করিমগঞ্জে বাঙালির ভোট-অঙ্কে মিশে ধর্ম
হাইলাকান্দির কাটলিছড়ায় ছিল কংগ্রেস নেতা গৌতম রায়ের সভা। আয়োজন বিশাল। কিন্তু মানুষ কোথায়!
Sharmistha Mukherjee

—ফাইল চিত্র।

করিমগঞ্জ শহরে এক দোকানের সামনে চলছিল আড্ডা। সামান্য দূরে তখন কংগ্রেসের মহিলা নেত্রী তথা প্রণব মুখোপাধ্যায়ের কন্যা শর্মিষ্ঠা মুখোপাধ্যায়ের ভাষণ শেষ হয়েছে। অসমের বাঙালির এনআরসি যন্ত্রণার কথা গুরুত্ব পেয়েছে তাঁর বক্তব্যে। দু’দিন আগে একই কথা বলে গিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গের পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম। সে সব নিয়েই কথা হচ্ছিল তাঁদের। কেনাকাটার ভান করেই কান পাতা। 

একজন বললেন, এনআরসির শুরু তো কংগ্রেস আমলেই। শর্মিষ্ঠা বোধহয় জানেন না। পাশ থেকে একজন ফুট কাটলেন, ওরাই তো নাগরিকত্ব বিলের বিরোধিতা করে উদ্বাস্তু বাঙালিদের নাগরিকত্ব ঠেকাল। মাঝখান থেকে একজন তৃণমূল কংগ্রেসকে টেনে আনেন, আরে তৃণমূলের তো এখানে কিছুই নেই, অথচ প্রার্থী দিয়ে দিল! 

হাইলাকান্দির কাটলিছড়ায় ছিল কংগ্রেস নেতা গৌতম রায়ের সভা। আয়োজন বিশাল। কিন্তু মানুষ কোথায়! মেরেকুটে ২৫০-৩০০। বছর তিনেক আগেও ‘মন্ত্রী’ গৌতম রায় রাস্তায় হাঁটলে পিছনে দু’-আড়াইশো মানুষ থাকতেন। কংগ্রেস প্রার্থী স্বরূপ দাস মঞ্চেই ছিলেন। তাঁর কথা কমই বললেন গৌতমবাবু। শোনালেন আত্মচরিত, বললেন, ‘‘ছ’বারের বিধায়ক, চার বারের মন্ত্রী আমি। স্ত্রী, পুত্রকেও একবার করে বিধায়ক বানিয়েছি। নেপাল দাস ও ললিতমোহন শুক্লবৈদ্যকে সাংসদ করেছি।’’ কার মেয়ের বিয়েতে সাহায্য করেছেন, কাকে দিল্লিতে চিকিৎসা করিয়ে এনেছেন, কাকে কাকে চাকরি দিয়েছেন, বলছিলেন সে সবও। 

দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

জনতার মধ্যে, পাশেই বসেছিলেন এক বৃদ্ধ। মুখ ঘুরিয়ে বললেন, ‘‘আরও আগেই ওঁর বিজেপিতে যাওয়া উচিত ছিল।’’ সামনের সারিতে বসা। বিশদ জানার সুযোগ হয়নি। কিন্তু কী বলতে চেয়েছেন ওই কংগ্রেসি বৃদ্ধ। উত্তর মিলল ওই আড্ডায়। গৌতম রায় বিজেপি-তে যোগ দিচ্ছেন, গত আড়াই বছরে বহুবার চাউর হয়েছে সে কথা। কিছুদিন আগে রটে যায়, টিকিটও নিশ্চিত করে নিয়েছেন। ২০১৪-র লোকসভা নির্বাচনের আগে তিনি বলেছিলেন, ‘‘আমি এমপি-র টিকিট চাই না। আমি তো টিকিট দিই।’’ কথাগুলো উল্লেখ করেই দুই যুবক বলে উঠল, কথাই সার। এখন বিজেপিতে যোগ দেওয়ার চেষ্টা করছেন। ভাগ্যিস, বিজেপির কেউ তাঁকে মেনে নেয়নি। এখন আবার কংগ্রেসের সভায়। স্পষ্ট হয় সেই বৃদ্ধের কথা।

বর্তমান সাংসদ রাধেশ্যাম বিশ্বাসকে নিয়েও হাসি-তামাশা কম নয়। ২০১৪ সালে এআইইউডিএফ প্রার্থী হিসেবে সাংসদ হন। আচমকাই এ বার তাঁর জন্য দলীয় টিকিট চেয়ে চিঠি লিখলেন জেলা কংগ্রেস সভাপতি সতু রায়! সতুবাবু চিঠির সত্যতা স্বীকার করলেও নীরব থাকলেন প্রাক্তন কংগ্রেসি রাধেশ্যাম বিশ্বাস। কংগ্রেস হাইকমান্ড না মানায় তিনি ফের এআইইউডিএফ প্রার্থী। 

করিমগঞ্জ ও হাইলাকান্দি জেলা মিলিয়ে করিমগঞ্জ লোকসভা আসন। এখানে চার জন এআইইউডিএফ বিধায়ক। কংগ্রেস এবং বিজেপির ২ জন করে। বিজেপি প্রার্থী কৃপানাথ মালা করিমগঞ্জ জেলার রাতাবাড়ি আসনেরই বিধায়ক। বিধানসভার ডেপুটি স্পিকারও। গত বিধানসভা নির্বাচনের আগে কংগ্রেস ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন। 

কৃপানাথ ভাগ্যবান, বলছিলেন লালা-র এক সরকারি কর্মচারী এন আই তফাদার। তাঁর যুক্তি, কৃপানাথ চা-জনগোষ্ঠীর মানুষ। ফলে তাদের ভোট আর কেউ পাবে না। আর কংগ্রেস বাঙালি আবেগ টানার চেষ্টা করলেও হিন্দু ভোটে থাবা বসানো সম্ভব নয়। তবে তো ভোটের আগেই বিজেপির কৃপানাথ জিতে গিয়েছেন! অঙ্ক যে এত সহজ নয়, কষে বুঝিয়ে দিলেন করিমগঞ্জের এক আইনজীবী। এই আসনে মোট ভোটার ১৩ লক্ষ ৩৮ হাজার। হিন্দু ৫.৭৫ লাখ। বাকি সাড়ে সাত লক্ষ মুসলিম। আসনটি তফসিলি জাতির জন্য সংরক্ষিত। তাই মুসলিম প্রার্থী নেই। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশই মনে করেন, এআইইউডিএফ তাঁদেরই দল। এর উপর, নিজের জনগোষ্ঠীর ভোট রয়েছেই রাধেশ্যাম বিশ্বাসের। 

তাহলে তো রাধেশ্যামবাবুই ফের সাংসদ! অঙ্কটা এত সহজ নয়, এ বারও একই কথা ওই আইনজীবীর। বললেন, যতই দুর্বল হোক, করিমগঞ্জ আসনে মুসলিমদের মধ্যে কংগ্রেসেরও প্রভাব রয়েছে। এ ছাড়া, বর্তমান সাংসদ বলে রাধেশ্যামবাবুর বিরুদ্ধে অসন্তোষও কম নয়। সর্বত্র তো এই হিন্দু-মুসলিমের ভোটের অঙ্ক! আসলে এই জটিল অঙ্কের উপরেই দাঁড়িয়ে করিমগঞ্জের ভাগ্য।

২০১৯ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত