একদিকে হাজার বিতর্ক এবং সমালোচনার মুখেও অনড় নরেন্দ্র মোদী সরকার ও সঙ্ঘ পরিবার। অন্য দিকে ক্রমশ শক্তি বাড়িয়ে আরও এককাট্টা বিরোধী পক্ষ। যার জেরে আজও উত্তপ্তই হয়ে রইল জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়। যার পড়ুয়া এবং শিক্ষকরা আজ পুলিশের সামনেই বিজেপি কর্মীদের হাতে মারও খেলেন!

জেএনইউ-তে পুলিশ পাঠানো বা ছাত্রনেতাকে গ্রেফতারের ঘটনায় তারা যে অনুতপ্ত নয়, তা ফের বুঝিয়ে দিয়েছে বিজেপি-আরএসএস। উল্টে জাতীয়তাবাদের জিগির তুলেই তারা বিরো‌ধীদের কোণঠাসা করতে মরিয়া। বিজেপির অভিযোগ, মোদী-বিরোধী রাজনীতি করতে গিয়ে দেশদ্রোহিতাকে প্রশ্রয় দিচ্ছে কংগ্রেস-বাম। যে অভিযোগ উড়িয়ে বিরোধীদের পাল্টা তোপ, যারা গাঁধীজিকে হত্যা করেছে তাদের মুখে দেশপ্রেম কথাটা বেমানান! তবে এতেও যে গেরুয়া-শিবির দমছে না, আজ গোটা দিন জুড়ে তিনটি ঘটনায় তার প্রমাণ মিলেছে।

কী সেই তিন ঘটনা?

এক, বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ আজ সরাসরি আক্রমণ করেছেন কংগ্রেসের সহ-সভাপতি রাহুল গাঁধীকে। প্রথমে ব্লগ লিখে, তার পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে। ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’-দের সমর্থন করার জন্য রাহুলের ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়েছেন অমিত।

দুই, আজ দিল্লির পাটিয়ালা হাউস কোর্টে জেএনইউ-এর ছাত্র সংসদের সভাপতি কানহাইয়া কুমারকে পেশ করে দিল্লি পুলিশ দাবি করে, তাকে আরও জিজ্ঞাসাবাদ করা দরকার। আর্জি মেনে আদালত ওই ছাত্রনেতাকে আরও দু’দিনের জন্য পুলিশি হেফাজতে পাঠিয়েছে।

তিন, আদালতে শুনানির আগে এজলাসের মধ্যেই জেএনইউ-এর শিক্ষক-ছাত্র এমনকী সাংবাদিকদেরও পুলিশের সামনেই পেটাল বিজেপি সমর্থক আইনজীবী ও সমর্থকেরা। আদালতের বাইরেও বামপন্থী ছাত্র-যুব নেতাদের মারধর করে তারা। যাতে নেতৃত্ব দেন দিল্লির বিজেপি বিধায়ক ও পি শর্মা।

এবং এর সঙ্গে যোগ হয়েছে আরও একটি ঘটনা। সংসদ হামলার ঘটনায় দেশদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার হওয়া দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক এস এ আর গিলানিকে ফের আটক করেছে পুলিশ। ১০ ফেব্রুয়ারি দিল্লি প্রেস ক্লাবে এক অনুষ্ঠানে আফজল গুরুর সমর্থনে স্লোগান দেওয়া হয় এবং গিলানিই ওই অনুষ্ঠানের মূল উদ্যোক্তা ছিলেন, এই অভিযোগে তাঁকে আটক করা হয়েছে।

সব মিলিয়ে জেএনইউ নিয়ে ক্রমশ কঠোর হচ্ছে কেন্দ্রীয় সরকারের মনোভাব।

সোমবারই জেএনইউ-এর ঘটনায় মোদী সরকারকে তুলোধনা করেছেন বিএসপি নেত্রী মায়াবতী। যা বিজেপি-বিরোধী জোটকেই আরও একটু শক্তি দিয়েছে। প্রশ্ন হল, বাজেট অধিবেশনের আগে কংগ্রেস, বাম, জেডি (ইউ)-এর মতো দলগুলিকে এককাট্টা হতে দেখেও কেন এত আক্রমণাত্মক হচ্ছে বিজেপি? মঙ্গলবার সকালেই বাজেট অধিবেশন নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক দলগুলির লোকসভা ও রাজ্যসভার নেতাদের বৈঠক ডেকেছেন মোদী। সেখানেও অধিকাংশ নেতাই যে জেএনইউ নিয়ে সরব হবেন, তা বলা বাহুল্য। কিন্তু তাতেও নরম হচ্ছে না বিজেপি। 

বিজেপি নেতৃত্বের বক্তব্য, কংগ্রেস এমনিতেই সংসদ চলতে দেবে না। তাদের সঙ্গে যোগ দেবে অন্যরাও। বিজেপি তাদের বিরুদ্ধে দেশ-বিরোধী শক্তিকে মদত দেওয়ার অভিযোগ আনবে। এতে বিজেপি তাদের ভোটব্যাঙ্ককে অটুট রাখতে পারবে। দাদরি থেকে হায়দরাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়— এ যাবৎ সব ঘটনাতেই তারা দশ গোল খেয়েছে। জেএনইউ-কাণ্ডে পাল্টা গোল দেওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী তারা। সে কারণেই সঙ্ঘ ও দল যৌথ ভাবে আসরে নেমেছে। যে রাহুল গাঁধীকে এত দিন উঠতে-বসতে অবজ্ঞা করত বিজেপি, তাঁকেই আজ নিশানা করেন অমিত। গত কাল প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার শীর্ষ সদস্যরা ও অমিত শাহের মধ্যে এ নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানেই ঠিক হয়, ‘দেশ-বিরোধী’ স্লোগান যারা দিয়েছে, তাদের ‘সহমর্মিতা’ জানাতে রাহুল গাঁধীর জেএনইউ-তে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে আক্রমণের পথে হাঁটবে দল। মোদী সরকারকে ‘হিটলারের সরকার’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন রাহুল। আজ ইন্দিরা গাঁধীর জমানায় জরুরি অবস্থার প্রসঙ্গ টেনেছেন অমিত। পাল্টা হিসেবে অসম সফররত রাহুল বলেন, ‘‘আরএসএস যেন দেশভক্তির দোকান খুলে রেখেছে! গাঁধীজির বুকে যারা তিনটি গুলি করেছিল, তাদের কাছে দেশভক্তি শিখতে হবে না কি!’’

বিজেপির কড়া মনোভাবের জেরে জেএনইউ-তে উত্তেজনা আজও অব্যাহত। বাম নেতারা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহের কাছে দাবি করেছিলেন, কানহাইয়া কোনও দেশবিরোধী স্লোগান দেননি। কাজেই সোমবার তাঁকে আদালতে পেশ করা হলে যেন পুলিশ জামিনের বিরোধিতা না করে। আজ কানহাইয়া জামিন পেলে জেএনইউ ক্যাম্পাসে উত্তেজনা কমত। কিন্তু তা হয়নি। কাল রাজনাথ দাবি করেছিলেন, জেএনইউ-এর ছাত্রদের সঙ্গে লস্কর জঙ্গি হাফিজ সইদের যোগ রয়েছে। কিন্তু এ দিনই ইউটিউবে পোস্ট করা এক ভিডিও বার্তায় হাফিজ জানায়, জেএনইউ-এর ছাত্রদের কর্মসূচিতে তার কোনও ভূমিকা নেই। ছাত্রদের সমর্থনে সে কোনও টুইটও করেনি। দিল্লির পুলিশ কমিশনারও জানিয়েছেন, জেএনইউ-কাণ্ডে লস্কর যোগের প্রমাণ মেলেনি। ফলে ফের সমালোচনার মুখে পড়েছেন রাজনাথ।

এ দিন আদালতে জেএনইউ-র শিক্ষক-ছাত্র-সাংবাদিক নিগ্রহকে ‘সামান্য ঘটনা’ বলে মন্তব্য করেছেন পুলিশ কমিশনার। কানহাইয়াকে আদালতে পেশের আগেই এজলাসে চড়াও হন বিজেপি-সমর্থক আইনজীবীরা। আদালতের বাইরে সিপিআইয়ের যুব নেতা আমিক জামেইকে মারধর করেন বিজেপি বিধায়ক ও পি শর্মা। এআইএসএফ-এর সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ কুমারকেও মারধর করা হয়। সিপিএম এবং সিপিআই অফিসে ফোন করে হুমকিও দেওয়া হয়েছে।

 

আরও পড়ুন:
আরও উত্তপ্ত জেএনইউ, পুলিশি হেফাজত বাড়ল জেএনইউ-র ছাত্রনেতার