দ্বিতীয়বারের জন্য ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টারের (এনপিআর) নবীকরণের প্রস্তুতি শুরু করল কেন্দ্রীয় সরকার। এই প্রক্রিয়ায় ২০২০ সালের ১ এপ্রিল থেকে ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে দেশে বসবাসকারীদের তথ্য সংগ্রহ করা হবে। প্রতিটি রাজ্যকে তা জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।

নাগরিকত্ব আইনের আওতায় ২০০৩ সালে ন্যাশনাল পপুলেশন রেজিস্টার (এনপিআর) তৈরির প্রস্তাব নিয়েছিল কেন্দ্র। ২০১১ সালে জনগণনার চূড়ান্ত তালিকা তৈরির সময়ে এনপিআর-এর জন্যও তথ্য সংগ্রহ করা হয়। ২০১৫ সালে সেই প্রক্রিয়ার নবীকরণ হয়। যদিও প্রশাসনিক সূত্রের খবর, নবীকরণের পর খসড়া তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি। কিন্তু চলতি বছরে আবার নবীকরণের প্রস্তুতি শুরু হওয়ায় জল্পনা শুরু প্রশাসনের অন্দরেই।

প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, দেশে কত জন বসবাস করছেন, জনগণনায় সেই তথ্য সংগ্রহ করা হয়। এনপিআর-এও কমবেশি সেই তথ্যই নেওয়া  হয়। তবে এনপিআর-এর মাধ্যমে আগামী দিনে প্রকৃত নাগরিকদের চিহ্নিত করতে পারে কেন্দ্র। কারণ, নাগরিকত্ব আইনের আওতায় ২০০৩ সালের ‘সিটিজেনশিপ (রেজিস্ট্রেশন অব সিটিজেনস অ্যান্ড ইসু অব ন্যাশনাল আইডেন্টিটি কার্ড) রুল’ অনুযায়ী, এনপিআর প্রক্রিয়ায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবারের সদস্যদের সম্পর্কে যে তথ্য সংগ্রহ করা হবে, তা সঠিক কি না বুঝতে নথি যাচাইয়ের ব্যবস্থাও রয়েছে। বিধি অনুযায়ী, এনপিআর প্রক্রিয়ায় দাখিল করা তথ্যের সঙ্গে নথির মিল না থাকলে স্থানীয় রেজিস্ট্রারের কাছে নির্দিষ্ট বয়ানে তার ব্যাখ্যা দেওয়ার বিধানও রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম মূল রেজিস্টারে উঠবে কি না, তা নির্ভর করবে সেই প্রক্রিয়ার উপর। তবে খসড়া তালিকা প্রকাশের পরই তা শুরু করা যাবে। এবং তখনই নিজেদের অভিযোগ-আপত্তির কথাও জানানোর সুযোগ থাকবে।

এনপিআর-এর তথ্য

• ব্যক্তির নাম
• বাড়ির অথবা পরিবারের প্রধানের সঙ্গে সম্পর্ক 
• মা-বাবার নাম
• বিবাহিত কি বিবাহিত নয়
• বিবাহিত হলে স্বামী অথবা স্ত্রীর নাম
• লিঙ্গ
• জন্মতারিখ
• জন্মস্থান
• নাগরিকত্ব (যা ঘোষিত)
• বাসিন্দার বর্তমান ঠিকানা
• ঠিকানায় বসবাস কত দিন ধরে
• স্থায়ী বসবাসের ঠিকানা
• জীবিকা অথবা কাজকর্ম
• শিক্ষাগত যোগ্যতা

সূত্র: ‘অফিস অব দ্য রেজিস্ট্রার জেনারেল অ্যান্ড সেন্সাস কমিশনার, ইন্ডিয়া’-এর ওয়েবসাইট

বিধি অনুযায়ী, মূল রেজিস্টার তৈরি হয়ে গেলে জন্ম এবং মৃত্যুর তথ্য সেখানে জানানোর কথা। সে ক্ষেত্রে এক দিকে যেমন সদ্যোজাতের নাম অন্তর্ভুক্ত হবে রেজিস্টারে, তেমনই বাদ যাবে মৃত নাগরিকের নাম। এখন আধারে সদ্যোজাতের নাম নথিভুক্ত হলেও সেই তালিকা থেকে মৃতের নাম বাদ যাচ্ছে না। এক বিশেষজ্ঞের কথায়, ‘‘দেশের মোট জনসংখ্যা এবং তার বৈশিষ্ট্য বোঝা যায় জনগণনার মাধ্যমে। কিন্তু কেন্দ্র চাইলে এনপিআর-এর মাধ্যমে প্রকৃত নাগরিকদের তালিকা তৈরি
করা সম্ভব। কত জন প্রকৃত নাগরিক, কত জন বিদেশি বৈধ ভাবে দীর্ঘদিন এ দেশে রয়েছেন, কত জনের উপস্থিতি অবৈধ—এই বিশ্লেষণ করতেই
পারে কেন্দ্র।’’

আধার কার্ড নাগরিকত্বের প্রমাণ নয়। প্রশাসনের একটি অংশের ধারণা, আগামিদিনে এনপিআর-এ ব্যক্তির তথ্যের সঙ্গে তাঁর আধার সংযুক্ত করে দিতে পারে কেন্দ্র। যে হেতু আধার নম্বর ‘ইউনিক’, তাই রেজিস্টারে থাকা ব্যক্তির তথ্যের নকল সম্ভব হবে না। আধারে দেওয়া বায়োমেট্রিক তথ্যও রেজিস্টারে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির তথ্যের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে। এক আধিকারিকের কথায়, ‘‘অবৈধ ভাবে দেশে যাতে কেউ বসবাস না করতে পারে, তার জন্য প্রকৃত নথি সংগ্রহে রাখা জরুরি। হয়তো তেমন পরিকল্পনা চলছে। ভবিষ্যতে নাগরিকত্ব আইন সংশোধিত হলে এনপিআর-এর প্রকৃত উদ্দেশ্য স্পষ্ট হতে পারে।’’

অসমে জাতীয় নাগরিকপঞ্জির (এনআরসি) কাজ চলছে। এনপিআর-প্রক্রিয়ার সূত্র ধরে অন্য কোথাও এনআরসি চালু হবে কি না, তা নিয়েও জল্পনা চলছে বিভিন্ন মহলে। তবে সরকারি আধিকারিকদের একাংশের ব্যাখ্যা, দু’টি প্রক্রিয়ায় ফারাক রয়েছে। অসমের এনআরসি-তে নাগরিকত্বের মাপকাঠি হচ্ছে ১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ। কিন্তু এনপিআর-এ আগামী বছর নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ভারতে বসবাসকারীদের তথ্য নেওয়া হবে।