Demolition of the Babri Masjid
Demolition of the Babri Masjid
পঁচিশ বছর আগের এক দিন
বিতর্কিত সৌধের বাধা ভেঙে খান খান। ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ থেকে।
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

পঁচিশ বছর আগের এক রবিবার। ডাউন শান্তিতে, মানে শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসে ফিরছি। ফাঁকাই বলা যায়। সবাই জানলার ধারে সিট খোঁজায় ব্যস্ত। পিচকুড়ি আসার আগে কেউ কেউ ভাতঘুমে ঢুকে যাবে। অনেকেরই হাতে খবরের কাগজ। মাঠ-ঘাট পেরিয়ে প্রাগৈতিহাসিক অজয় কয়েক কোটি বছর ধরে বইছে। শীতের স্রোতে মাছরাঙা। ধানকাটা শেষের দিকে। দু-একটা আলুখেত সবুজ হতে শুরু করেছে। সবই স্বাভাবিক। তারই মধ্যে ট্রেনের ভেতরটা কী রকম যেন থমথমে। অযোধ্যায় পৌঁছে গেছে হাজার হাজার করসেবক। কী হয়, কী হয়। বর্ধমান পেরিয়ে চেনা বাদামওলা। কিনি। আসে কফি। ডানকুনি ঢুকতে আধ ঘণ্টা লেট। মানে অফিসে পৌঁছতে যাকে বলে দেরিই। এই দেরির উদ্বেগে হাওড়া স্টেশনের সে দিনের চেহারাটা দেখা হয়নি। তারিখটা ছিল ৬ ডিসেম্বর। ১৯৯২ সাল।

বাস ঠেঙিয়ে অফিসে ঢুকব, গেটে পায়চারি করছিল এক সহকর্মী। হাতে সিগারেট। তার শরীর জুড়ে অচেনা অস্থিরতা দেখে জানতে চাই, কী হয়েছে। শোনা মাত্র অরুণ আমার মুখোমুখি ফেটে পড়ে। আর্তনাদ করার মতো সে বলে, জানেন না, বাবরি মসজিদ ওরা ভেঙে দিয়েছে?

কী হয়েছিল সে দিন? অতি-উৎসাহী এক করসেবক— কাঁচা বয়স— আচমকা ভিড় থেকে ছিটকে গিয়ে পাঁচিল টপকে ঢুকে পড়েন নিষিদ্ধ এলাকায়। তার পর গোটা কয়েক লাফ মেরে উঁচু গম্বুজটার একেবারে ওপরে। নিমেষে হাজারো জনতার ভিড় বুঝে যায়, এটা করে ফেলা সম্ভব। সঙ্গে সঙ্গে পিলপিল করে উঠতে থাকে করসেবকের দল। লক্ষ্য শীর্ষদেশ, লক্ষ্য ছিল গম্বুজ— ভেঙে ফ্যালো।

১৪০১ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁর তাতার সৈন্যরা যখন দামাস্কাস গুঁড়িয়ে দিচ্ছে, এক সমাধিসৌধের গম্বুজ— আদল অযোধ্যার মতোই কিছুটা— দেখে মুগ্ধ হয়েছিলেন আমির তৈমুর গুরিগান, দুনিয়া জুড়ে যিনি তৈমুর লঙ্গ নামে কুখ্যাত। ভেঙে ফেলবার আগে সঙ্গের চিত্রকরকে নির্দেশ দেন ওই গম্বুজের একটা নকসা দ্রুত এঁকে নিতে। সমরখন্দে ফিরে অতিকায় মসজিদ তৈরির সময় গম্বুজের ওই আদলটিকে আরও অপরূপ করে তোলেন তিনি। তাঁর প্রধান বেগম বিবি খানুমের মসজিদে আজও শোভা পাচ্ছে তেমনই একটি গম্বুজ, ছুঁচলো-শীর্ষ, সবুজ পাথরে মোড়া। গোটা ট্রান্স-অক্সিয়ানা জুড়ে গম্বুজটি জনপ্রিয় হতে হতে উত্তরে মস্কো, সেন্ট পিটার্সবার্গ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। ১৫২৬-এ ইব্রাহিম লোদিকে যুদ্ধে হারিয়ে তৈমুরের অধস্তন ষষ্ঠ পুরুষ জহিরউদ্দিন মহম্মদ বাবর যখন দিল্লি-আগ্রার দখল নেন, তাঁর এবং সঙ্গীদের মাথায় তত দিনে গেড়ে বসেছে দুনিয়ার একদা-সেরা শহর সমরখন্দের ছবি, তার নির্ভার অথচ রাজকীয় স্থাপত্যগুলি। তার ওই গম্বুজ। এবং নানা স্থাপত্যের শোভাবর্ধন করে পূর্ব-বিশ্বে গম্বুজটির সেরা অবস্থান শেষ পর্যন্ত তাজমহলের শীর্ষদেশে।

