ঋণের চাপে আত্মঘাতী কৃষক বাবা, গুজরাতে ৭৪ শতাংশ নম্বর পাওয়া মেয়ে বাসন মাজছে হোটেলে
যে জমিতে ফসল ফলিয়ে রানাভাই তাদের বড় করে তুলছিলেন, জীবনের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিলেন সন্তানদের, সেই জমিই তো ডেকে নিয়ে এল বিপদ!
Farmer

বাবা রানাভাইয়ের ছবি নিয়ে জয়েশ, অঞ্জলি। ডান দিকে কবিতাবেন।— নিজস্ব চিত্র।

কান্নাটা কোনও রকমে আটকে ফেলল অঞ্জলি। তার পর কয়েক বার ঢোক গিলে বলল, ‘‘আচ্ছা বলুন তো, চাষ করা কি পাপ?’’

বাবার আত্মহত্যা কেড়ে নিয়েছে জীবনের সমস্ত স্বপ্ন। গত ৬ মাস ধরে শুধুমাত্র বেঁচে থাকার লড়াই চালাচ্ছে অঞ্জলিরা। দশম শ্রেণির পরীক্ষায় মেয়েটা ৭৪ শতাংশ নম্বর পেয়েছিল। আর এখন? স্থানীয় হোটেলে বাসন মাজার কাজ করে!

গত অক্টোবরের ২৫ তারিখ ভোরে জামনগর থেকে কিলোমিটার পঞ্চাশেক দূরে ভাবড়ি গ্রামের সকলে দেখেছিল, খেতের পাশের ইলেকট্রিক পোস্টে ঝুলছেন রানাভাই গাগিয়া (৪৯)। বেশ কিছু দিন ধরেই অসহায় অবস্থায় কাটাচ্ছিলেন। নেতার দরজা থেকে সরকারি অফিস ঘুরে বেড়িয়েছেন। ইনসিওরেন্সের অফিসও বাদ দেননি। রানাভাইয়ের চাষের খেত তার কিছু দিন আগেই শ্মশান হয়ে গিয়েছিল। জমিতে পোতা বাদাম আর কাপাস— জলের অভাবে জ্বলে ছাই। বাজারে তত দিনে লাখ তিনেক টাকা দেনা হয়ে গিয়েছে। ভেবেছিলেন ফসল উঠলে কিছুটা অন্তত শোধ করতে পারবেন। কিন্তু, ঝুলে পড়া ছাড়া আর কোনও উপায় খুঁজে পাননি রানাভাই। ছ’মাস আগের এই কথাগুলো ঢোক গিলতে গিলতে বলছিল অঞ্জলি। ভাড়াবাড়ির খুপচিতে খাটিয়ায় পাশে বসা তাঁর মা কবিতাবেন তখন শাড়ির খুঁটে চোখ মুছছেন।

 

 

অঞ্জলির বয়স সদ্য ১৫ ছাড়িয়েছে। বাবার আত্মহত্যার পর তাঁর থেকে চার বছরের বড় দাদা জয়েশ জামনগরের কলেজে পড়া ছেড়ে সেখানেই একটা কারখানায় কাজ জুটিয়েছেন। দিনপ্রতি মেলে ১৫০ টাকা। ১৭ বছরের দিদি শীতল আর ১৩ বছরের বোন কাজলও ছোটখাটো কারখানায় কাজ করেন। তাঁদের প্রাপ্য আরও কম। ছোট ভাই ভরত এখনও পড়াশোনা করে। তবে স্কুলে যাওয়া হয় না নিয়মিত। গত চার মাস ধরে তাঁদের ঠিকানা আর ভাবড়ি নয়, জামনগর শহর থেকে কিছুটা দূরের দরে়ড গ্রামে দেড় হাজার টাকার ভাড়াবাড়ি। সেখানেই কোনও রকমে টেনেটুনে দিন কাটছে গাগিয়া পরিবারের।

অঞ্জলিকে যখন জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, সে কোন ক্লাসে পড়ে? কষ্টের দলাটা ঢোক গিলে জবাব দিল, ‘‘ক্লাস টেনে পড়তাম। ৭৪ শতাংশ নম্বর পেয়েছিলাম। ইলেভেনে আর ভর্তি হওয়া হয়নি। দাদা-দিদিরা কোথায় টাকা পাবে। আমি তাই কাজে ঢুকে পড়েছি।’’ কী কাজ? হোটেলে বাসন মাজার কাজের কথাটা কোনও ভাবেই সে উচ্চারণ করতে পারল না। পাশ থেকে মা কবিতাবেনই বসসেন, ‘‘ও এ পাড়ার একটা হোটেলে দু’বেলা বাসন মাজে।’’

সৌরাষ্ট্রে এমনই হয়েছে কাপাসের চাষ।—নিজস্ব চিত্র।

আরও পড়ুন: মন্দির থেকে ফিরলেন যশোদাবেন, বললেন, সব পুজো ওঁর জন্যই...

হিন্দিতে তেমন সড়গড় নন কবিতাবেন। তাঁর দেওরের মেয়ে রমা হিন্দি থেকে গুজরাতিতে কথাবার্তার নির্যাস শোনাচ্ছিলেন। স্বামী হারানোর শোকের মধ্যেই এখন কবিতাবেনের চিন্তা, ‘‘তিন মেয়ের বিয়ে কী করে দেব? ওরা পড়াশোনায় এত ভাল ছিল! হোটেল-কারখানায় কাজ করা মেয়েকে সমাজে তো কেউ ভাল চোখে দেখে না!’’ সঙ্গে এটাও বললেন, ‘‘আমার বাচ্চারা সবাই মিলে চেষ্টা করছে, বাবার ধার যাতে দ্রুত শোধ করা যায়। সরকার পাশে থাকলে সুবিধাই হত।’’

এটা কোনও একটা গাগিয়া পরিবারের কাহিনি নয়। গোটা সৌরাষ্ট্রে গত সেপ্টেম্বর মাস থেকে ২৮ জন কৃষক আত্মহত্যা করেছেন! সংখ্যাটা নিয়ে সরকারের খুব একটা হেলদোল আছে বলে কৃষক মহল মনে করে না। কৃষকদের একটা বড় অংশের বিশ্বাস, তাঁদের জন্য আর কিছুই ভাল হওয়ার নয়। প্রতি পদক্ষেপেই তাদের হার।

কেন এই পরিস্থিতি? লালপুরের রজনী খুন্তি উগরে দিলেন এক রাশ ক্ষোভ। বললেন, ‘‘একে তো সার এবং কীটনাশকের দাম বেড়েছে গত কয়েক বছরে। তার উপর বৃষ্টি প্রায় হয়নি। সেচেও জল মেলে না। ফসল শুকিয়ে কাঠ। আর যার যেটুকু ফসল বিক্রিযোগ্য, তার ন্যূনতম সহায়ক মূল্য পাওয়া কার্যত অসম্ভব।’’ প্রধানমন্ত্রী ফসল বিমার সুফল মিলছে না? বৃদ্ধ রজনীর চোখেমুখে একটা রাগ ছড়িয়ে পড়ল। কারণটা বুঝিয়ে দিলেন, ‘‘আমরা সব ছোট চাষি। ফসল বিমার প্রিমিয়াম আমাদের অনেকের কাছেই বেশ বেশি ঠেকে। লাভের গুড় পিঁপড়েকে দিয়ে দেওয়ার মতো। কাজেই অনেক চাষি ওই বিমা করে না। আর যারা করে, তারা বিপদের দিনে টাকা পায় না। এটাই আমাদের অভিজ্ঞতা।’’

এমন সবুজ প্রান্তরও কোথাও কোথাও চোখে পড়ে।—নিজস্ব চিত্র।

জয়েশও তেমন অভিজ্ঞতার কথাই শোনালেন। আত্মহত্যা করার কয়েক দিন আগে তাঁর বাবা রানাভাই গিয়েছিলেন বিমা সংস্থার অফিসে। জলের অভাবে তাঁর ফসল নষ্ট হয়ে গিয়েছে, এ কথা জানানোর পর সেই অফিস থেকে লোকজন আসে। খেত পরীক্ষা করে জানানো হয়, এই জমিতে কোনও বীজই পোঁতা হয়নি! জয়েশের কথায়, ‘‘মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে বাবার। সে দিন বিকেলে বাড়ি ফিরে এসেছিলেন। পর দিন ভোরেই...। বিমার ক্ষতিপূরণটা পেলে বাবাকে হয়তো মরতে হত না।’’

আরও পড়ুন: মৃত্যুর ১৫ বছর পরও বেঁচে বীরাপ্পন, আছেন তামিলনাড়ুর ভোটেও

বৃষ্টি যে কম হয়েছে তা ঠিকই। রাজ্য সরকার খরাও ঘোষণা করেছে কোনও কোনও জায়গায়। কিন্তু, সেই ঘোষণার মাপকাঠি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। নিজেদের ইচ্ছে মতো তালুককে খরা ঘোষণা করা হয়েছে বলে অভিযোগ। সৌরাষ্ট্রে কৃষকদের অধিকার নিয়ে কাজ করা পালাভাই আম্বালিয়া কথায় কথায় বললেন, ‘‘কোন গ্রামে কতটা বৃষ্টি হয়েছে, তা মাপার যন্ত্র নেই। নিজেদের ইচ্ছে মতো তালুককে খরা কবলিত বলে দাগিয়ে দেওয়া হয়েছে। তার বাইরে তো হাজারো গ্রাম। সেগুলোর কী হবে? অনেক জায়গাই রয়েছে, যেখানে প্রথম দফায় ভাল বৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু সেকেন্ড স্পেলে আর বৃষ্টিই হয়নি। সেই কৃষকদের কী হবে? জবাব কে দেবেন, নরেন্দ্রভাই মোদী না বিজয়ভাই রুপানী?’’ অভিযোগ শুধু পালাভাইয়ের নয়। জুনাগড় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক স্বামীনাথন বি যেমন বললেন, ‘‘বৃষ্টিপাতের পরিমাণের উপর নির্ভর করে ৫১টি তালুককে খরা কবলিত বলে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু, তার পর কী! কৃষক সহায়তার কোনও নমুনাই তো দেখতে পেলাম না। কৃষকরা যে অন্ধকারে ছিলেন, তার থেকে আরও আঁধারে ডুবছেন তাঁরা।’’

দু’ফোঁটা বৃষ্টির আশায়।—নিজস্ব চিত্র।

এ বারের নির্বাচনে সৌরাষ্ট্রের এই কৃষক ক্ষোভই বিজেপির মাথাব্যথার কারণ। বিষয়টি নরম করতে নেতারা পথে নেমেছেন। জুনাগড়ে ইতিমধ্যেই জনসভা করে গিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী। গুজরাতের মুখ্যমন্ত্রী বিজয় রূপানিকে সৌরাষ্ট্রের এই কৃষক অসন্তোষ নিয়ে প্রশ্ন করায় বললেন, ‘‘বৃষ্টি কম হয়েছে সেটা তো বাস্তব। আমাদের দল সব সময় কৃষকের পক্ষে। কৃষকদের জন্য কত ভাল ভাল প্রকল্প এনেছেন মোদীজি। চাষের জন্য টাকা দেওয়া ছাড়াও ফসল বিমা প্রিমিয়ামের একটা বড় অংশ তো সরকার দেয়। প্রচুর কৃষক বিমার টাকা পেয়েছেন। মোদীজি এলে কৃষকদের আরও সুবিধা হবে।’’

কংগ্রেস কিন্তু ঠিক এর উল্টোটাই বলছে। মণীশ দোশির মতো নেতারা বলছেন, ‘‘বিজেপি কৃষকদের জন্য কিছু‌ই করেনি। জানেন, এ বার কাপাস উৎপাদন গত ১০ বছরের মধ্যে সব চেয়ে কম হয়েছে। বাদামও। জোয়ার-বাজরা-গম-আখের হালও বেশ খারাপ। কারণটা কী জানেন? এই সরকারের কোনও কৃষি নীতি নেই। সৌরাষ্ট্র ঘুরলে কৃষকদের দুর্দশার ছবিটা বুঝতে পারবেন। প্রিমিয়াম দেওয়ার পরেও ফসল বিমার একটা টাকাও পান না চাষিরা! অথচ নিয়মে বলা আছে, খরা কবলিত এলাকায় জরুরিভিত্তিতে বিমার ২৫ শতাংশ টাকা দিয়ে দিতে হবে। কোথায় কী! বিধানসভা নির্বাচনে সৌরাষ্ট্র বুঝিয়ে দিয়েছে তারা কাকে চায়। বিজেপির এখানে কোনও ঠাঁই নেই আর।’’

আরও পড়ুন: দিল্লি দখলের লড়াই, লোকসভা নির্বাচন ২০১৯

তবে এই সব রাজনৈতিক কচকচানিতে কিছুই যায় আসে না অঞ্জলিদের। ভাবড়ির ৬ বিঘে কৃষি জমি, বাড়ি ছেড়ে তারা গ্রামছাড়া হয়েছেন শুধু পেটের দায়ে। যে জমিতে ফসল ফলিয়ে রানাভাই তাদের বড় করে তুলছিলেন, জীবনের স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেছিলেন সন্তানদের, সেই জমিই তো ডেকে নিয়ে এল বিপদ! তাই এখন অঞ্জলিরা জমি থেকে অনেক দূরে। সামান্য টাকার বিনিময়ে হোটেলে, কারখানায়!

নির্বাচনী নির্ঘণ্ট

২০১৪ লোকসভা নির্বাচনের ফল

আপনার মত