• সুখরঞ্জন দাশগুপ্ত
সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে

ইন্দিরা-দশক

[২৪ জানুয়ারি, ১৯৭৬-এ আনন্দবাজার পত্রিকায় প্রকাশিত]    

Indira Gandhi
সাউথ ব্লকে নিজের ডেস্কে শ্রীমতি ইন্দিরা গাঁধী। ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ থেকে।

দশ বছর আগে কংগ্রেস সংসদ দলের সদস্যদের গোপন ব্যালটের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বী শ্রী মোরারক্ষী দেশাইকে বিপুল ভোটে পরাজিত করে শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী বিশ্বের বৃহত্তম গণতন্ত্রের প্রধানমন্ত্রী হিসাবে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। সেই থেকে টানা এক বছর দেশের ভিতরে এবং  আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে নানা ঘাত ও প্রতিঘাতের মধ্যে দিয়ে তিনি এগিয়ে চলছেন। প্রধানমন্ত্রীর নিজের ভাষায়, ‘ আমই যতদিন প্রধানমন্ত্রী থাকব, ততদিন ভারতবর্ষের ভাবমূর্তির কোন ক্ষতি হতে দেব না। দেশ শাসনে জনগণের কল্যাণে কোন নিয়ন্ত্রণ মানব না’। 

শ্রীমতী গান্ধীর এই দশটি বছর গুরুত্বপুর্ণ। বলা যেতে পারে এই দশ বছরই ইন্দিরা-দশক। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার তের মাসের মধ্যে ’৬৭ সালের নির্বাচনে ভারতের কয়েকটি রাজ্যে কংগ্রেস বিরোধীরা ক্ষমতায় এলেন। এমনকি তাঁর নিজের রাজ্য উত্তরপ্রদেশও। প্রধানমন্ত্রীর সামনে অনেক সমস্যা। ৬৭’ সালের শেষ দিকে দেখা গেল বিশ্বব্যাপী মন্দা। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি। ভারতের এক তৃতীয়াংশ জায়গা জুড়ে খরা। উৎপাদন ব্যাহত। দেশ জুড়ে খাদ্য আন্দোলন শুরু হল। শ্রীমতী গান্ধী পরিস্থিতি মোকাবিলার জন্য ‘সবুজ বিপ্লবের’ আহ্বান জানালেন।পাঞ্জাব, হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশ, পশ্চিমবঙ্গের কৃষির উপর গুরুত্ব দেওয়া হল। কৃষি উৎপাদন বেড়ে গেল। কিন্তু এই সময় পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের উগ্রপন্থীদের আন্দোলন তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকল। খুন এবং লুটপাটের ঘটনা এতই বেড়ে গেল যে বিদেশের সংবাদপত্রে হৈ চৈ দেখা দিল।

হঠাৎ হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে রাষ্ট্রপতি ডক্টর জাকির হোসেন মারা গেলেন। কংগ্রেস স্থির করল তৎকালীন লোকসভার স্পিকার নিলাম সঞ্জীব রেড্ডি কংগ্রেস দলের প্রার্থী হবেন। ওদিকে ব্যাঙ্ক জাতীয়করণের ব্যাপারে কংগ্রেস দলের মধ্যে অন্তর্বিরোধ তখন তীব্র। অর্থমন্ত্রী মোবারজী পদত্যাগ  করলেন। সংকট আরও ঘনীভূত হল। তারপর সংসদীয় দলের নেতা হিসেবে বিবেক অনুয়ায়ী রাষ্ট্রপতির নির্বাচনে ভোট দেওয়ার আহ্বানে কংগ্রেস প্রার্থী সঞ্জীব্ রেড্ডি পরাজিত হলেন। বরাহগিরি ভেঙ্কটগিরি ভারতের রাষ্ট্রপতি হলেন। 

ইন্দিরা গাঁধীকে দেশের চতুর্থ প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ বাক্য পাঠ করাচ্ছেন সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণণ। ছবি: আনন্দবাজার আর্কাইভ থেকে।

