পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে সার্ক সম্মেলন!

অর্থাৎ সার্ক–টু! শুনতে বিস্ময়কর লাগলেও উরি-পরবর্তী কূটনীতিতে এই ‘মেকানিজম’কেই আগামী মাসে বাস্তব চেহারা দিতে চাইছে মোদী সরকার। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর লক্ষ্যেই তৈরি হয়েছিল সার্ক। কিন্তু পাকিস্তানের কারণে সেই সহযোগিতা ভেস্তে যেতে বসেছে। ইসলামাবাদে সার্ক সম্মেলন ভণ্ডুল হয়ে গিয়েছে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতিতে। আয়োজক দেশ পাকিস্তান ছাড়া জোটের বাকি ৭টি দেশই সন্ত্রাস প্রশ্নে ইসলামাবাদের দিকে আঙুল তুলে বয়কট করছে সম্মেলন। সন্দেহ নেই, এই গোটা বয়কট-পর্বের পিছনে রয়েছে ভারতের প্রত্যক্ষ কূটনীতি।

এ বার দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতা ও উন্নয়নের নতুন ছক নিয়ে এগোতে চাইছে ভারত। যেখানে পাকিস্তানের কোনও ঠাঁই নেই। লক্ষ্য মূলত তিনটি:
• সন্ত্রাসে মদত জুগিয়ে চলা পাকিস্তানকে কূটনৈতিক ভাবে আরও বিচ্ছিন্ন করে ফেলা ও অর্থনৈতিক ভাবে তাদের কোণঠাসা করা।
• পাকিস্তানের বাগড়ায় ভারত-সহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলিতে যে সব প্রকল্প থমকে বা ঝুলে আছে, সেগুলির পথ সুগম করা।
• সার্কের সদস্য নয়, এমন দেশগুলির সঙ্গেও সহযোগিতা বাড়ানো।

কী ভাবে করা যাবে এ সব?

ভারতের পরিকল্পনাটি এই রকম: সার্ক ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলির মধ্যে সহযোগিতার আরও কিছু মঞ্চ বা জোট আগে থেকেই রয়েছে। কিন্তু সেগুলিতে কাজের কাজ তেমন হচ্ছিল না। ভারত এ বার সেই মঞ্চগুলিকে চাঙ্গা করতে চায়। এগুলিতে পাকিস্তান বাদে সার্কের বাকি সব দেশকে যাতে কোনও না কোনও ভাবে যুক্ত করা যায়, সে ব্যাপারেও তৎপর দিল্লি।

যেমন আগামী মাসে গোয়ায় বিমস্টেক সম্মেলন। বিমস্টেকের পুরো কথাটি হল ‘বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টোরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকনমিক কোঅপারেশন’। ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, ভুটান, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার ও   তাইল্যান্ড— সাত দেশের এই জোটের প্রথম পাঁচটিই সার্ক-সদস্য।  গোয়ায় বিমস্টেক সম্মেলনে এই দেশগুলিকে নিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক সমন্বয় ও যোগাযোগ বাড়ানোর নকশা তৈরি করবে ভারত।

 বিদেশ মন্ত্রক সূত্রের খবর, সার্ক-সদস্য মলদ্বীপ ও আফগানিস্তানকেও যাতে গোয়ায় বিমস্টেক-এর পর্যবেক্ষক দেশ হিসেবে নেওয়া হয় তার জন্য জোরালো আবেদন করবে ভারত। এখনও পর্যন্ত যা ইঙ্গিত, তাতে এ ব্যাপারে সর্বসম্মতি হতে পারে। অর্থাৎ পাকিস্তানকে সরিয়ে রেখে সার্কের বাকি সব ক’টি দেশকেই বিমস্টেক-এর মঞ্চে নিয়ে আসার কাজ প্রায় সম্পূর্ণ।

বিদেশ মন্ত্রকের এক কর্তার বিশ্লেষণ, সন্ত্রাসবাদের প্রশ্নে আঞ্চলিক স্তরে পাকিস্তানকে চাপে রাখার একটা কৌশল তো রয়েছেই, অর্থনৈতিক ভাবে যদি ইসলামাবাদকে কোণঠাসা করা যায়, তবে তাদের মদতে পুষ্ট জঙ্গি সংগঠনগুলিও দুর্বল হবে।  শুধু তা-ই নয়, পাকিস্তানকে আঞ্চলিক উদ্যোগগুলি থেকে বাইরে রাখতে পারলে বিভিন্ন প্রকল্প রূপায়ণের ক্ষেত্রেও বাড়তি গতি আসবে। বিদেশ মন্ত্রকের ওই কর্তাটির কথায়, ‘‘আঞ্চলিক বাণিজ্য, শক্তি, সড়ক সংযোগের মতো বহু ক্ষেত্রেই এগোনো সম্ভব হচ্ছে না পাকিস্তানের বাগড়ায়।’’ নয়াদিল্লির কূটনৈতিক অফিসারদের বক্তব্য, সার্ককে ক্রমশ অকেজো করে দিয়ে পাকিস্তান চিনের সঙ্গে তাদের ‘মেগা’ বাণিজ্যিক পরিকল্পনা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ৫ হাজার কোটি ডলার বিনিয়োগ করে বেজিং অর্থনৈতিক করিডর করছে ইসলামাবাদের সঙ্গে, যাতে এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলির ক্ষতি ছাড়া লাভ নেই।

জি পার্থসারথি এক সময় পাকিস্তানে ভারতের হাইকমিশনার ছিলেন। তাঁর কথায়, ‘‘পাকিস্তান সম্পর্কে এখন ভারতের মনোভাবটি হল, তোমরা চিনের সঙ্গে যা করছ কর। আমরা আমাদের মতো উন্নয়নের দিকটি বুঝে নেব। তাই পাকিস্তান যে দিকে হাঁটছে, আমরা তার বিপরীত পথে হেঁটে বাকি রাষ্ট্রগুলিকে আমাদের সঙ্গী করে নেব।’’

মোদীর প্রস্তাবিত সার্ক স্যাটেলাইট প্রকল্প, সার্কভুক্ত দেশগুলির মধ্যে মোটর ভেহিক্‌ল চুক্তি, ভারত-পাকিস্তান-আফগানিস্তান সড়ক চুক্তি— এই সব ক’টিই মুখ থুবড়ে পড়েছে স্রেফ পাক অসহযোগিতায়। ভারত তাই পাকিস্তানকে বাদ দিয়ে বাংলাদেশ, ভুটান ও নেপালকে নিয়ে (বিবিআইএন) মোটর ভেহিক্‌লস চুক্তি বাস্তবায়িত করতে চলেছে। পাকিস্তানকে এড়িয়েই ইরান ও আফগানিস্তানের সঙ্গে চুক্তি করে  পশ্চিম এশিয়ার পণ্য পাঠানোরও ব্যবস্থা করতে তৎপর নয়াদিল্লি। গোয়ায় বিমস্টেক সম্মেলনটি হবে ১৬ তারিখ। সেখানে ৪টি বিষয়ের উপর কৌশল তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা। এগুলি হল: শিল্প-বাণিজ্য, পরিবহণ-যোগাযোগ, শক্তি ক্ষেত্রে বাণিজ্য এবং আবহাওয়া পরিবর্তন।

শুধু বিমস্টেকই নয়। পাকিস্তানকে বাইরে রেখে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য শুকিয়ে যাওয়া ‘সাব-রিজিওনাল মেকানিজম’ তথা উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতা ব্যবস্থাতেও এ বার অক্সিজেন জোগানোর দিকে মন দিচ্ছে মোদী সরকার। যেমন ২০০১-এ তৈরি হয়েছিল সাসেক  তথা ‘সাউথ এশিয়া সাব-রিজিওনাল ইকনমিক কো-অপারেশন প্রোগ্রাম’। এর সদস্য দেশগুলি হল, ভারত, বাংলাদেশ, ভুটান, মলদ্বীপ, নেপাল ও শ্রীলঙ্কা। তৈরি হওয়ার পর থেকে কার্যত কুম্ভকর্ণ দশা চলছিল সাসেক-এর। উরি হামলার পর গা ঝাড়া দিয়ে উঠে ভারতেরই নেতৃত্বে একটি কর্ম-পরিকল্পনা (প্ল্যান অব অ্যাকশন) তৈরি হয়েছে। ২০১৬ থেকে ২০২৫, আগামি দশ বছরের প্রস্তাবিত বাণিজ্য এবং শক্তিপ্রকল্পগুলি চিহ্নিত করার কাজ শুরু হয়েছে।