানায় কোথাও তিনি নেই। তেজশঙ্কর, সুপ্রিম কোর্ট নিযুক্ত পর্যবেক্ষক। প্রধান বিচারপতি বেঙ্কটচালাইয়ার নেতৃত্বাধীন ডিভিশন বেঞ্চ করসেবা সুপ্রিম কোর্টের আদেশ মেনে হচ্ছে কি না, তা দেখার দায়িত্ব তাঁকেই দিয়েছিল। কিছুক্ষণ আগেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কেমন দেখছেন? হেসে জবাব দিয়েছিলেন, ‘‘এভরিথিং ইজ ফাইন।’’ সেই কথোপকথনের ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই এই তাণ্ডব শুরু হয়েছে। আর পরিস্থিতি বুঝে কার্যত গা-ঢাকাই দিয়েছেন তেজশঙ্কর, দেশের শীর্ষ আদালতের প্রতিনিধি। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শীর্ষ আদালতের এমন অবমাননা দেখবেনই বা কী করে!

দিনটা ছিল ১৯৯২ সালের ৬ ডিসেম্বর। অকুস্থল অযোধ্যা।

গত নভেম্বরে টানা তিন দিন সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত বসেছিলাম সুপ্রিম কোর্টে। প্রধান বিচারপতির এজলাসে। সুপ্রিম কোর্টের মামলা ‘কভার’ করতে গেলে তখনও ল’গ্র্যাজুয়েট হওয়াটা বাধ্যতামূলক করা হয়নি। অযোধ্যা মামলা। এক দিকে করসেবার অনুমতি না দেওয়ার জন্য বাবরি মসজিদ অ্যাকশন কমিটির আবেদনের পক্ষে মামলা লড়ছেন প্রাক্তন আইনমন্ত্রী শান্তিভূষণ, কেন্দ্রের তরফে আছেন অ্যাটর্নি জেনারেল। অন্য দিকে উত্তরপ্রদেশ সরকারের পক্ষে সওয়াল করছেন কে কে বেণুগোপাল। আদালত কক্ষে সুপ্রিম কোর্টের তাবড় আইনজীবীর ভিড়। যত না রায় শোনার জন্য তার থেকেও বেশি শান্তিভূষণ-বেণুগোপাল দ্বৈরথ দেখার জন্য। শেষ পর্যন্ত জিতলেন বেণুগোপালই। বিতর্কিত ২.৭৭ একর এলাকার বাইরে করসেবার অনুমতি দিল ডিভিশন বেঞ্চ। একই সঙ্গে তেজশঙ্করকে পর্যবেক্ষক হিসেবে নিয়োগ করলেন প্রধান বিচারপতি। তিনি করসেবার দিন অযোধ্যায় করসেবার পুরো প্রক্রিয়া দেখবেন। রিপোর্ট দেবেন সুপ্রিম কোর্টকে।

আজ সেই ৬ ডিসেম্বর। করসেবার দিন। আর কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হবে করসেবা। গত কয়েক দিন ধরেই লক্ষ লক্ষ করসেবক জড়ো হয়েছেন অযোধ্যায়। নেতারা ঘোষণা করেছেন, সরযূ তীর থেকে মুঠি-ভর বালি নিয়েই সারিবদ্ধ ভাবে করসেবকরা এই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। বিতর্কিত কাঠামোর বাইরে, গত অক্টোবরে তৈরি কংক্রিটের চাতালে পুজোপাঠের আয়োজন সম্পূর্ণ। মাঝখানে স্বস্তিক আঁকা ঝকঝকে তামার কলসে আম্রপল্লব। চারপাশে পূজার সামগ্রী। তার চারপাশে সাধুদের বসার ব্যবস্থা। অদূরে রামকথা কুঞ্জে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের অস্থায়ী অফিস। এক তলা বাড়িটির ছাদেই তৈরি হয়েছে মঞ্চ। এখান থেকেই করসেবকদের উদ্দেশে তাঁদের বক্তব্য রাখবেন লালকৃষ্ণ আডবাণী, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের সরকার্যবাহ এইচ ভি শেষাদ্রি, কে এস সুদর্শন, মুরলীমনোহর যোশী, রাজমাতা বিজয়রাজে সিন্ধিয়া। তার আগে সকাল থেকে চলছে রাম-ভজন (অযোধ্যায় সব কিছুর আগেই ‘রাম’ শব্দটি জুড়ে দেওয়ার প্রবণতা আছে)। মাঝে মাঝে সেই গান থামিয়ে চলছে সঙ্ঘের কর্তাদের ঘোষণা। করসেবকদের উদ্দেশে সতর্কবাণী, সঙ্ঘের তথাকথিত ‘অনুশাসন’ মেনে চলার আহ্বান। অনুষ্ঠানে কোথাও কোনও ত্রুটি নেই। আবহাওয়াও চমৎকার। শীতের রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল।