লক্ষ্য স্থির। অযোধ্যা ৬ ডিসেম্বর ১৯৯২।

স্থাপত্য অনড়। নিজের জায়গা ছেড়ে অন্যত্র যেতে পারে না। যায় তার আদল, নির্মাণকৌশল। যায় জ্ঞান। আর, সেই জ্ঞান শুধু স্থাপত্যের নয়, মানবসভ্যতার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। যে-পাঁচিল সে দিনের তরুণ করসেবকটি আবেগের চাপে টপকেছিলেন, সেটি ছিল আসলে ওই জ্ঞানপরিখা। গোটা দেশ এত দিন নিজের মতো করে এক রকম চলছিল— খেয়ে, না-খেয়ে, তর্কে, বিবাদে, মিলেমিশে, ঝগড়ায়, হেসে-কেঁদে, চাপা এবং বহুবিধ সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষে। এক ঝটকায় তিনি সে দিন জ্ঞাননির্ভর বিশ্বাসে দীর্ঘস্থায়ী (নাকি চিরস্থায়ী?) ভেদরেখা টেনে দিলেন। ইতিহাসে এটি প্রথম নয়। কিন্তু, আধুনিক কালে, আবরণ উন্মোচণের ক্ষেত্রে— আমাদের দেশে— হয়তো-বা প্রথম।

কেন এত কথা? শ’দুয়েক বছরের বিতর্কের পর সে দিন একটি মসজিদ ভাঙা হয়েছিল। মসজিদ কি এর আগে ভাঙা হয়নি? বহু বার হয়েছে। তৈমুরই ভেঙেছেন বহু মসজিদ। এবং সংখ্যায় অন্য ধর্মস্থানের থেকে বেশিই। তবে তিনি শুধু ধর্মস্থান নয়, অতীতের সব দিগ্বিজয়ী বীরের মতো পরাজিত দলের সমস্ত কিছুই গুঁড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন। ধর্মপরিচয় তাঁর কাছে ছিল গৌণ। আর, এ ক্ষেত্রে? এক উপাসনাস্থলকে নতুন করে প্রতিষ্ঠা দিতে আর এক উপাসনাস্থল গুঁড়িয়ে দেওয়া হল। উপাস্য হয়ে গেলেন গৌণ। উপাসকই এখানে শক্তিমান।

চিরকাল এমনটাই হয়েছে। গোষ্ঠী, ধর্ম, সম্প্রদায়, জাতি, দেশ, লিঙ্গ বরাবরই মানুষকে লেলিয়ে দিয়েছে মানুষের বিরুদ্ধে।

যাঁর নামে মসজিদটি ছিল, সেই বাবর ছিলেন কবিও। সুশিক্ষিত। সুরসিক। মোগল সাম্রাজ্যের পত্তন না-করলেও অমর হয়ে থাকত তুর্কি ভাষায় লেখা তাঁর আত্মজীবনী তুজুক-ই-বাবুর। এ-হেন চাঘতাই তুর্কি রাজা যুদ্ধে হিন্দুস্তানের সুলতান ইব্রাহিম লোদিকে পরাজিত এবং নিহত করার পর আগ্রায় পা দিলেন, লোদি-সখা গোয়ালিয়রের রাজবংশকে অধীনস্থ মিত্র হতে বাধ্য করলেন, তবু গাজি উপাধি নিলেন না। নামের সঙ্গে উপাধিটি জুড়েছিলেন প্রতিস্পর্ধী রানা সঙ্গকে নিকেশ করার পর। লোদির তুলনায় ক্ষুদ্র শক্তিসম্পন্ন হলেও রানা তখন বাবরের কাছে একটা প্রতীক।

বাবরি ধূলিসাৎ। 

তেমনই প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছিল— এবং চূর্ণ হওয়ার পঁচিশ বছর পরও রয়ে গেছে- বাবরি মসজিদ। সর্বনাশের হেতু এটাই।

ব্যক্তির কাছে ব্যক্তি প্রতীক হলে যতটা, কোনও সম্প্রদায়ের কাছে কোনও ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা স্থাপত্য বা ধর্মস্থান প্রতীক হলে তার ব্যাপ্তি বহু গুণ বেশি।

বাবরি মসজিদ ভাঙার পরপরই সারা দেশে দাঙ্গা বেধে যায়। সে-দাঙ্গা হয়েছিল দাঙ্গারই নিয়মে। অঞ্চলভেদে। কোথাও বেশি, কোথাও-বা কম। দেশের অধিকাংশ এলাকা ছিল শান্তিপূর্ণ। উত্তর দিনাজপুর জেলার প্রত্যন্ত গ্রাম চাপড়ার এক শীর্ণকায় মানুষ তাঁর আলুখেতে বসেছিলেন ১৯৯৩-এর জানুয়ারিতে। তখন দুপুর। মিশ্র এলাকা। পাশে বাংলাদেশের সীমান্ত। এলাকার পরিস্থিতি কেমন, জানতে চাইলে ঘন কুয়াশার ভেতর থেকে উত্তর এসেছিল— এখানে ও সব কিছুই নেই। কলকাতায় যান। সেখানে দাঙ্গা হয়েছে।

অথচ, ওই জেলা থেকেও অযোধ্যায় ‘রামশিলা’ গিয়েছিল! হতে পারে সেটা হুজুগ, হতে পারে সত্যিকারের করসেবক ছিল তারা। হলেও সংখ্যায় ছিল অতি অল্প, হাজার বছরের থিতিয়ে-থাকা বাঙালি-সমাজে বিচ্ছিন্ন। কিন্তু আজ?

পঁচিশ বছরে বাবরি মসজিদ চূর্ণ হওয়া সুরকির গুঁড়ো হাওয়ায় উড়ে উড়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এমনকী প্রতিবেশী দেশগুলোতেও। এই বাংলার হাওয়াতেও তার অস্তিত্ব আজ প্রকট। হিন্দু-মুসলমান দুই সম্প্রদায়েরই নাকে ঢুকছে ওই সুরকির গুঁড়ো। সংখ্যায় প্রবল, তাই একদল ক্ষমতাবান। অন্য দল বেছে নিচ্ছে নীরবতা বা গুপ্ত পন্থা।

কে এদের মুখোমুখি বসাবে? এক সুরে আর কথায় গাইতে বলবে গান, যে-গান জাতিধর্ম নির্বিশেষে সবাই গাইতে পারবে? তেমন গান কি বাছতে পারব আমরা? এমনকী কোনও সহজিয়া সাধকের ভগবান বা খোদাও তো দিতে পারবে না সেই গান। ‘ঈশ্বর আল্লা তেরে নাম/সবকো সহমতি দে ভগবান’ গাইলে তো ‘জলের উপর পানি না পানির উপর জল,/বল খোদা, বল খোদা, বল’ ধরনের গান আসবেই!

তাই মানুষের গান চাই। তেমন গান কি গাইতে পারব আমরা? শুনতেও কি পাব?    

মৃত্যুর আগে স্বর্গে-বিশ্বাসী, শ্রবণশক্তিহীন, বিঠোফেনের শেষ উক্তি ছিল, ‘আই শ্যাল হিয়ার ইন হেভেন।’

কিন্তু আমাদের, যাদের স্বর্গ নেই?

(লেখক পরিচিতি: একরাম আলি কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক। দীর্ঘ দিন ধরে তাঁর কলম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও মানবধর্মের কথা বলে আসছে।)

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন