ধুরন্ধর কমল নাথ। জাদুকর অশোক গহলৌত। মাঠেঘাটের রাজনীতি করে উঠে আসা ভূপেশ বঘেল।

সেমিফাইনালে টিমকে দুর্ধর্ষ জয় এনে দেওয়া কংগ্রেসের তিন মুখ্যমন্ত্রী ফাইনালে এসে নরেন্দ্র মোদীর কাছে হার মানলেন।

মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, ছত্তীসগঢ়—গত বছরের নভেম্বর-ডিসেম্বরে বিধানসভা ভোটে এই তিন রাজ্য বিজেপির থাবা থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিল কংগ্রেসের ‘হাত’। যে জয়ে প্রধান হাতিয়ার ছিল চাষিদের ঋণ মকুব। সেমিফাইনালের সেই জয়ে ভর করেই রাহুল গাঁধীর কংগ্রেস লোকসভা ভোটে ভাল ফলের স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল।

কিন্তু ফাইনালে খেলা ঘুরে গেল। কংগ্রেস শাসিত তিন রাজ্যেই বিজেপি আশাতীত ভাল ফল করল। বিধানসভা ভোটে হারের পরে তিন রাজ্যেই বিজেপি এক ও একমাত্র নরেন্দ্র মোদীকে মুখ করে ভোটের ময়দানে নেমেছিল। প্রার্থী নয়, মোদীকে ভোট দিন— এটাই ছিল বিজেপির কৌশল। তাতেই বাজিমাত।

ভোটগণনার ফল বলছে, মধ্যপ্রদেশের ২৯টি, রাজস্থানের ২৫টি এবং ছত্তীসগঢ়ের ১১টি— কংগ্রেস শাসিত তিন রাজ্যের মোট ৬৫টি আসনের সিংহভাগই বিজেপি নিজের ঝুলিতে পুরেছে। যা দেখে রাজনীতিকদের মত, বিধানসভা ভোটে তিন রাজ্যের ভোটাররা বিজেপির রাজ্য সরকারের বিরুদ্ধে অসন্তোষ উগরে দিয়েছিলেন। কিন্তু লোকসভা ভোটে তাঁরা প্রধানমন্ত্রী পদের জন্য মোদীকেই ভোট দিলেন। একই ভোটার কয়েক মাসের ব্যবধানে বিধানসভা ও লোকসভা ভোটে যে দুই ভিন্ন
দলকে ভোট দিতে পারেন, তা ফের প্রমাণ হল।

মধ্যপ্রদেশ-রাজস্থান-ছত্তীসগঢ়ে কংগ্রেসের তিন মুখ্যমন্ত্রী গদিতে বসে চাষিদের ২ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ঋণ মকুব করে দিয়েছিলেন। তাকে হাতিয়ার করেই লোকসভা ভোটের ফসল ঘরে তোলার চেষ্টা করেছিল কংগ্রেস। রাহুল গাঁধী যত বার এই তিন রাজ্যে প্রচারে গিয়েছেন, প্রতি বার প্রতিশ্রুতি পূরণের কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। উল্টো দিকে বিজেপির হাতিয়ার ছিল মোদীর মজবুত নেতৃত্ব, দেশের সুরক্ষা এবং জাতীয়তাবাদ। রাজ্যের নেতারা চলে গিয়েছিলেন পিছনের সারিতে।

মধ্যপ্রদেশে তা-ও প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শিবরাজ সিংহ চৌহান সামনে ছিলেন। ছত্তীসগঢ়ে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী রমন সিংহ দলকে নেতৃত্ব দিলেও পুরনো সাংসদদের কাউকে টিকিট দেয়নি বিজেপি। এমনকি রমনের ছেলে, সাংসদ অভিষেক সিংহকেও টিকিট দেননি অমিত শাহ। কিন্তু রাজস্থানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়া নিজের ছেলের কেন্দ্রের বাইরে বিশেষ প্রচারেই যাননি।

বিজেপি নেতারা টের পেয়েছিলেন, রাজস্থানে বিজেপির হারের কারণ মূলত মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে বসুন্ধরার ‘ঔদ্ধত্য’ নিয়ে আমজনতার ক্ষোভ। যে কারণে রাজস্থানের বিধানসভা ভোটের সময়ে স্লোগান উঠেছিল, ‘মোদী তুঝসে বৈর নহি, বসুন্ধরা তেরা খৈর নহি’। যার অর্থ, নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে শত্রুতা নেই। কিন্তু বসুন্ধরা রাজে সিন্ধিয়ার ক্ষমা নেই।

এ বার তাই পাকিস্তান-সীমান্তবর্তী রাজস্থানে বিজেপির তুরুপের তাস ছিল, পুলওয়ামায় জঙ্গি হানার জবাবে পাকিস্তানের বালাকোটে বায়ুসেনার প্রত্যাঘাত। বিজেপি নেতারা মোদীকে সামনে রেখে স্লোগান তুলেছিলেন, ‘ছপ্পন ইঞ্চ কা সিনা হ্যায়, সর উঠাকে জিনা হ্যায়।’ তাতেই বাজিমাত হয়েছে। বসুন্ধরা নিজে আজ জয়ের পুরো কৃতিত্ব মোদী-শাহকেই দিয়েছেন।

ভোটের ফলের পরে রাজস্থানের মুখ্যমন্ত্রী অশোক গহলৌত বলেন, ‘‘গণতন্ত্রে জনাদেশ শিরোধার্য। কংগ্রেসের কাছে দেশ সবার উপরে, বিজেপির কাছে ক্ষমতা। রাহুল গাঁধী জনকল্যাণ ও উন্নয়নের বিষয়ে ভোটে লড়েছিলেন। নরেন্দ্র মোদী লড়েছেন ধর্ম, জাতি, সেনার বীরত্বের নামে। ২০১৪-র ভোটের প্রতিশ্রুতি নিয়ে কোনও জবাব দেননি।’’ মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার আগে পর্যন্ত এআইসিসি-তে সংগঠনের ভারপ্রাপ্ত নেতা ছিলেন গহলৌত। তাঁর মতে, ‘‘কংগ্রেস কর্মীদের নিরাশ হওয়ার কোনও কারণ নেই। তাঁরা রাহুলের নেতৃত্বে কংগ্রেসের নীতি ও ইস্তাহার মানুষের কাছে পৌঁছতে কঠোর পরিশ্রম করেছেন।’’

পাঁচ বছর আগে লোকসভা ভোটে রাজস্থানের ২৫টি কেন্দ্রের সব ক’টিই জিতে নিয়েছিল বিজেপি। এ বারও কার্যত তার পুনরাবৃত্তি হতে চলেছে। অথচ পাঁচ মাস আগেই মরু-রাজ্যের বিধানসভায় ২০০ আসনের মধ্যে ৯৯টি জিতেছিল কংগ্রেস।

২০১৪-তে মধ্যপ্রদেশের ২৯টি আসনের মধ্যে কংগ্রেস মাত্র দু’টিতে জিতেছিল। এ বার একমাত্র কমল নাথের দুর্গ ছিন্দওয়াড়ায় তাঁর ছেলে নকুল নাথের জয় বাদ দিলে আর কোনও আসন কংগ্রেসের ঝুলিতে আসছে না। জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াও নিজের আসন গুণায় পর্যুদস্ত। অথচ বিধানসভায় কংগ্রেস ২৩০টির মধ্যে ১১৪টিই জিতেছিল। মধ্যপ্রদেশে একটি বাদে সব আসন বিজেপি জিতে নেওয়ার পরে কমল নাথ সরকারের আয়ু আর কত দিন, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। কারণ বিজেপি ইতিমধ্যেই কমল নাথের সরকারকে সংখ্যালঘু প্রমাণ করতে বিধনাসভার অধিবেশন ডাকার দাবি তুলেছে।

রাজস্থান-মধ্যপ্রদেশে বিধানসভায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছিল। ছত্তীসগঢ়ে সিংহভাগ আসনে জিতে কংগ্রেস ক্ষমতায় এসেছিল। ৯০টির মধ্যে ৬৮টি। কিন্তু লোকসভায় উল্টো ছবি। এ বার সিংহভাগ আসনই বিজেপির ঝুলিতে।