১৯৯২ সালের ৭ ডিসেম্বর প্রকাশিত আনন্দবাজার পত্রিকার প্রথম পাতা।

ভোর ছ’টায় লক্ষ লক্ষ মানুষের স্রোতে কার্যত ভাসতে ভাসতেই করসেবাস্থলে এসে গিয়েছি। জরিপ করেছি চারধার। বিতর্কিত কাঠামোর ভিতরে ঢুকে দেখে এসেছি ‘তৎপর’ নিরাপত্তা রক্ষীদের। রামলালা ‘দর্শন’-ও হয়েছে। কাঠামোর মাঝের গম্বুজের নীচে (ভক্তদের ভাষায় গর্ভগৃহ, রামলালার জন্মস্থান) কড়া নিরাপত্তায় রয়েছেন রামলালা। পরিষদের তরফে বিতর্কিত কাঠামোর ঠিক উল্টো দিকে, দোতলা বাড়ি মানসকুঞ্জের তিন তলার ছাদে প্রেসের দাঁড়াবার জায়গা। পরিষদ মুখপাত্র রামশঙ্কর অগ্নিহোত্রী জানালেন, ওখান থেকে করসেবা সব থেকে ভাল দেখা যাবে বলেই তাঁরা এই ব্যবস্থা করেছেন। কী মনে হতে এড়িয়ে গেলাম ‘প্রেস গ্যালারি’। নীচেই করসেবাস্থলে ঘুরঘুর করছি। ভিড় মাপার চেষ্টা করছি। হনুমানগড়ির দিক থেকে এক একটা ঢেউ যেন এগিয়ে আসছে। মানুষের ঢেউ। গর্জন উঠছে, জয় শ্রীরাম। সেই ঢেউ আছড়ে পড়ছে করসেবাস্থলের উত্তর-পূর্ব কোণের বিশাল গেটে। সেখানে ভিড়কে নিয়ন্ত্রণ করছে খাকি হাফপ্যান্ট, সাদা গরম-গেঞ্জি পড়া সঙ্ঘের স্বেচ্ছাসেবকরা। কখনও কখনও ভিড়ের সঙ্গে হাতাহাতিও হয়ে যাচ্ছে স্বেচ্ছাসেবকদের। এর মধ্যেই কর্ণিক নিয়ে বর্ষীয়ান সাধুদের সঙ্গে ঢুকে আসা এক টিন-এজ সাধুকে কার্যত কাঁধে তুলে গেটের বাইরে ফেলে দিলেন স্বামী ধরমদাস। পহেলবান থেকে সাধু হলেও অযোধ্যার মানুষের কাছে তাঁর পরিচিতি পহেলবান হিসেবেই। তাঁরা তাঁর নামের আগে ‘স্বামী’ নয়, পহেলবান শব্দটিই ব্যবহার করেন। সেই পহেলবান টিন-এজ সাধু রঘুনন্দনকে ছুঁড়ে ভিড়ের মধ্যে ফেলতেই করসেবকদের মধ্যে থাকা ‘স্ফুলিঙ্গ’ যেন দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। মানবশৃঙ্খল তৈরি করে দাঁড়িয়ে থাকা স্বেচ্ছাসেবকদের ছিটকে ফেলে গেট ভেঙে, একই সঙ্গে সঙ্ঘের ‘অনুশাসন’-কে বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ দেখিয়ে করসেবাস্থলে ঢুকে পড়ল করসেবকদের বিশাল এক দল। জয় শ্রীরাম ধ্বনির পাশাপাশি তখন উঠছে ‘হর হর মহাদেও’ ধ্বনিও। করসেবাস্থলের চাতালে শুরু হল নাচ। বিভিন্ন তার লয়। ততক্ষণে সঙ্ঘের লাঠিধারী স্বেচ্ছাসেবকরা ধেয়ে এসেছে। খানিকটা ধ্বস্তাধ্বস্তির পর তারা বের করে দিল সেই উন্মত্ত যুবকদের। অশ্রাব্য গালাগালি দিতে দিতে বেরোল তারা। তাদের বক্তব্যের মূল কথা, রাজনীতি করা হচ্ছে তাদের নিয়ে। বার বার মন্দির তৈরির ডাক দিয়ে তাদের আনা হয়। বার বারই সমঝোতা করে নেওয়া হয়। ইতিমধ্যে রামকথা কুঞ্জের মাইকে ভেসে আসছে পরিষদ-সুপ্রিমো অশোক সিঙ্ঘলের গলা, যারা গোলমাল পাকানোর চেষ্টা করছে তারা সঙ্ঘের কেউ নয়। পিভি, ভিপি, মুলায়মের পাঠানো লোক। যড়যন্ত্র চলছে।

