ঊনপঞ্চাশ পবনের তিনটি আপাতত মহাবিপদে ফেলে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ-সহ ছ’টি রাজ্যকে। দু’টি সাগরে দু’টি ঘূর্ণিঝড়। আর কাশ্মীরের পাহাড়ে তীব্র পশ্চিমি ঝঞ্ঝা। বায়ুপ্রবাহের এই ত্র্যহস্পর্শে ছয় রাজ্যে জারি হয়েছে চূড়ান্ত সতর্কতা। চরম সতর্কতা জারি হয়েছে পড়শি বাংলাদেশেও।

উৎসবের মরসুম কাটতে না-কাটতেই বাংলার আকাশে ঘন কালো মেঘ। ঘন মেঘ ওড়িশা, মহারাষ্ট্র, গুজরাতের আকাশেও। অন্য এক ধরনের মেঘের চাদরে ঢাকা পড়েছে কাশ্মীরের সবুজ গালিচা, হিমাচলও। মাটির কাছাকাছি থাকা মেঘ বরফকণা হয়ে নেমে আসছে। তুষারপাতে উত্তরের পার্বত্যাঞ্চলে যখন জনজীবন বিপর্যস্ত, পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা, মহারাষ্ট্র, গুজরাতের আতঙ্কিত চোখ তখন দুই সাগরের দু’টি ঘূর্ণিঝড়ের দিকে।

আরব সাগরের ঘূর্ণিঝড় ‘মহা’র শক্তি কমতে শুরু করলেও বঙ্গোপসাগরের ‘বুলবুল’ ক্রমশ শক্তি বাড়াচ্ছে। পশ্চিমি ঝঞ্ঝা ক্রমশই বুলবুলকে পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ উপকূলের দিকে ঠেলছে বলে জানান ভারতীয় আবহবিজ্ঞান মন্ত্রকের আবহবিদেরা। শুক্রবার দুপুরে অতিপ্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে বুলবলের অবস্থান ছিল সাগরদ্বীপের ৫৩০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে। আজ, শনিবার বিকেল ও মাঝরাতের মধ্যে সাগরদ্বীপ বা সংলগ্ন বাংলাদেশ দিয়ে স্থলভূমিতে ঢুকতে পারে সে।

দিল্লির মৌসমের ভবনের ঘূর্ণিঝড় বিভাগের আবহবিদদের মতে, এই সময়ে আরব সাগর ও বঙ্গোপসাগরে ঘনঘন ঘূর্ণিঝড়ের জন্ম হয়। দুই সাগরে একসঙ্গে একই সময়ে দু’টি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। গত বছরেও এই সময় দুই সাগরে একসঙ্গে দু’টি ঘূর্ণিঝড় তৈরি হয়েছিল। তবে এ বার বঙ্গোপসাগরের ঘূর্ণিঝড়টি উৎপত্তিগত ভাবে কিছুটা আলাদা, তাই আলাদা তার চরিত্রও। সেই স্বাতন্ত্র্যের দরুন পূর্বাভাস দিতে কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তবে মহা থেকে ব্যাপক কোনও দুর্যোগের কারণ দেখছেন না আবহবিদেরা। তাঁদের মতে, সে শক্তি হারাতে শুরু করেছে। তবে মহারাষ্ট্র ও গুজরাত উপকূলে লাল বিপদ-সঙ্কেত বলবৎ আছে। ওই দুই রাজ্যে ব্যাপক বৃষ্টিরও পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

আরও পড়ুন: ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে এগোচ্ছে বুলবুল, কলকাতায় ৬০ কিমি বেগে ঝোড়ো হাওয়ার সতর্কতা

মহা-র ঠিক বিপরীত অবস্থান বুলবুলের। কলকাতা বিমানবন্দরের আবহাওয়া অফিসের প্রধান গোকুলচন্দ্র দেবনাথের বিশ্লেষণ, ‘‘মহা-র জন্ম আরব সাগরে, বুলবুলের জন্ম চিন সাগরে তৈরি হওয়া একটি নিম্নচাপের ভেঙে আসা অংশ থেকে। ওই অংশটি আন্দামান সাগরে এসে শক্তি বাড়িয়েছে। মধ্য বঙ্গোপসাগরে এসে সে পরিণত হয়েছে ঘূর্ণিঝড়ে। তাই তার চরিত্র কিছুটা আলাদা।’’

ঠিক কোথায় স্বাতন্ত্র্য বুলবুলের?

গোকুলবাবু বলেন, ‘‘এটি ঘনঘন দিক পরিবর্তন করছে। স্থান বদলও করছে দ্রুত। সাধারণত কোনও ঘূর্ণিঝড় কোথাও স্থির হয়ে থাকলেই তার শক্তি বাড়ে। কিন্তু বুলবুল যেমন দ্রুত এগোচ্ছে, তেমনই তার শক্তিও বাড়ছে।’’ শনিবার রাতেই সাগরদ্বীপ ও বাংলাদেশের মাঝামাঝি কোনও এলাকা দিয়ে বুলবুল চলে আসতে পারে স্থলভূমির একেবারে কাছে। আবহবিদেরা বলছেন, অন্য ঘূর্ণিঝড়ের মতো উপকূলের কাছাকাছি এসে বুলবুল কিন্তু স্থলভূমিতে ঢুকে পড়বে না। সে উপকূল বরাবর বেশ কিছুটা এগিয়ে যাবে। তার পরে শক্তি হারিয়ে ঢুকিয়ে পড়বে স্থলভূমির অনেকটা ভিতরে। তাই বাংলাদেশেই বেশি ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা প্রবল।

বুলবুলের অভিমুখ প্রথমে কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের দিকে ছিল না। প্রবল ঘূর্ণিঝড় হিসেবে অন্ধ্র উপকূলে আছড়ে পড়ার কথা ছিল তার। কাশ্মীর থেকে আসা তীব্র পশ্চিমি ঝঞ্ঝার চাপেই পথ বদলে সে ওড়িশা-পশ্চিমবঙ্গের উপকূলের দিকে সরে এসেছে বলে জানান গোকুলবাবু। আবহবিদেরা জানাচ্ছেন, বুলবুল না-থাকলে ওই ঝঞ্ঝার প্রভাবে তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই হয়তো অনেকটা নেমে যেত। বুলবুলের প্রভাবে পূর্ব ভারতে ঢুকে পড়েছে মেঘ। সেই মেঘ পশ্চিমি ঝঞ্ঝার সামনে প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই ঝঞ্ঝা ফিরে যাচ্ছে উত্তর ভারতের পাহাড়ি এলাকার দিকে। সেখানকার পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। আবহবিদেরা জানাচ্ছেন, বুলবুল চলে গেলেই পূর্ব ভারতের আকাশ পরিষ্কার হয়ে যাবে। সেই মেঘমুক্ত আকাশে বিনা বাধায় ঢুকে পড় পশ্চিমি ঝঞ্ঝা। উত্তুরে হাওয়ায় কমতে শুরু করবে গাঙ্গেয় পশ্চিমবঙ্গের তাপমাত্রাও।

পশ্চিমি ঝঞ্ঝা শীতের দূত!