কিছুদিন পর আনুষ্ঠানিক ভাবে কংগ্রেস দল ভেঙ্গে গেল। নব কংগ্রেস ও আদি  কংগ্রেস । আদি কংগ্রেস নেতারা বিদ্রোহী দলে যোগ দিলেন। এই সময় প্রধানমন্ত্রী সংবিধান সংশোধন করে রাজন্য ভাতা বিলোপ এবং ব্যাঙ্ক জাতীয়করণ বিল পাশ করলেন। তারপর শ্রীমতী গান্ধী নির্দিষ্ট সময়ের এক বছর আগেই লোক্সভা ভেঙে দিয়ে ’৭১ সালের গোড়ার দিকে নির্বাচনের ডাক দিলেন। শুরু হল নির্বাচনী অভিযান। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারিকা সারা ভারতে দিনে ১০ থেকে ১২টি করে সভা করে নতুন শ্লোগান ‘ গরিবী হাটাও’ নিয়ে এগিয়ে এলেন। বহু কর্ম ব্যস্ততার মধ্যেও তিনি যে আমাদের কলকাতা সম্পর্কে সজাগ তা জানতে পারি। নির্বাচনী প্রচারে ওই সময় প্রধানমন্ত্রীর সফর সঙ্গী ছিলাম। প্রশ্ন করেছিলাম কলকাতার ভবিষ্যৎ নিয়ে। বিমানে তাঁর আসনের ডান দিকে একটি কালো ট্রাঙ্ক ছিল।  ট্রাঙ্ক থেকে একটি ফাইল বের করে আমাকে বললেন, লিখে নাওঃ ‘সি এম ডি এ দ্বিতীয় হুগলী সেতু এবং কলকাতার পাতাল রেলের ব্যাপারে আমই খুবই আগ্রহী। কেন্দ্রের সব মন্ত্রণালয়কে আমই নির্দেশ দিয়েছি, জরুরী ভিত্তিতে এই কাজ গুলি করতে হবে। কলকাতা না বাঁচলে সারা ভারতের ক্ষতি’। 

সে যাক। ৭১’ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিপুল গরিষ্ঠতা নিয়ে শ্রীমতী গান্ধী তৃতীয় বারের মত ভারতের প্রধানমন্ত্রী হলেন। ওই নির্বাচনের গত পাঁচ বছর ধরে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে অনেক ওলট পালট হয়েছে।সবচেয়ে বড় ঘটনা পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ। সংসদ নির্বাচনের পর ‘৭১সালের ১৮ মার্চ নতুন মন্ত্রীসভায় শপথ গ্রহণের সাত দিনের মধ্যে অর্থাৎ ২৫মার্চ রাত্রে পূর্ব পাকিস্তান ইয়াহিয়ার সামরিক বাহিনী ঝাঁপিয়ে পড়ে। ওই দেশ থেকে এক কোটি লোক এসে ভারতে আশ্রয় নেয়। ভারতের উপর অর্থনৈতিক সামাজিক চাপ আসে, বিঘ্নিত হয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা। প্রধানমন্ত্রী মুক্তিকামী সাড়ে সাত কোটি বাঙালিকে প্রতিশ্রুতি দিলেন। বাংলাদেশ স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হল, আক্রমণকারী পাকিস্তান পরাজিত হল।

বাংলাদেশকে সমর্থন করার জন্য ৭১’ সালে ডিসেম্বর মাসের তিন তারিখ পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করে। ওইদিন গভীর রাতে জাতির উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী ভাষণ দিতে গিয়ে বলেছিলেন মাতৃভূমি থেকে শত্রুকে নিশ্চিহ্ন করবই। তিনি কথা রেখেছেন।

ঘটনার পর ঘটনার স্রোত বইতে থাকে। ’৭১ সালের ৯ আগস্ট ভারত ও সোভিয়েট ইউনিয়নের মধ্যে ২৫ বছরের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি মৈত্র ও সহযোগিতার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। দেশের ভিতরে ও বাইরে নানা সমালোচনা শোনা যায়। শ্রীমতী গান্ধী এরও জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন এই চুক্তির অর্থ এই নয় যে ভারত তার নিরপেক্ষ নীতি পরিবর্তন করেছে। শ্রীমতী গান্ধীর ‘’৭২সালে ঢাকা সফরের সময় বাংলাদেশের সঙ্গে অনুরূপ এক চুক্তি করা হয়। ১৯মার্চ  ঢাকার বঙ্গ ভবনে ওই চুক্তি স্বাক্ষরের পর শেখ মুজিব আমাকে বলেছিলেন আমরা আরো কাছাকাছি এলাম। এই মৈত্রী চিরস্থায়ী।

তারপর আবার দেখা দিল অর্থনৈতিক সংকট। নানা ব্যবস্থা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী সব কিছুর মোকাবিলা করলেন, মুদ্রাস্ফীতি কমিয়ে কমিয়ে শুন্য অঙ্কে নিয়ে এলেন। শ্রীমতী গান্ধীর আমলেই ৭৪ সালের মে মাসে ভারিত রাজস্থানের মরুভূমিতে পরমাণু বিস্ফোরণ করে। আবার আর্ন্তজাতিক দুনিয়ায় ভারত বিরোধীরা হৈ চৈ করে উঠলেন। প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় বলে দিলেন, না আমরা যুদ্ধের জন্য নয় – শান্তির জন্য এই পরমাণু বিস্ফোরণ করেছি।

ভারতের বৈজ্ঞানিক ও কারিগরি উন্নতি এই দশকে যেমন হয়েছে তেমন কৃষি উৎপাদনও প্রচুর বেড়েছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য তিনি আহ্বান জানিয়েছেন। এই দশকে আরো কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটে। হিমালয়ের কোলে ছোট রাজ্য সিকিমের রাজতন্ত্রের অবসান হয়। প্রাপ্তবয়স্কের ভোটাধিকার ভিত্তিতে সেখানে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ৭৫ সালের গ্রীষ্মে। তারপর সিকিমের জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী সেখানকার বিধানসভার সর্ব সম্মতি প্রস্তাব ক্রমে সিকিম ভারতের অঙ্গরাজ্য হিসেবে যোগ দেয়। ওই বছর নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রী সিকিম সফরে গিয়ে সেখানার জনগণের বিপুল সম্বর্ধনা লাভ করেন। এবং সিকিমে উন্নতির সবরকম সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন। ডিসেম্বর মাসে কামাগাতামারু নগরে কংগ্রেসের অধিবেশনে আনুষ্ঠানিক ভাবে সিকিম কংগ্রেস ভারতের জাতীয় কংগ্রেসের সঙ্গে মিশে যায়।

কাশ্মীর সমস্যা দীর্ঘ দিনের সমস্যা। গতবছর ২৫ ফেব্রুয়ারি কাশ্মীরি নেতা শেখ আব্দুল্লার সঙ্গে শ্রীমতী গান্ধীর মতৈক্যের কথা সংসদে ঘোষণা করা হয়।তা ছাড়া দীর্ঘদিনের সমস্যা সমাধানে একটি চুক্তিও সম্পাদিত হয় ইন্দিরা দশকে। এর কিছুদিন পর মীরকাশিম মন্ত্রীসভা পদত্যাগ করে। এবং শেখ আব্দুল্লা কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্বভার নেন। গত জুন মাসে এলাহাবাদ হাইকোর্টের এক রায়ে রায়বেরিলি কেন্দ্র থেকে প্রধানমন্ত্রীর নির্বচন বতিল করা হয়। কিন্তু ৭ নভেম্বর সুপ্রিম কোর্ট ওই রায় বাতিল করেদেয়। শ্রীমতী গান্ধীর নির্বাচন বৈধ বলে ঘোষিত হয়।

গত বছর এপ্রিল মাসে কক্ষপথে ভারত  উপগ্রহ নিক্ষেপ করে। এটাও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ভারতের উল্লেখযোগ্য অবদান। এই দশকের আরও একটি উল্লেখযগ্য ঘটনা ’ ৭৫সালের ২৬ জুন অভ্যন্তরীণ জরুরি অবস্থা ঘোষণা এবং চোরাশিকারীদের শায়েস্তা করার নানা ব্যবস্থা। তাছাড়া অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের জন্য তাঁর ২০ দফা কর্মসূচী বহু সমস্যার সমাধান করেছে। গত বছরের আরো একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা তাঁর দ্বিতীয় পুত্র সঞ্জয় গান্ধীর রাজনীতিতে আবির্ভাব। সঞ্জয় বলেছেন, একজন আই এস এর পুত্র যদি আই এ এস হতে পারে তাহলে একজন রাজনৈতিক নেতার পুত্রের রাজনীতিতে আসা কোন অন্যায় নয়। বস্তুত তিনি যুব কংগ্রেসের মধ্যে নতুন করে কর্মোদ্যোগ শুরু করায় কংগ্রেসের যুব শক্তির মধ্যে নতুন চেতনার সঞ্চার হয়।

উৎপীড়ন, অন্যায়,অত্যাচারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম ঘোষিত নীতিগুলি কার্যকরী করতে কোন বাধাই মানবেন না বলে প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার ঘোষণা করেছেন। জরুরী অবস্থা ঘোষণার পর সার্বিক উন্নয়নের যে বিশ দফা কর্মসূচি প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছিলেন সেই সম্পর্কে তিনি নিজেই বলেছেন, জাদু একটাই তা হল কাজ। আর এই কাজের সাফল্যই আনবে প্রগতি, আনবে উন্নতি, আনবে সমৃদ্ধি।      

 

সবাই যা পড়ছেন

সব খবর প্রতি সকালে আপনার ইনবক্সে
আরও পড়ুন

সবাই যা পড়ছেন

আরও পড়ুন