খোদ আদালত ভবন ও চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের ভবন যাঁর দানের জমিতে তৈরি, নলবাড়ির সেই স্বাধীনতা সংগ্রামী মহব্বত আলির ছেলে ও নাতিদের নামই এনআরসি খসড়ার বাইরে! চূড়ান্ত এনআরসিতেও নাম উঠবে কি না, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে সংশয়। কারণ, বাপ-ঠাকুরদার বংশপরিচয়ের প্রমাণ তথা ‘লিগ্যাসি’ বেহাত হয়ে গিয়েছে। এবং সেই ‘লিগ্যাসি’ নম্বর ব্যবহার করে এনআরসিতে নাম তোলার আবেদন করেছেন ২৮ জন ‘অচেনা’ ব্যক্তি! শুনানি, আবেদনে কাজ হয়নি কোনও। এক সময় রাজনৈতিক ও সামাজিক ভাবে নলবাড়ির প্রভাবশালী পরিবারটিকে তাই ধর্নায় বসতে হল নাগরিকত্বের দাবিতে।

একই সমস্যায় বরপেটা রোডের দুই বোন সাবিত্রী ও মিঠু সূত্রধর। এনআরসিতে নাম তুলতে গিয়ে তাঁরা দেখেন, বাবার নাম ব্যবহার করে আগেই নাম তুলে ফেলেছেন ২৬ জন।

বিভিন্ন সংগঠনের দাবি, ‘লিগ্যাসি ডেটা’-র বহু তথ্যই বেহাত হয়েছে। ‘লিগ্যাসি কোড’-এ রয়েছে বিস্তর গরমিল। সচেতন নাগরিক মঞ্চের দাবি, রাজ্যে অন্তত ৩০০০-এর বেশি ‘লিগ্যাসি ডেটা’ বেহাত বা বিক্রি হয়েছে। খোদ রাজ্য সরকার বিধানসভায় তথ্য দেখিয়ে দাবি করেছে, ‘লিগ্যাসি’ অপব্যবহারের সন্দেহ অমূলক নয়।

নলবাড়ি জেলায় ফের মিলল সেই প্রমাণ। ৮৫ বছরের কুতুবুদ্দিন আহমেদ স্বাধীনতা সংগ্রাহী মহব্বত আলির ছেলে। মহব্বত আলির দেওয়া জমিতে নলবাড়ি এএসটিসি বাস স্ট্যান্ড, আদালত, হাসপাতাল গড়ে উঠেছে। ১৯৭২ সালে তিনি মারা গেলে স্ত্রী মেহরউন্নিসা স্বামীর স্বাধীনতা সংগ্রামীর পেনশন পাচ্ছিলেন। ১৯৮৮ সালের বিধ্বংসী বন্যায় তাঁদের অনেক নথি নষ্ট হয় ও ভেসে যায়। এখন ১৯৩৩ সাল থেকে শুরু করে বিভিন্ন নথি, আধার, ভোটার কার্ড, প্যান কার্ড থাকলেও বাবার ‘লিগ্যাসি’ প্রমাণ করতে গত দু’বছর ধরে কালঘাম ছুটছে কুতুবুদ্দিনের। মহব্বত ও কুতুবুদ্দিনের ‘লিগ্যাসি’ কোড ইতিমধ্যে অচেনা ২৮ জন ব্যবহার করেছেন বলে জানতে পারেন তাঁরা। কুতুবুদ্দিনের ছেলে নুরুল ইসলাম জানান, ওই অচেনা ২৮ জনের নামে তাঁরা এফআইআর করেছেন। বারবার শুনানিতে গিয়েও সুরাহা হয়নি। নিশ্চিত হয়নি নাগরিকত্ব। নুরুলবাবুর আক্ষেপ, ৩১ অগস্টের পরে হয়তো বেআইনি ভাবে নাম তোলা লোকেরা নাগরিক হয়ে যাবে। আর তাঁদের মতো পরিবারকে হেনস্থা হতে হবে। জুটবে অপমান, এমনকি বিদেশি অপবাদে কারাবাসের মুখেও পড়তে হতে পারে।

এনআরসি নিয়ে আজ গুয়াহাটিতে বিভিন্ন নাগরিক সংগঠন, রাজনৈতিক দল, বিশিষ্ট জন, বর্তমান ও প্রাক্তন আমলা-পুলিশকর্তাদের বৈঠক হয়। সকলের তরফে এনআরসি প্রকাশের পরে মানুষকে শান্তি ও সম্প্রীতি বজায় রাখার আবেদন রাখা হয়। সরকারের কাছে অনুরোধ রাখা হয়েছে, শেষ পর্যন্ত যাঁরা বিদেশি ঘোষিত হবেন তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা জিইয়ে রাখার ফলেই এত অশান্তি। তাই এ বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক, কারণ ঘোষিত বিদেশিদেরও সম্মানের সঙ্গে বাঁচার অধিকার রয়েছে। অসমের একাংশ মানুষ ও সংগঠন এনআরসি নিয়ে রাজ্য ও দেশের বাইরে ভুল চিত্র তুলে ধরছে। এ দিনের আলোচনায় সেই ঘটনার নিন্দা করে, এনআরসি প্রক্রিয়ায় সকলকে সহায়তা করা ও গঠনমূলক সমালোচনা করার আর্জি রাখা হয়।