আরও পড়ুন: ৬ ডিসেম্বর তো রাজনৈতিক ব্যর্থতারই উদ্‌যাপন

ঘড়ির কাঁটা ইতিমধ্যে এগারটা ছুঁয়েছে। করসেবাস্থলের উত্তর-পশ্চিম কোণে, বিতর্কিত এলাকার বেড়া ঘেঁষে এক মাটির ঢিবি। তার উপরে দাঁড়িয়ে আছি। ঢিবির উপরে বসে আছেন শ্রীশচন্দ্র দীক্ষিত। উত্তরপ্রদেশের প্রাক্তন ডিজিপি, বারাণসীর বিজেপি সাংসদ। তাঁর পাশে ফৈজাবাদের ডিআইজি উমাশঙ্কর বাজপেয়ী। বিশাল প্রাচীর (এটাও রামের নামে, রাম-দিওয়ার) ঘেরা করসেবাস্থলে আবারও শান্তি। বাজপেয়ীর কথায়, ‘‘এভরিথিং আন্ডার কন্ট্রোল।’’ বারোটায় শুরু হবে আনুষ্ঠানিক করসেবা। তার প্রস্তুতি তুঙ্গে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের উপদেষ্টা পর্ষদ, সাধু-সন্তদের নিয়ে গঠিত মার্গ দর্শক মণ্ডলের সদস্যরা প্রায় সকলেই এসে আসন নিয়েছেন।

অশান্তির আঁচ এসে ছড়িয়ে পড়ল কলকাতার মেটিয়াবুরুজ চত্বরে...

পুজোপাঠের প্রস্তুতি প্রায় শেষ। ঘড়ির কাঁটাও ঘুরছে দ্রুত। হঠাৎই, পৌনে বারোটা নাগাদ আবার গোলমাল। বিতর্কিত কাঠামোর পিছন দিক থেকে করসেবকরা উঠে আসছে। গম্বুজের মাথায় চড়ে‌ বসেছে বেশ কিছু করসেবক। তা দেখে দ্বিগুণ উৎসাহে হনুমানগড়ির দিকে থাকা করসেবকরা ঝাঁপিয়ে পড়ল গেটের উপর। সব শৃঙ্খলা নিমেষে ধূলিসাৎ। জলের স্রোতের মতো ধেয়ে এল করসেবকরা। করসেবাস্থল নয়, তাদের লক্ষ্য ‘বাবরি মসজিদ’। খাকি প্যান্টের স্বেচ্ছাসেবকরা সেই স্রোতে ভেসে গিয়েছে। জনস্রোতকে রুখতে এলেন পহেলবান ধর্মদাস। ত্রিশূলধারী করসেবকদের ধাক্কায় তিনি মাটিতে। রে রে করে তাড়া করে এল করসেবকরা। গেরুয়া লুঙ্গি হাঁটুর উপর গুটিয়ে পহেলবান দৌড়লেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই স্বেচ্ছাসেবকদের ঘেরাটোপে চাতালে এসে দাঁড়ালেন অশোক সিঙ্ঘল। হাত তুলে করসেবকদের শান্ত করার চেষ্টা করলেন। কে কার কথা শোনে! ভিড়ের চাপে সিঙ্ঘলের ধুতির কাছা খুলে গিয়েছে। হতভম্ব ভাব কাটিয়ে এ বার রামকথাকুঞ্জের দিকে হাঁটা দিলেন রাম মন্দির আন্দোলনের দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতা। মাইকে তখন আডবাণী, যোশী, শেষাদ্রি, রাজমাতা, বিনয় কাটিয়াররা শান্ত থাকার কথা বলে চলেছেন। বার বার মনে করাচ্ছেন সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের কথা। আদালত অবমাননা না করার কথা। মনে করাচ্ছেন সঙ্ঘের শৃঙ্খলাপরায়ণতা, ‘অনুশাসন’-এর ঐতিহ্যের কথা।

ভিড়ের সঙ্গেই ঢুকে এসেছি বিতর্কিত কাঠামোয়। সঙ্গে সানডে মেল-এর সাংবাদিক সীতা সিদ্ধার্থ। চার দিক থেকে ভেসে আসছে ইটের টুকরো। কাঠামো পরিসর ছেড়ে যাচ্ছে নিরাপত্তা বাহিনী। এক সিআরপিএফ জওয়ান বললেন, মরে যাবে। বেরিয়ে এস। তার বেতের ঢালে মাথা বাঁচিয়ে বিতর্কিত পরিসরের বাইরে। তখন গেট ভেঙে, বেড়া ভেঙে ধেয়েই আসছে জনস্রোত। হামলে পড়েছে পাঁচশো বছরের পুরনো কাঠামোর উপরে।

আরও পড়ুন: বাবরি ধসে পড়ছে, মোমবাতির আলোয় বিষণ্ণ আডবাণী, দৃশ্যটা বড়ই প্রতীকী

ততক্ষণে বন্ধ হয়ে গিয়েছে মাইক। রামকথাকুঞ্জের নেতারা দিশাহারা। ভিড় ভেদ করে ও দিকে যাওয়ার কোনও উপায়ই নেই। পরে শুনেছিলাম, তখন মাথা চাপড়াচ্ছেন আডবাণীর বিশ্বস্ত লেফ্টেন্যান্ট প্রমোদ মহাজন, আরে ইস্যুটাই হাতছাড়া হয়ে গেল! অস্থির আডবাণী অবিরত দু’হাত ‘কচলে’ চলেছেন। বিভ্রান্ত।

সাড়ে বারোটা নাগাদ ভেঙে পড়ল প্রথম গম্বুজটি। বেলা তিনটে নাগাদ ভেঙে পড়ল দ্বিতীয় গম্বুজটিও। বাকি শুধু গর্ভগৃহের উপর, কাঠামোর মূল ও মাঝের গম্বুজটি। রামকথাকুঞ্জের মাইক আবার সচল হল। উৎকর্ণ হই। ভেসে এল উমা ভারতী, সাধ্বী ঋতম্ভরার গলা। না কোনও অনুশাসনের কথা নয়, তাঁরা তখন করসেবকদের স্রোতে গা ভাসিয়েছেন, ‘‘এক ধাক্কা অউর দো/বাবরি মসজিদ তোড় দো।’’ দ্বিগুণ উৎসাহে করসেবকরা এ বার সেই স্লোগানকেই হাতিয়ার করল। ভেঙে পড়ল মূল গম্বুজটিও। আমার ঘড়িতে ৪টে ৪৯।

বাদ গেল না পুলিশের গাড়িও...

তখন ভাবছি, সুপ্রিম কোর্টের পর্যবেক্ষক তেজশঙ্কর কী রিপোর্ট লিখছেন? পরে জেনেছিলাম, রিপোর্ট আর তাঁকে দিতে হয়নি। ততক্ষণে প্রধান বিচারপতি বেঙ্কটচালাইয়া পেয়ে গিয়েছেন বিশদ রিপোর্ট। বেণুগোপাল  প্রধান বিচারপতির এজলাসে গিয়ে ক্ষমা চেয়েছেন। জানিয়েছেন, উত্তরপ্রদেশের কল্যাণ সিংহ সরকারের আশ্বাসবাণীকে তিনি ‘বিশ্বাস’ করেছিলেন। বলতে ভুলে গিয়েছি, তিনিই এখন আমাদের দেশের অ্যাটর্নি-জেনারেল।

সম্প্রতি সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে, কর্নাটকের উদুপিতে বিশ্ব হিন্দু পরিষদের ধর্ম সংসদের বৈঠকে ঠিক হয়েছে ২০১৮ সালের ১৮ অক্টোবর অযোধ্যায় মন্দির নির্মাণ শুরু করবেন তাঁরা। তা নিয়ে দেশ জুড়ে নানা সমালোচনা। অযোধ্যা নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে চূড়ান্ত শুনানি শুরুর দিন কয়েক আগে এমন ঘোষণার অর্থ কী? এ তো ‘অবমাননা’-রই নামান্তর। এই ঘোষণা তো নতুন নয়, একটার পর একটা নির্বাচন এসেছে, তার আগে রাম মন্দির নির্মাণের ‘দিন’ ঘোষণা হয়েছে। এ বারেও তো লক্ষ্য-২০১৯।

আর সুপ্রিম কোর্টের অবমাননা! ২৫ বছর আগে চূড়ান্ত অবমাননা তো হয়েই ছিল অযোধ্যার মাটিতে। নতুন করে আর কী হবে!