অরুণ জেটলি ভরসা দিচ্ছেন, খুব বেশি হলে মাস ছয়েক। কিন্তু শিল্পমহলের ভয়, আরও বেশি।

পুরনো নোট বাতিলের ফলে চাষআবাদ, ছোট বা মাঝারি শিল্প থেকে শুরু করে রোজকার কেনাবেচা, সব জায়গাতেই ধাক্কা লেগেছে। অরুণ জেটলি দাবি করছেন, এই ধাক্কা সাময়িক। ছয় মাসের মধ্যেই পরিস্থিতি বদলে যাবে। বাজারে নগদের পরিমাণ কমলেও অর্থনীতির বহর বাড়বে। কিন্তু শিল্পমহল থেকে শুরু করে অর্থনীতিবিদদের বড় অংশই মনে করছেন, নোট বাতিলের ধাক্কা কাটিয়ে উঠতে আরও সময় লাগবে। মোদী সরকারের আশা ছিল, চলতি অর্থ বছরে বৃদ্ধির হার ৮ শতাংশ ছোঁবে। সেই বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশের নীচে চলে যেতে পারে বলে এখন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আজ প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংহ সংসদে বলেছেন, নোট বাতিলের ফলে জিডিপি-র বৃদ্ধির হার ২ শতাংশ বিন্দু কমবে। এই দাবিকে সমর্থন জানিয়েছে গোল্ডম্যান স্যাকস, মুডি’জ, আইসিআরএ বা ইক্রা-র মতো অর্থনীতির মূল্যায়নকারী সংস্থা। গোল্ডম্যানের ভবিষ্যৎবাণী, গত বছরের ৭.৬ শতাংশ বৃদ্ধির হার এ বছর ৬.৮ শতাংশে নেমে আসতে পারে। মুডি’জ, ইক্রা, ক্রিসিল-এর মতো সংস্থাগুলিও মনে করছে, বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ বা তার আশেপাশেই থমকে যাবে। অম্বিত ক্যাপিটালের আশঙ্কা, অর্থ বছরের শেষ ছয় মাসে বৃদ্ধির হার ০.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। তার ফলে গোটা বছরের বৃদ্ধির হার ৩.৫ শতাংশে নেমে যাবে। আগামী অর্থ বছর, অর্থাৎ ২০১৭-’১৮-তেও এর রেশ থাকবে। ফলে বৃদ্ধির হার ৫.৮ শতাংশেই থেমে থাকবে। প্রত্যেকটি সংস্থারই যুক্তি, মূলত নগদের জোগান কমে যাওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে অর্থনৈতিক কাজকারবার হোঁচট খাওয়াতেই এই আশঙ্কা।

এই আশঙ্কা অমূলক নয় বলেই মনে করছে দিল্লির ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ফিনান্স অ্যান্ড পলিসি (এনআইপিএফপি)। সংস্থার রিপোর্ট বলছে, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমবে। বাড়বে বেকারত্ব। আজ সেন্টার ফর মনিটরিং ইন্ডিয়ান ইকনমি (সিএমআইই) রিপোর্ট দিয়েছে, নোট বাতিলের ফলে অর্থনীতির অন্তত ১.২৮ লক্ষ কোটি টাকা ক্ষতি হবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের প্রাক্তন ডেপুটি গভর্নর কে সি চক্রবর্তীর বক্তব্য, ‘‘আমার অনুমান, নোট বাতিলের ফলে ২ থেকে ৩ লক্ষ কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হবে। এই অর্থ খরচ হলে অর্থনীতির লাভ হতো।’’ ইঞ্জিনিয়ারিং এক্সপোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিল জানিয়েছে, পুরনো ৫০০-১০০০ টাকার নোট অচল হয়ে যাওয়ায় ৪ লক্ষ মানুষ কাজ হারিয়েছেন। এরা মূলত দৈনিক বা সাপ্তাহিক মজুরিতে কাজ করেন। তাঁদের নগদে বেতন দেওয়ার মতো টাকাই নেই সংস্থাগুলির কাছে। সবথেকে বেশি ধাক্কা লেগেছে বস্ত্র, অলঙ্কার ও চামড়া শিল্পে। শিল্পমহল সূত্রের খবর, আবাসন ক্ষেত্রে নগদে লেনদেন বেশি। ৮ নভেম্বরের পরে ২০ শতাংশ বিক্রি কমেছে। গাড়ি বিক্রিতে তেমন ধাক্কা না লাগলেও স্কুটার-বাইক বিক্রি ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ কমার আশঙ্কা করা হচ্ছে। শিল্পমহল বা বণিকসভাগুলি নরেন্দ্র মোদীর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে এখনই মুখ খুলছে না। কিন্তু তারা দাবি তুলেছে, শিল্পের জন্য ঋণে সুদের হার কমানো হোক। বণিকসভা ফিকি-র সভাপতি হর্ষবর্ধন নেওটিয়ার যুক্তি, ‘‘অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে আঘাত ঠেকাতে সুদ কমানোর আর্জি জানাচ্ছি।  তা হলে বাজারে চাহিদা ধরে রাখা যাবে। রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অন্তত ৫০ বেসিস পয়েন্ট সুদের হার কমানো উচিত। তার সঙ্গে আবাসন, গাড়ি, দীর্ঘ সময় ধরে ভোগ্যপণ্য কেনায় সহজে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করা দরকার।’’ সিআইআই-এর ডিরেক্টর জেনারেল চন্দ্রজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়ের যুক্তি, ‘‘নগদের জোগান কমলে এবং মূল্যবৃদ্ধির হার কমলে এমনিতেই রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সামনে সুদের হার কমানোর রাস্তা তৈরি হবে।’’

আজ অরুণ জেটলি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের কর্তাদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স করে নির্দেশ দিয়েছেন, সব ব্যাঙ্ক অ্যাকউন্ট মালিককে ডেবিট কার্ড ও ই-ওয়ালেটের ব্যবস্থা করে দিতে। তাঁর যুক্তি, অনেকেই ডেবিট কার্ড শুধু এটিএম থেকে টাকা তোলার জন্য করেন। তাঁদের কার্ডে কেনাকাটায় উৎসাহ দিতে হবে। দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে নগদের পরিমাণ কমলেও, অর্থনীতির বহর বাড়বে। কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রী নির্মলা সীতারমণও মেনে নিয়েছেন, নোট বাতিলের ফলে উৎপাদন কমার আশঙ্কা রয়েছে। কিন্তু তাঁর যুক্তি, আগামী জানুয়ারি থেকে পরিস্থিতি শোধরাতে শুরু করবে।

কিন্তু অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এই ধাক্কার রেশ সহজে কাটবে না। পরিসংখ্যানবিদ প্রণব সেনের যুক্তি, আজ কোনও ব্যবসায়ী নিজের জিনিস বেচতে না পারলে কাল তিনি বাজারে গিয়ে কেনাকাটা করবেন না। ধারাবাহিক ভাবে এই প্রতিক্রিয়া সুদূরপ্রসারী হবে। বাজারে নোটের জোগান স্বাভাবিক হলেও প্রতিক্রিয়াটা থেকেই যাবে। বিশেষ করে গ্রামের অর্থনীতিতে এর জোর ধাক্কা লাগবে। এনআইপিএফপি-র অধ্যাপক পিনাকী চক্রবর্তীর বিশ্লেষণ, ‘‘একশো দিনের কাজের পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যাবে, অক্টোবর-নভেম্বরে অনেক কম লোক কাজে নিযুক্ত হয়। কারণ এই সময়টা চাষের সময়। এখন নোট বাতিলের ফলে কৃষিতে  আয়ের সুযোগ অনেক বেশি নষ্ট হবে। যখন চাষের মরসুম নয়, সেই সময় এই সিদ্ধান্ত নিলে গ্রামের অর্থনীতিতে অনেক কম ধাক্কা লাগত।’’