• শঙ্খদীপ দাস ও দিগন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ব্যপম নিয়ে চাপ বাড়াচ্ছে কংগ্রেস, বিজেপি যেন দিশাহারা

1

ঠ্যালায় পড়লে কী না হয়!

অবশেষে ‘ব্যাকরণ বই’ তাকে তুলে দিতে বাধ্য হল বিজেপি! ব্যপম কেলেঙ্কারিতে অনন্ত চাপের মুখে পড়ে সিবিআই তদন্তের দাবি আজ মেনে নিলেন মধ্যপ্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহান।

অথচ গতকালও ভোপালে তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে দেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহ বলেছিলেন, ‘‘তদন্তটি উচ্চ আদালতের বিচারাধীন। আদালত চাইলে তবেই সিবিআই তদন্ত হতে পারে। নইলে সম্ভব নয়।’’ কিন্তু রাজনাথ নয়, আজ ডিগবাজি খেলেন খোদ শিবরাজ!’’ আদালত কিছু বলার আগেই শিবরাজ জানালেন, তিনি নিজে উচ্চ আদালতের কাছে সিবিআই তদন্তের জন্য আর্জি জানাবেন। যাতে আদালত তদন্তটির দায়ভার এ বার সিবিআইয়ের উপর ছেড়ে দেয়।

কেন এই ভোলবদল? রাজনীতিকরা মনে করছেন, নেপথ্যে দু’টি কারণ থাকতে পারে। এক, ব্যপম কাণ্ডে এখনও মরণযাত্রা অব্যহত। গত কাল এক নবীশ মহিলা সাব ইনস্পেক্টরের লাশ মিলেছিল ঝিলের জলে। পরে এই কেলেঙ্কারিতে অভিযুক্ত এক পুলিশ কনস্টেবলের ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয় টিকমগড়ের এক অতিথিশালা থেকে। তাতে বিরোধীদের চাপ আরও বাড়ে। দুই, ব্যপম কাণ্ডে সিবিআই তদন্তে চেয়ে যে মামলা করেছিলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী দিগ্বিজয় সিংহ, তা পরশু শুনতে রাজি হয়ে গিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। ইউপিএ জমানায় জনমতের প্রভাবে সুপ্রিম কোর্ট অনেক তদন্তের নির্দেশ দিয়েছিল। হতে পারে সর্বোচ্চ আদালতের তরফে তেমনই কোনও রায় ঘোষণার আঁচ করে সিবিআই তদন্তের কথা আগেভাগে ঘোষণা করে দিলেন মুখ্যমন্ত্রী। যাতে নৈতিক ভাবে তিনি উচ্চস্থানে থাকতে পারেন। শিবরাজ নিজেও আজ বলেছেন, ‘‘টাস্ক ফোর্স যে তদন্ত করছে তা সন্তোষজনক। কিন্তু মানুষের ভাবাবেগের কথা বুঝেই উচ্চ আদালতে আবেদন করতে চলেছি।’’

তবে উচ্চস্থান পরের কথা, মুখ্যমন্ত্রীর আসন থেকে শিবরাজের অপসারণ চেয়ে এখনও অনড় বিরোধীরা। জাতীয় ও রাজ্যস্তরে বিজেপি-র বিরুদ্ধে সম্প্রতি দুর্নীতির যে অভিযোগ-মালা উঠে এসেছে, তাতে আজ প্রথম ঢোক গিলতে দেখা গেল তাঁদের। উল্টো দিক থেকে দেখলে, এটা কংগ্রেস তথা বিরোধীদের সাফল্যও বটে। কিন্তু রাজনীতিতে শাসক দল একটু ছাড়লে বিরোধীরা তিন গুণ দাবি করেন। সেটাই দস্তুর। যেমন স্পেকট্রাম কেলেঙ্কারিতে টেলিকম মন্ত্রক থেকে এ রাজার ইস্তফার পর বিজেপি সঙ্গে সঙ্গে যৌথ সংসদীয় তদন্ত কমিটি গঠনের দাবিতে সংসদ অচল করেছিল। কংগ্রেস আজ ঠিক সেটাই করেছে। দিগ্বিজয় বলেন, ‘‘শিবরাজের শুভবুদ্ধি জেগেছে, ভাল কথা। কিন্তু হাইকোর্ট নয়, সুপ্রিম কোর্টে চিঠি লিখে সিবিআই তদন্ত চাক মধ্যপ্রদেশ সরকার। সেই তদন্ত সুপ্রিম কোর্টের নজরদারিতে হোক। স্পেকট্রাম তদন্তের মতো প্রতি সপ্তাহে তদন্তের অগ্রগতি খতিয়ে দেখুক সর্বোচ্চ আদালত।’’

আবার রাজ্যের কংগ্রেস নেতা জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়া বলেন, ‘‘শিবরাজ সিংহের ব্যক্তিগত সচিব থেকে শুরু করে রাজ্যস্তরে তাঁর ঘনিষ্ঠ বিজেপি এবং আরএসএসের বহু নেতা ব্যপম কেলেঙ্কারিতে জড়িত। তাই শিবরাজের ভূমিকারও তদন্ত করতে হবে। এবং তা নিরপেক্ষ তখনই হবে, যখন শিবরাজ মুখ্যমন্ত্রী পদে থাকবেন না।’’ কৌশলে বিজেপি-র অন্দরের কোন্দলও শিবরাজকে সরাতে ব্যবহার করতে চাইছে কংগ্রেস।

সার্বিক এই প্রেক্ষাপটে পরশু সুপ্রিম কোর্ট কী রায় বা পর্যবেক্ষণ দিতে চলেছে তা তাৎপর্যপূর্ণ। তবে আকবর রোড সূত্র জানাচ্ছে, শুধু আইনের দিকে হাপিত্যেশ করে চেয়ে থাকবে না কংগ্রেস। দলের নেতারা মনে করছেন, অনেক দিন পর এ বার বিজেপি-কে বাগে পেয়েছেন তাঁরা। কেবল ব্যপম কাণ্ড তো নয়, ললিত কাণ্ডে সুষমা-বসুন্ধরা আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে গিয়েছেন। মহারাষ্ট্রে দুই মন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুর্নীতির প্রমাণ মিলেছে। ছত্তীসগড়েও ৩৬ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে মুখ্যমন্ত্রী রমন সিংহের বিরুদ্ধে। সংসদে এঁদের সবার ইস্তফা চেয়ে গোল বাঁধাতে এখন থেকেই দম নিতে শুরু করেছেন কংগ্রেস সাংসদরা। আবার বিজেপি শাসিত এই রাজ্যগুলিতে এ বার সফর শুরু করতে চলেছেন রাহুল গাঁধীও। প্রাথমিক লক্ষ্য হল, সংসদের বাদল অধিবেশনের আগে আবহ রচনা করা। কিন্তু তাঁর বৃহত্তর লক্ষ, বিজেপি যে আগাপাশতলা দুর্নীতিগ্রস্ত একটা দল এবং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে নরেন্দ্র মোদীর যাবতীয় দাবি যে ফাঁপা বক্তৃতা মাত্র, সেই বার্তা মানুষের মনে গেঁথে দেওয়া। জমি আইন সংশোধনের বিরোধিতা করে ঠিক যে ভাবে ‘স্যুট বুটের সরকার’ বলে মোদীকে বিদ্ধ করেছিলেন তিনি, এ বার তারই দ্বিতীয় সংস্করণ বাজারে ছাড়তে চান রাহুল।

মজার ব্যাপার হল, কংগ্রেস যখন এ ভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন বিপদকালে বুদ্ধিনাশের দশা যেন গ্রাস করছে বিজেপি-কে। ব্যপম কাণ্ডের স্পর্শকাতরতার কথাটি বেমালুম ভুলে গিয়ে গতকাল বেফাঁস এক মন্তব্য করেছিলেন বিজেপি-র মধ্যপ্রদেশের নেতা কৈলাশ বিজয়বর্গীয়। আজ আবার কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী সদানন্দ গৌড়া বিতর্কিত মন্তব্য করেন। ব্যপম-সহ বিবিধ দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে বিরোধীরা যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিবৃতি দাবি করছেন, তখন গৌড়া আজ বলেন, ‘‘সব তুচ্ছ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি দেওয়ার কোনও প্রয়োজন নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের মন্ত্রীরা বা বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ-র মন্তব্যই যথেষ্ট।’’ ব্যাপারটা অস্বস্তিকর হয়ে উঠছে দেখে কোনও সময় না নিয়ে বিজেপি-র তরফে বলা হয়, উনি ললিত মোদী প্রসঙ্গে এই মন্তব্য করেছেন, ব্যপম নিয়ে নয়। কিন্তু দুর্দিনে এ সব ব্যাখ্যা কে-ই বা শুনেছে!

তবে রাজনীতির এই সাত-

সতেরোর উর্ধ্বে ব্যপম তদন্তের ভবিষ্যৎ নিয়ে মৌলিক প্রশ্নটা রয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত সিবিআই তদন্ত হবে কি! সবটাই এখন আদালতের নির্দেশের উপর নির্ভর করছে। মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্ট।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন