• Diganta Bandyopadhyay
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

গ্রাম থেকে রাইসিনা হিলে যাত্রা শুরু সাদামাটা, মৃদুভাষী মানুষটির

কেমন মানুষ রামনাথ কোবিন্দ? লিখছেন দিগন্ত বন্দ্যোপাধ্যায়

Ram Nath Kovind
রাজ্যসভার সাংসদ, বিহারের রাজ্যপাল থেকে এখন সম্ভবত দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি পদে রামনাথ কোবিন্দ।
  • Diganta Bandyopadhyay

দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। ছোটবেলার স্মৃতি। অনেকটাই ঝাপসা। শুধু মনে আছে, সেই আগুনে আর ফিরে আসেননি মা।

কানপুরের পরৌখ গ্রামের ছোট্ট ছেলেটির জীবনে এক বড় ধাক্কা দিয়ে গিয়েছিল সেই ঘটনাটি। ছোট এক কাঁচা বাড়িতে ন’জনের সংসার যেন নিমেষে তছনছ হয়ে গেল। কিন্তু হাল ধরেন বাবা। বাড়িতেই এক ছোট্ট দোকান চালিয়ে বড় করেছেন পাঁচ ভাই আর দুই বোনকে। ভাই-বোনেদের মধ্যে সবথেকে ছোট সেই ছেলেটিই এখন বসতে চলেছেন দেশের সর্বোচ্চ পদে।

রামনাথ কোবিন্দ।

রাজ্যসভার সাংসদ, বিহারের রাজ্যপাল থেকে এখন সম্ভবত তিনি হতে চলেছেন দেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি। কিন্তু তাঁর এই উত্থানে যদি সবথেকে উল্লাস এখন কোথাও দেখা যায়, সেটি তাঁর জন্মভিটেতেই। কারণ, ক্ষমতার অলিগলি পেরিয়ে উঁচু পদে বসেও কখনও তিনি ভোলেননি নিজের সেই গ্রামটিকে। গ্রামে তাঁকে সকলে ডাকেন ‘বাবা’ বলে। সেই নামেই রামনাথকে চেনেন সকলে।

তার কারণও আছে। বছর কয়েক আগে এই গ্রামে যখন গিয়েছিলেন রামনাথ, গ্রামবাসীরা সোনা-রূপোয় বাঁধানো মুকুট পড়িয়েছিলেন তাঁর মাথায়। সেই মুকুট খুলে গ্রামবাসীদের হাতেই ফেরত দেন। বলেন, ‘‘এই টাকায় গরিব মেয়েদের বিয়ে দিন।’’ এখানেই থেমে থাকেননি। নিজের জন্মভিটেটাও দান করেছেন। সেখানে গড়ে দিয়েছেন ‘মিলন কেন্দ্র’। যে কোনও অনুষ্ঠানের জন্য এখন সব গ্রামবাসীরই হক সেই কেন্দ্রে। রাজ্যসভার সাংসদ হয়ে সাংসদ তহবিলের টাকায় সেই গ্রামের রাস্তা থেকে হ্যান্ডপাম্প, ব্যাঙ্ক থেকে স্কুল— কী করেননি তিনি!

আরও পড়ুন: রাজনীতির দাবা বারে বারে ঘুঁটি সাজিয়েছে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে

গ্রামের বাড়িতে সহপাঠী যশবন্ত সিংহ

অত্যন্ত সাদামাটা, মৃদুভাষী, গ্রামমুখী এই ব্যক্তিকে তাই বোধহয় রাষ্ট্রপতি পদের জন্য বেছে নিতে খুব বেশি ভাবতে হয়নি নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহকে। হ্যাঁ, দলিত-তাস তো ছিলই। রামনাথের নাম ঘোষণার সময় খোদ অমিত শাহ তা লুকোনোর চেষ্টাও করেননি। বরং রাষ্ট্রপতি পদের মতো সর্বোচ্চ লড়াইকে দলিত রাজনীতির মোড়কে মুড়ে বিরোধীদের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ দাঁড় করিয়ে দিয়েছিলেন। আর বিরোধীরাও বাধ্য হয়ে সেই ফাঁদেই পা দিল। তারাও মীরা কুমারের মতো দলিত মুখকে এনে সামনে ফেলল। আমার দলিত বনাম তোমার দলিত।

কিন্তু রাষ্ট্রপতি নির্বাচন নিয়ে মোদী-শাহরা যখন অঙ্ক কষেছেন, তখন বোধহয় আরও বড় ভাবনা ছিল তাঁদের মনে। বিজেপির এক শীর্ষ নেতা বলেন, ‘‘রামনাথ কোবিন্দ শুধুমাত্র এক জন দলিত মুখ নন, তিনি দলিত উত্থানেরও মুখ।’’ পঞ্চম শ্রেণি পার করে রামনাথের অনেক সহপাঠী আর স্কুলের মুখ দেখেননি। গ্রামে তেমন সুবিধাই ছিল না। রামনাথ কিন্তু হাল ছাড়েননি। ভর্তি হলেন বাড়ি থেকে ৬ কিলোমিটার দূরে খানপুর-প্রয়াগপুরের এক স্কুলে। সে সময় বাড়িতে সাইকেল রাখাও এক বিলাসিতা। এত জনের সংসারে খাবার জোটাই দায়! রোজ ৬ কিলোমিটার হেঁটে যেতেন, স্কুল শেষে হেঁটেই ফিরতেন।

বছর পনেরো হতে হতে রামনাথ বুঝলেন, উচ্চশিক্ষা আর সম্ভব নয় গ্রামে। পাড়ি দিলেন শহরে। কানপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই কমার্সে গ্র্যাজুয়েট হলেন, আইন পাশ করলেন। তারপর আর পিছন ফিরে তাকাননি। সোজা দিল্লি এসে ওকালতিতে হাত পাকাতে থাকেন। সিভিল সার্ভিসের জন্যও তোড়জোড় শুরু করলেন। অচিরেই তাঁর গুণ নজর কাড়ল ক্ষমতায় আসীনদের। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের অফিসার অন স্পেশাল ডিউটিও (ওএসডি) হয়ে গেলেন। সুপ্রিম কোর্টে অ্যাডভোকেট অন রেকর্ড-ও হলেন। প্রায় ১৬ বছর আইনি পেশার পর তার পর যোগ দিলেন রাজনীতিতে। সেটা ১৯৯০ সাল।

আরও পড়ুন: যে কোনও পরিসরে প্রণব খুঁজে নেন কাজ, থাকেন প্রাসঙ্গিক

বিজেপি তখন সবে পায়ের তলায় জমি শক্ত করছে। ভোটেও দাঁড়ালেন দু’বার। এক বার লোকসভা, পরের বার বিধানসভা। কিন্তু হারের মুখ দেখতে হল। তবু তিনি দলের নেতাদের ‘গুড বুক’-এই থেকে গিয়েছেন। রামনাথের ঘনিষ্ঠ নেতারা বলছেন, আসলে বিতর্ককে খুব বেশি ধারেকাছে ঘেঁষতে দেননি কোবিন্দ। প্রত্যাশাও রাখেননি। নেতারা এমন ব্যক্তিকে পছন্দ করেন। রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর নাম ঘোষণার পর বিরোধীরা কম চেষ্টা করেননি রামনাথের বিতর্ক মাটি খুঁড়ে বের করতে। হাতে গুণে মাত্র দু’টি বিতর্ক সামনে আনতে পেরেছেন।


একসঙ্গে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে  রামনাথ কোবিন্দ,

লালকৃষ্ণ আডবাণী, অমিত শাহ এবং অন্য বিজেপি নেতারা। 

একটি হল, বিজেপির আর এক দলিত তাসের পরীক্ষার সময় রামনাথের ভূমিকা। তেহলকার স্টিং অপারেশনে টাকা নিতে ধরা ক্যামেরায় ধরা পড়লেন বঙ্গারু। তখন তিনি দলের সভাপতি। আগাগোড়া ব্রাহ্মণদের দল হিসেবে পরিচিত বিজেপির প্রথম দলিত পরীক্ষা। সেই সময় আদালতে রামনাথ না কি বঙ্গারুরই পক্ষ নিয়ে সওয়াল করেছিলেন, কুড়ি বছর ধরে তাঁকে চেনেন। বঙ্গারু একজন সৎ মানুষ।

দ্বিতীয় আর একটি বিতর্কও সামনে এসেছে। রঙ্গনাথ মিশ্র কমিশন তখন প্রস্তাব করে, মুসলিম আর খ্রিস্টানদের মধ্যে পিছিয়ে পড়া অংশের জন্য সংরক্ষণ করা হোক। আর রামনাথ বলেছিলেন, ইসলাম আর খ্রিস্টধর্মের উৎস ভারত নয়। ফলে কোনও ভাবেই তাদের সংরক্ষণ দেওয়ার দরকার নেই।

বিজেপি নেতারা বলছেন, বিরোধীরা এত তদন্ত করে এমন দু’টি তথাকথিত বিতর্ক খুঁজে বের করেছে, যা কোনও ভাবেই দানা বাধল না। কারণ, রামনাথ কেমন মানুষ, তা সকলে জানেন। দলের মুখপাত্র হয়েছিলেন, কিন্তু এক দিনও সাংবাদিক সম্মেলন করতে চাননি। কখনও সখনও জোর করে পাঠালেও তা এড়ানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন। দিল্লিতে অশোক রোডে বিজেপির সদর দফতরে তাঁকে সামনে পেলেও সাংবাদিকরা খুব একটা কাছে যেতেন না। কারণ, রাজনীতির সাত-পাঁচে থাকতেনই না তিনি। সবসময় থাকতে চেয়েছেন পর্দার পিছনেই। নীরবে কাজ করে যেতেন। আর সেটাই তাঁর সাফল্যের চাবিকাঠি।

রামনাথের এই সাফল্যের রসায়ন দেখে এখনকার অনেক মুখপাত্র নিজেদের আড্ডায় বলতে শুরু করেছেন, ‘‘যত কম বলা যায়, ততই বোধহয় মোদী-শাহ জমানার উন্নতির সিঁড়ি। আমরা বুঝিনি, রামনাথ কোবিন্দ অনেক আগেই সেটি আঁচ করতে পেরেছিলেন।’’ কিন্তু বিজেপি নেতৃত্ব বলছেন, প্রচারের লালসা বর্জন করা তো একটি দিক। আসলে প্রচার ছাড়াই বিভিন্ন বিষয়ে যে ভাবে দশকের পর দশক ধরে লড়ে গিয়েছেন রামনাথ কোবিন্দ, আজ সর্বোচ্চ পদে তাঁকে বাছাইয়ের পিছনে সেটিই বড় কারণ হিসেবে কাজ করেছে।

নিজে দলিত নেতা। দলিতদের সমস্যা নিয়ে তিনি কিন্তু লাগাতার লড়াই করে গিয়েছেন। নিজের ঢাক পেটাননি, কিন্তু দলিতদের বিরুদ্ধে অত্যাচার নিয়ে নিজের মতো করেই সরব হয়েছেন। রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে বিহারের দলিতদের উপর নির্যাতন নিয়ে সোচ্চার হন। অটলবিহারী বাজপেয়ী তখন প্রধানমন্ত্রী। রামনাথ ছিলেন তফসিলি জাতি ও উপজাতি কমিশনের প্রধান। তাঁর নজরে আসে উত্তরপ্রদেশের ৫৫ লক্ষ আদিবাসী সংরক্ষণ নিয়ে বৈষম্য হচ্ছে। সাংসদ, বিধায়কদের নিয়ে রামনাথ সরকারের উপরেই চাপ বাড়ানো শুরু করেন। স্বাধীনতার ৫৭ বছর পর তারপর রামনাথের চাপেই ন’টি জাতিকে তফসিলি উপজাতির মর্যাদা মেলে।

একান্তে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে রামনাথ কোবিন্দ

আজ যে গরু নিয়ে এত হইচই, একসময় রাজ্যসভায় এই গরু-মহিষের খাবারে ক্ষতিকর রাসায়নিক মেশানো হচ্ছে বলে অভিযোগ তোলেন। ’৯৭ সালে জম্মু-কাশ্মীরের বিধানসভায় পাক অধিকৃত কাশ্মীরের উপর ভারতের অধিকার ছেড়ে দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছিলেন এক বিধায়ক। সংসদে সরব হন রামনাথ। প্রশ্ন তোলেন, এটি কি সংবিধান লঙ্ঘন করা নয়? সরকার কি কোনও ব্যবস্থা নেবে না?

আজ রাষ্ট্রপতি পদে মনোনীত হওয়ার পর সংবিধানের মর্যাদাকে সর্বোপরি রাখার কথা বলছেন রামনাথ। রাইসিনা হিলসে বসার পর সেটাই তাঁর সাংবিধানিক কর্তব্য। কিন্তু তাঁর রাজনৈতিক জীবন ঘাঁটলে দেখা যাবে, এর বীজ আসলে তিনি বপণ করেছেন অনেক আগেই। ঢাকঢাক গুড়গুড় করেননি, কিন্তু নিজের ভাবনাকে নিরন্তর লালন করে এসেছেন।

এত যোগ্য নেতার ভিড়ে রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর সম্ভাব্য অভিষেক নিঃসন্দেহে ভাগ্যের বিষয়। তা না হলে রাজ্যসভার সাংসদ হিসেবে নর্থ অ্যাভিনিউয়ের যে বাড়ি থেকে বেরিয়ে রোজ সকালে রাষ্ট্রপতি ভবনের পাঁচিল ঘেঁষে যিনি প্রাতর্ভ্রমণ করতেন, এখন সেটিই হবে পাঁচিলের ওপারে। এটি নিছক ভাগ্যই বটে। কিন্তু শুধু দলিতের পরিচয় হিসেবে নয়, প্রতি মুহূর্তে এক কঠিন লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে তিলে তিলে উত্থান ঘটিয়েছেন নিজেকে। আর সেই পথে হেঁটেই আজ তিনি বসতে চলেছেন দেশের শীর্ষ আসনটিতে।

ছবি: পিটিআই।

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন